অনৈতিক কাজের অভিযোগ তুলে শাহ আলী মাজারে হামলা হয়েছে। এ হামলায় জামায়াতে ইসলামীর জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। সেই প্রসঙ্গ টেনে কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার বলেন, ‘এখন তো প্রমাণিত হচ্ছে, মন্দ কাজগুলো আপনারাই করে মাজারের ওপর দোষ চাপাচ্ছেন।’
আজ রোববার দুপুরে মিরপুরের শাহ আলী মাজার প্রাঙ্গণে এক বিক্ষোভ সমাবেশে ফরহাদ মজহার একথা বলেন। শাহ আলী মাজারে ভক্ত ও আশেকানদের ওপর হামলার প্রতিবাদে এই বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। ‘সাধুগুরুভক্ত ও ওলি–আউলিয়া আশেকান পরিষদ’ এবং ‘ভাববৈঠকী’ যৌথভাবে এই সমাবেশের আয়োজন করে।
গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে শাহ আলী মাজারে হামলা হয়। এ সময় মাজারে জিয়ারত ও মানত কার্যক্রম চলছিল। এ হামলা নিয়ে করা মামলার বাদী রেশমি বেগম বলেন, জামায়াতে ইসলামী ও এর সহযোগী সংগঠনের ১০০ থেকে ১৫০ নেতা–কর্মী মাজারের প্রধান গেট দিয়ে ঢুকে তাঁদের ওপর হামলা করেন। তবে পরে জামায়াতের পক্ষ থেকে এ অভিযোগ অস্বীকার করা হয়।
এ মামলায় গতকাল শনিবার পর্যন্ত তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে শাহ আলী থানা–পুলিশ। শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আসামিদের রাজনৈতিক পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে তাঁরা জামায়াতে ইসলামীর নেতা–কর্মী বলে জানতে পেরেছি।’
আজকের সভায় ফরহাদ মজহার বলেন, ‘অভিযোগ উঠেছে, এই হামলার সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী জড়িত। আমি দুঃখ পেয়েছি শুনে। আমি পত্রিকায় দেখেছি। আমি শফিক ভাইকে (জামায়াত আমির) এর আগেও বলেছি, নির্বাচনের আগে আপনি কিসের ভিত্তিতে বলেছিলেন যে ইসলামে নারী নেতৃত্ব হারাম? আপনাকে তো আমি বাহাসে ডেকেছিলাম, কোনো টেলিভিশন শোতে। আপনি তো আসেন নাই। আপনারা বলছেন, গান হারাম। বাহাসে ডাকতেছি—আসেন না। কোথায় গান হারাম? কোন আয়াত নিয়ে বলতেছেন গান হারাম? কোন ধরনের গান হারাম? তর্ক আছে।’
জামায়াতের উদ্দেশে ফরহাদ মজহার বলেন, ‘এর আগেও বলেছি, মাজারে যেসব খারাপ কাজ বলে আমরা মনে করি, অনৈতিক কাজ—এগুলো বন্ধ হওয়া দরকার; কিন্তু এখন তো প্রমাণিত হচ্ছে, মন্দ কাজগুলো আপনারাই করে মাজারের ওপর দোষ দিচ্ছেন। এটা তো হবে না, এটা চলবে না।’
পাগল না থাকলে বিপ্লব হবে না বলে মন্তব্য করেন ফরহাদ মজহার। তিনি বলেন, ‘মাজারের পাগলদের ওপর হামলা করা হয়; কিন্তু জুলাই গণ–অভ্যুত্থান যখন হয়েছে, তখন এই পাগলেরাই বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়েছে। পাগল না হলে নিজের জীবন সে কী করে দিয়ে দিল? পাগল না থাকলে বিপ্লব হবে না। পাগল না থাকলে রাষ্ট্র গঠিত হবে না। পাগল না থাকলে সমাজ গঠিত হবে না।’
ফরহাদ মজহার বলেন, ‘৫ আগস্ট জীবন দিয়ে আমরা এমন রাষ্ট্র পাই নাই। এই রাষ্ট্রে আমরা শহীদ হইয়া, পঙ্গু হইয়া পাই নাই। আমাদের মনে অনেক ব্যথা আছে। তারেক রহমান, অনেক ব্যথা আছে। আপনি ছিলেন লন্ডনে। আপনি বেগম খালেদা জিয়ার সন্তান। এ দেশের গরিব মানুষের ব্যথা বোঝার চেষ্টা করেন। নইলে উড়ে যাবেন।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্দেশে ফরহাদ মজহার বলেন, ‘আপনি এখানে (দেশে) আসার আগেই যখন আমরা ৫ আগস্টের গণ–অভ্যুত্থান করেছি, তখন বিজেপির শুভেন্দু অধিকারী এই দেশে ঢুকবার জন্য লোকজন নিয়ে সীমান্তে এসেছিল। এসে প্রমাণ করতেছিল সেনাবাহিনীকে যে এই দেশের হিন্দুরা নাকি তাদের সেনাবাহিনীর গায়ে অ্যাসিড মারছে। এখানে তারা ঢুকতে চেয়েছিল। ভুলে যাবেন না।’
ফরহাদ মজহার বলেন, ‘এখন তারা বলছে যে বাংলাদেশে এ রকম মাজার ভাঙা হয়, এ রকম যে ইসলামী সন্ত্রাস, এই তৌহিদি জনতা—এদের তো রাষ্ট্রে রাখবার কোনো দরকার নেই। এমনকি কাশ্মীরেও যে অধিকারটুকু পাইছিল, ওই অধিকারও তারা আপনাদের দেবে না। ফলে আপনারা যারা মাজার ভাঙছেন, আপনারা শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশে মাজার ভেঙেছেন।’
বিজেপির প্রসঙ্গ টেনে ফরহাদ মজহার বলেন, ‘তারা মসজিদ ভাঙছে, বিভিন্ন ধর্মের এলাকা ভাঙছে, মানুষের ভক্তির জায়গা ধ্বংস করছে এবং পুরো ভারতবর্ষকে একটা বিরোধের মধ্যে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। একটা যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি করছে। পুরো উপমহাদেশকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করছে। এই যেই রাজনীতি, এই রাজনীতির পক্ষে দয়া করে এই মাজারে আঘাত করে এটাকে ত্বরান্বিত করবেন না। শুভেন্দু অধিকারী এখন কিন্তু পশ্চিম বাংলায় বিজেপি দলের মুখ্যমন্ত্রী তিনি। বিজেপির যে নীতি—ইসলাম নির্মূল নীতি, এই নীতি তিনি বাস্তবায়ন করবেন।’
মাজার নিয়ে তিন দফা দাবি তুলে ধরেন ফরহাদ মজহার। তিনি বলেন, ‘ঐক্যবদ্ধভাবে মাজারের পাগলদের জন্য রাজনীতি করতে হবে। মাজারের ইজারাব্যবস্থা বন্ধ করতে হবে। মাজারে যা কিছু আসে, সেটা যেন এখানকার গরিব মানুষ পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। মাজারের মসজিদের খতিব নিয়োগ ও পরিচালনা কমিটি করা হবে, তাদের অবশ্যই তরিকাপন্থী হতে হবে। তরিকাপন্থী না হলেও তরিকার প্রতি সংবেদনশীল হতে হবে।’
সভায় এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, মাজারে হামলাকে শুধু মাজারে হামলা হিসেবে দেখা যাবে না। এটাকে ভিন্নমতের ওপর হামলা হিসেবে দেখতে হবে।
নির্বাচনের সময় নেতারা মাজারে যান; কিন্তু হামলা হলে যান বলে অভিযোগ তোলেন মজিবুর রহমান মঞ্জু। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের সময় আমরা দেখি, সব নেতা মাজারে যান, মসজিদে যান, মাথায় টুপি পরেন। তখন মাজারের দরকার হয়; কিন্তু আজ যখন মাজারে হামলা হয়েছে, তখন সেই নেতারা কোথায়? ভোটের সময় যারা মাজারে মাজারে ঘোরেন, আজ মাজারের ভক্তরা যখন আহত, নির্যাতিত, নিপীড়িত, তখন তাঁরা কোথায়?’
পুলিশ এই হামলার দায় এড়াতে পারে না বলে মন্তব্য করেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার। আজকের প্রতিবাদ সভায় তিনি বলেন, ‘এ ঘটনার দায় পুলিশ এড়াতে পারে না। পত্রপত্রিকায় পুলিশের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বক্তব্য শুনেছি; কিন্তু একজনের বক্তব্যের সঙ্গে আরেকজনের বক্তব্যের কোনো মিল নেই। আমার কাছে মনে হয়েছে, তাদের প্রশ্রয় ও আশকারাতেই এই হামলা হয়েছে। হামলাকারীদের দেখা যাচ্ছে; কিন্তু যারা উসকানি দিয়েছে, প্রশ্রয় দিয়েছে, তাদের কথাও বলতে হবে।’
সমাবেশে এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব ফরিদুল হক, মাজারের ভক্ত মোহাম্মদ নাছির হোসেন বক্তব্য দেন।