
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আসামিপক্ষের হয়ে আইনি লড়াই করছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, ১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন করা হয়েছিল যুদ্ধাপরাধী ও তাদের সহযোগীদের বিচার করার জন্য। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এই ট্রাইব্যুনালের কার্যধারায় ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় ঘটা ঘটনাগুলোর বিচারও যুক্ত করা হয়েছে। এর আগে ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধীদের বাইরে অন্য কারও বিচার হয়েছে বলে জানা নেই।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে বুধবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন মনসুরুল হক চৌধুরী। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দুই বছর পূর্তি হয়েছে বুধবার। ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ পুনর্গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল।
দুই বছর পূর্তিতে ট্রাইব্যুনাল-১-এ প্রসিকিউশন (রাষ্ট্রপক্ষ) কথা বলেছে। পরে ট্রাইব্যুনালও দুই বছর পূর্তিতে কথা বলেন। বিচারকাজে সহযোগিতা করার জন্য রাষ্ট্রপক্ষ, আসামিপক্ষের আইনজীবী, আসামিসহ সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। পরে ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত আসামিপক্ষের আইনজীবীদের পক্ষ থেকে দুই বছর পূর্তিতে আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী কথা বলেন। পুনর্গঠনের দুই বছর পূর্তিতে ট্রাইব্যুনালে কী আলোচনা হয়েছে, তা রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষ সাংবাদিকদের জানায়।
গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও সাবেক খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে করা মামলায় বুধবার (১৪ অক্টোবর) সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য ছিল। এই মামলার আসামিদের আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী। এ ছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধের আরও কয়েকটি মামলায় আসামিপক্ষের আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
এদিন শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে কথা বলেন আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ট্রাইব্যুনাল দুই বছর আগে গঠিত হয়েছে, এটা ঠিক নয়।
১৯৭৩ সালে যে উদ্দেশ্য নিয়ে ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছিল, সেই আইনটা চলমান ছিল। ২০১০ সালে সংশোধন হলো, তারপর এখন যে ট্রাইব্যুনালের প্রক্রিয়া, সেটি ২০২৪ সালের পর সংশোধন করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের কার্যধারায় কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। এই ট্রাইব্যুনালের কার্যধারার মধ্যে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় সংঘটিত কিছু ঘটনা, এগুলোর বিচার এখানে নিয়ে আসা হয়েছে। এতে আইনের যে উদ্দেশ্য, তা ব্যাহত হবে।
মনসুরুল হক চৌধুরী বলেন, আইনটি হয়েছিল যুদ্ধাপরাধী ও তাদের সহযোগীদের বিচার করার জন্য। অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের পর এই আইন সংশোধন করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার আইনত বৈধ সরকার ছিল কি না, তাদের আইনত কোনো ক্ষমতা ছিল কি না—এ ধরনের আইনের সংশোধন করার যে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালে যত ঘটনা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের, সব ঘটনার বিচার এখানে করতে হবে। এই বিষয়টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো এক সময় এটা দেখা হবে।
সাক্ষ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল যদি সঠিক মূল্যায়ন করতে চান, ঘটনাপ্রবাহকে যদি সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করতে চান এবং ন্যায়বিচার যদি প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তাহলে ঘটনার গভীরে যেতে হবে বলেও উল্লেখ করেন মনসুরুল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরপর যেসব ব্যক্তি ঘটনার সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করে বিভিন্ন বক্তব্য-বিবৃতি দিয়েছেন, এগুলো ট্রাইব্যুনালের আমলে নেওয়া উচিত। এ ব্যাপারে ট্রাইব্যুনাল কিছু বলেননি। তিনি এই আবেদন রেখেছেন। আসামিপক্ষকে আরও সুযোগ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন।
একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য এই ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছিল। প্রসিকিউশন বলছে, মানবতাবিরোধী অপরাধ যখনই হবে, তার বিচার এখানে করা সম্ভব এবং আইনে তা বলা আছে।
জবাবে মনসুরুল হক চৌধুরী বলেন, একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধে যে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, সে অপরাধের জন্যই এই আইন হয়েছে। আইনটা ১৯৭৩ সালে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘উইথ সাম পারপাস ২০০৯ থেকে ২০২৪, একটি সরকারকে এবং সরকারের যাঁরা সমর্থক, তাঁদের বিরুদ্ধে এই আইনটা প্রয়োগ করার জন্য এই অ্যামেন্ডমেন্ট হয়েছে।’
আওয়ামী লীগ সরকার তো ২০১০ সালে এই আইনের সংশোধন করেছে—সাংবাদিকের এ প্রশ্নের জবাবে মনসুরুল হক চৌধুরী বলেন, ‘২০১০-এ অ্যামেন্ডমেন্ট করে এই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বাইরে, অন্য বিচার এখানে হয়েছে বলে আমার জানা নেই।’