মতলুব আলী ছিলেন বহুগুণের অধিকারী। একাধারে চিত্রশিল্পী, খ্যাতিমান গীতিকার, সুরকার, লেখক, গবেষক ও নিষ্ঠাবান শিক্ষক। সর্বোপরি মানবতাবাদী একজন মানুষ। তিনি তাঁর কাজের মধ্য দিয়েই স্মরণীয় হয়ে থাকবেন বলে মন্তব্য করেছেন আলোচকেরা।
রোববার সন্ধ্যায় ‘মতলুব আলী স্মরণে কিছু কথা, কিছু গান’ অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণা, আলোচনা আর তাঁর লেখা গানের পরিবেশনায় শ্রদ্ধা জানানো হলো তাঁকে। শিশু একাডেমির শিশু জাদুঘর মিলনায়তনে এই আয়োজন করেছিল তাঁরই হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান মানব শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি গোষ্ঠী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক শিল্পী মতলুব আলী গত বছরের ৪ নভেম্বর ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যু ছিল অনেকটাই আকস্মিক। আলোচনায় গভীর শোক প্রকাশ করলেন তাঁর নিকটজনেরা। প্রচলিত রীতি মোতাবেক আয়োজনে কোনো সভাপ্রধান ছিলেন না। আলোচকেরাও ছিলেন দর্শক আসনে। মঞ্চে সাজানো ছিল বাদ্যযন্ত্র। আলোচকেরা একে একে এসে কথা বলেছেন। এর ফাঁকে ফাঁকে ছিল গানের পরিবেশনা।
অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল ‘এসো বন্ধু এসো তোমার সকল বৈভবে’ গানটি দিয়ে। দ্বৈত কণ্ঠে পরিবেশন করেন মতলুব আলীর কন্যা আলী পুষ্পিতা মউরি ও দৌহিত্রী নিধি। মিলনায়তনের ভেতরে শিল্পী মতলুব আলীর চিত্রকর্ম ও মিলনায়তনের সামনে তাঁর লেখা বিভিন্ন বই প্রদর্শন করা হয়েছিল। অনুষ্ঠানে মতলুব আলীর জীবন ও কর্মের ওপর তাঁর নিউইয়র্কপ্রবাসী ছেলে আলী পূষণ রেহান নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
আলোচনা পর্বে ইমেরিটাস অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, মতলুব আলী চিত্রশিল্পী হলেও চিত্রকলার চর্চার চেয়ে লেখালেখিতেই আগ্রহ ছিল বেশি। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সম্পর্কে তিনি যে এমফিল গবেষণা করেছিলেন, সেটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিত্রকলা নিয়েও তিনি দীর্ঘদিন গবেষণামূলক কাজ করেছেন। গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। আর গীতিকার ও সুরকার হিসেবে, বিশেষ করে গণসংগীত রচয়িতা হিসেবে তিনি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন। এসব বহুমুখী কাজের মধ্য দিয়েই তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
ইমেরিটাস অধ্যাপক শিল্পী রফিকুন নবী বলেন, মতলুব আলী ছিলেন তাঁর ছাত্র ও সহকর্মী। ছাত্র হিসেবে খুবই মেধাবী, মনোযোগী, শিক্ষক হিসেবেও ছিলেন দায়িত্বনিষ্ঠ। ব্যক্তিগতভাবে মতলুব আলী তাঁর প্রিয় ছাত্র ছিলেন। একজন গুণী মানুষের মধ্যে যে ধরনের গুণের সমাহার থাকা প্রয়োজন, মতলুব আলীর মধ্যে তা সবই ছিল। চিত্রকলা, সাহিত্য, সংগীত, গবেষণা সব ক্ষেত্রেই তিনি প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। কিন্তু তিনি ছিলেন খুবই বিনয়ী, নম্র, অনেকটা নেপথ্যচারী। সে কারণে এত প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও সেভাবে পাদপ্রদীপের আলোয় আসেননি।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি প্রাবন্ধিক মফিদুল হক বলেন, ‘আমাদের দেশে ষাটের দশকের রাজনৈতিক আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে সাংস্কৃতিক আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ সহযোগীর ভূমিকা পালন করেছে। সেখানে সংগীত ও শিল্পকলার বিশেষ ভূমিকা আছে। তখন অনেক মানুষ অনেকভাবে অবদান রেখেছেন। মতলুব আলী ছাত্রজীবন থেকেই গণমানুষের মুক্তির প্রগতিশীল ভাবনাকে লালন করতেন। তিনি সেই আন্দোলনে গণসংগীত ও শিল্পকলার চর্চার ভেতর তাঁর অবদান রেখেছেন। বিশেষ করে তাঁর কালজয়ী হয়ে ওঠা “লাঞ্ছিত নিপীড়িত জনতার জয়” গানটি সে সময় রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে ব্যাপকভাবে গাওয়া হয়েছে।’
স্মৃতিচারণা করে আরও বক্তব্য দেন প্রবীণ অধ্যাপক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কাজী মদিনা, শিল্পী আবদুল মান্নান, মতলুব আলীর সহপাঠী নিজেরা করির সমন্বয়ক মানবাধিকারকর্মী খুশী কবির ও শিল্পী বীরেন সোম, মুক্তিযোদ্ধা কণ্ঠশিল্পী রফিকুল আলম, আবৃত্তিকার আশরাফুল আলম প্রমুখ।
আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী জাকির হোসেন, চিত্রা সুলতানা, আলী পুষ্পিতা মউরি ও ছায়ানটের বিশেষ শ্রেণির শিল্পীরা। শেষে ছিল সমবেত কণ্ঠে মতলুব আলীর সেই বিখ্যাত গান ‘লাঞ্ছিত নিপীড়িত জনতার জয়/ শোষিত মানুষের একাতার জয়’–এর পরিবেশনা। মানব মুক্তির এমন জয়গান যাঁরা গেয়েছেন, তাঁদের মৃত্যু নেই।