মাথায় ইট ছুড়ে মেরে চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে ফেলে দেওয়া হয় সাজিদকে। গত মঙ্গলবার দিবাগত রাত একটার দিকে রাজধানীর পূর্ব শেওড়াপাড়ায়
মাথায় ইট ছুড়ে মেরে চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে ফেলে দেওয়া হয় সাজিদকে। গত মঙ্গলবার দিবাগত রাত একটার দিকে রাজধানীর পূর্ব শেওড়াপাড়ায়

সাজিদকে ইট মেরে মোটরসাইকেল থেকে ফেলে দেওয়ার দৃশ্য সিসিটিভির ফুটেজে, এখন আইসিইউর সামনে মায়ের অপেক্ষা

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সামনে দাঁড়িয়ে আছেন তানিয়া সিকদার। কখনো রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট আনছেন, কখনো চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ কিনতে ছুটছেন। সবকিছু একাই সামলাতে হচ্ছে তাঁকে। একবার লিফটে নামছেন, তো আবার দৌড়ে ফিরছেন চারতলায়। সব ব্যস্ততার মাঝেও তাঁর চোখ আটকে আছে আইসিইউর দরজায়।

সেই দরজার ওপাশে শুয়ে আছেন তাঁর একমাত্র ছেলে সাজিদ চৌধুরী ওরফে রাফি (২১)। মাথায় গুরুতর আঘাত নিয়ে কয়েক দিন ধরে নিউরোসার্জারি বিভাগের অধীনে ভর্তি আছেন তিনি। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তাঁর অবস্থা সংকটাপন্ন।

ফুফুকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে ফেরার পথে গত মঙ্গলবার দিবাগত রাত একটার দিকে মাথায় ইট ছুড়ে মেরে চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে ফেলে দেওয়া হয় সাজিদকে। এই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

এ ঘটনায় হত্যাচেষ্টার অভিযোগে কাফরুল থানায় মামলা করেছেন সাজিদের চাচা নুর হোসেন। মামলার চার আসামির মধ্যে তিনজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। আসামিরা হলেন মো. পারভেজ, আনোয়ার হোসেন বাবু ও মো. ফয়সাল ওরফে কালু। আমিন নামে এক আসামি পলাতক।

রাজধানীর পূর্ব শেওড়াপাড়ার এই ঘটনায় পরিবার প্রথমে ভেবেছিল এটি দুর্ঘটনা। কিন্তু সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়া কয়েক সেকেন্ডের দৃশ্য তাঁদের সামনে খোলে সত্যিটি—সাজিদ দুর্ঘটনায় নয়, পরিকল্পিত হামলার শিকার। এখন চিকিৎসকেরা মাকে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে বলছেন, কারণ একমাত্র ছেলের জ্ঞান আর না–ও ফিরতে পারে।

যে রাত বদলে দিল সবকিছু

গত মঙ্গলবার দিবাগত রাত সোয়া একটার দিকে রাজধানীর পূর্ব শেওড়াপাড়ায় মোটরসাইকেল চালিয়ে ফিরছিলেন সাজিদ। কিছুক্ষণ আগে তিনি তাঁর ফুফুকে বাসায় পৌঁছে দিয়েছিলেন। বাড়ি ফেরার পথে আক্রান্ত হন।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, কয়েকজন ব্যক্তি আগে থেকেই ওত পেতে ছিলেন। সাজিদ মোটরসাইকেল নিয়ে সামনে আসতেই তাঁর মাথা লক্ষ্য করে ছুড়ে মারা হয় ইট। এতে মুহূর্তেই মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কে ছিটকে পড়েন তিনি।

সাজিদ চৌধুরী ওরফে রাফি

১৪ জুন হাসপাতালে কথা হয় সাজিদের মা তানিয়া সিকদারের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনার দিন তিনি ঢাকার বাইরে নানির বাসায় ছিলেন। সাজিদদের পৈতৃক বাড়ি ইব্রাহিমপুরে। সাজিদের এক ফুফু সেদিন বাসায় এসেছিলেন। রাতে সাজিদ বন্ধুর মোটরসাইকেল চালিয়ে ফুফুকে তাঁর শেওড়াপাড়ার বাসায় পৌঁছে দিতে গিয়েছিলেন। ফেরার সময় রাত সোয়া একটার দিকে হামলার শিকার হন।

পরিবারের লোকজন সাজিদকে প্রথমে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে এটা ‘পুলিস কেস’ উল্লেখ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ডিএমসি) যেতে বলা হয়। পরে ডিএমসির নিউরোসার্জারি বিভাগে ভর্তি করা হয়।

হামলার পর অভিযুক্তরা নিজেদের অটোরিকশায় করে কিছুদূর নিয়ে গিয়ে সাজিদকে রাস্তায় ফেলে রেখে চলে যান। পরে সাজিদ অন্য একটি অটোরিকশায় করে বাড়ি ফেরেন। তখনো বলতে পেরেছিলেন, তাঁকে মেরেছে। এরপরই জ্ঞান হারান।
নুর হোসেন, মামলার বাদী ও সাজিদের চাচা

মা তানিয়া বলেন, সিসিটিভে ফুটেজ প্রকাশ হওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁরা এটাই বিশ্বাস করেছিলেন যে ভবনের ইট পড়ে সাজিদ আহত হয়েছেন।

এ ঘটনায় হত্যাচেষ্টার অভিযোগে কাফরুল থানায় মামলা করেছেন সাজিদের চাচা নুর হোসেন। মামলার চার আসামির মধ্যে তিনজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। আসামিরা হলেন মো. পারভেজ, আনোয়ার হোসেন বাবু ও মো. ফয়সাল ওরফে কালু। আমিন নামে এক আসামি পলাতক।

দুবাই ফেরার কথা ছিল যেদিন

সাজিদের মা তানিয়া সিকদার ১০ বছর ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে চাকরি করেন। ঈদুল আজহার ছুটিতে ২০ দিনের জন্য দেশে এসেছিলেন। ১২ জুন তাঁর আবার দুবাই ফেরার ফ্লাইট ছিল। কিন্তু তাঁর সেই যাত্রা আর হয়নি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এটা মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের ঘটনা হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে। তবে এটা ছিনতাই না, পূর্বশত্রুতা থেকে হামলা। ছিনতাইয়ের ঘটনা হলে আসামিরা মোটরসাইকেল নিয়ে যেতেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মোটরসাইকেল পেয়েছে। সেটা জব্দ করে থানায় এনেছে।

ভোররাত চারটার দিকে তিনি খবর পান, ছেলে হাসপাতালে। ঢাকার বাইরে নানির বাড়িতে থাকা তানিয়া দ্রুত রাজধানীতে ফিরে আসেন। এর পর থেকে হাসপাতালই তাঁর ঠিকানা। তাঁর স্বামী শামসুল চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে মানসিকভাবে অস্থিতিশীল। প্রায় ১২ বছর তাঁরা আলাদা থাকেন। একমাত্র সন্তানকে ঘিরেই ছিল তাঁর সব স্বপ্ন।

পুরোনো বিরোধের রক্তাক্ত পরিণতি

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি কোনো ছিনতাইয়ের ঘটনা নয়। পূর্বশত্রুতার জের ধরে সাজিদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কাফরুল থানার একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, আসামিরা মাদক ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাঁদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও আছে। দুই বছর আগে প্রধান অভিযুক্ত ইট ছুড়ে মারা পারভেজ সাজিদদের ইব্রাহিমপুরের বাসায় ভাড়া থাকতেন। এলাকায় মাদক ব্যবসা নিয়ে সাজিদের আপত্তির কারণেই ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল বলে পুলিশের ধারণা।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এটা মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের ঘটনা হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে। তবে এটা ছিনতাই না, পূর্বশত্রুতা থেকে হামলা। ছিনতাইয়ের ঘটনা হলে আসামিরা মোটরসাইকেল নিয়ে যেতেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মোটরসাইকেল পেয়েছে। সেটা জব্দ করে থানায় এনেছে।

কাফরুল থানার ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, আসামিরা অটোরিকশা নিয়ে মাদক বিক্রি করতে গিয়েছিলেন। সাজিদকে মোটরসাইকেল চালিয়ে আসতে দেখে আমিন হাত তুলে থামতে বলেন। তাঁদের দেখে সাজিদ মোটরসাইকেলের গতি বাড়ালে পারভেজ ইট দিয়ে আঘাত করে ফেলে দেন। আশপাশ থেকে লোকজন কী হয়েছে জানতে চাইলে আসামিরা জানান, ভবনের ইট পড়ে আহত হয়েছে। পরে নিজেদের অটোরিকশায় তুলে নেন সাজিদকে।

অপারেশনের (মাথায় অস্ত্রোপচার) পর থেকে আমার ছেলের অবস্থা বেশি খারাপ হয়ে গেছে। একবারও চোখ খোলেনি। আজ সকাল থেকে শরীর বেশি খারাপ। জ্ঞানের মাত্রা আগের চেয়ে আরও কমেছে। ডাক্তাররা বলছে, আপনি মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকেন। ছেলের জ্ঞান না–ও ফিরতে পারে। আমি কী করব এখন?
তানিয়া সিকদার, সাজিদের মা
সাজিদ চৌধুরী রাফি। তিনি পরিকল্পিত হামলার শিকার হয়েছেন বলে সিসিটিভির ফুটেজে দেখা যাচ্ছে

সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়া ভয়াবহতা

মামলার বাদী সাজিদের বড় চাচা নুর হোসেন বলেন, হামলার পর অভিযুক্তরা নিজেদের অটোরিকশায় করে কিছুদূর নিয়ে গিয়ে সাজিদকে রাস্তায় ফেলে রেখে চলে যান। পরে সাজিদ অন্য একটি অটোরিকশায় করে বাড়ি ফেরেন। তখনো বলতে পেরেছিলেন, তাঁকে মেরেছে। এরপরই জ্ঞান হারান।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, কয়েকজন ব্যক্তি আগে থেকেই ওত পেতে ছিলেন। সাজিদ মোটরসাইকেল নিয়ে সামনে আসতেই তাঁর মাথা লক্ষ্য করে ছুড়ে মারা হয় ইট। এতে মুহূর্তেই মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কে ছিটকে পড়েন তিনি।

নুর হোসেন বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ দেখার আগে তাঁরা বুঝতেই পারেননি, কতটা ভয়ংকর হামলার শিকার হয়েছেন সাজিদ।

নুর হোসেন আরও বলেন, সাজিদের বাবা দীর্ঘদিন হংকংয়ে ছিলেন। দেশে ফেরার পর থেকে মানসিকভাবে সুস্থ নন। বাবা–মা আলাদা থাকায় সাজিদ তাঁর কাছে বড় হয়েছেন, তাঁকে ‘আব্বু’ ডাকেন। তিনি বলেন, অস্ত্রোপচারের পর থেকে সাজিদ আর চোখ খোলেননি।

সাজিদকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে করা মামলায় এই দুজনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ

সংকটাপন্ন সাজিদ, দিশাহারা মা

ছেলের কথা বলতে গিয়ে অঝোরে কাঁদছিলেন মা তানিয়া সিকদার। তিনি বলেন, ‘অপারেশনের (মাথায় অস্ত্রোপচার) পর থেকে আমার ছেলের অবস্থা বেশি খারাপ হয়ে গেছে। একবারও চোখ খোলেনি। আজ সকাল থেকে শরীর বেশি খারাপ। জ্ঞানের মাত্রা আগের চেয়ে আরও কমেছে। ডাক্তাররা বলছে, “আপনি মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকেন। ছেলের জ্ঞান নাও ফিরতে পারে।” আমি কী করব এখন?’

সাজিদের অবস্থা সংকটাপন্ন। মাথায় গুরুতর আঘাত নিয়ে তাঁকে হাসপাতালে আনা হয়েছিল। তাঁর মস্তিষ্কে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়েছে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান, পরিচালক, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, সাজিদের অবস্থা সংকটাপন্ন। মাথায় গুরুতর আঘাত নিয়ে তাঁকে হাসপাতালে আনা হয়েছিল। তাঁর মস্তিষ্কে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়েছে।

মো. আসাদুজ্জামান বলেন, বর্তমানে সাজিদের চেতনার মাত্রা গ্লাসগো কোমা স্কেল (জিসিএস) অনুযায়ী ৭। জিসিএসের স্বাভাবিক মাত্রা ১৫।

আইসিইউর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তানিয়া সিকদারের চোখে শুধু আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা। ছেলের জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে এই মা আবেদন জানিয়েছেন, ‘আপনারা দেখবেন, ওরা (আসামিরা) যেন ছাড়া না পায়। ওরা ছাড়া পেলে অন্য কোনো মায়ের সন্তানেরও এই অবস্থা হবে।’