
মানিক ব্যাপারী ও তাঁর স্ত্রী শেফালী মন খারাপ করে ফিরে আসছিলেন। সকাল সকাল তাঁরা গিয়েছিলেন ইমামনগরে পরিচিত এক বাড়িতে কাজের জন্য। কোনো বাঁধাধরা কাজ নেই তাঁদের। দিনমজুরি করেন। আগের দুই দিন কোনো কাজ পাননি।
ইমামনগরের ওই বাড়িতে (গৃহস্বামীর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) মানিক-শেফালী দম্পতি প্রায়ই কাজ করেন। আশা ছিল, আজও কিছু জুটবে। কিন্তু গৃহকর্তা জানিয়েছেন, বাড়ি বা জমিজমায় আপাতত কাজের লোকের প্রয়োজন নেই। তাই মনমরা হয়ে ফিরছিলেন তাঁরা।
এই দম্পতির সঙ্গে গত সপ্তাহে দেখা হয়েছিল ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে চার কিলোমিটার দূরে দোহার সড়কের মাঝিরকান্দা সেতুর কাছে। মানিকের পরনে শুধু লুঙ্গি, শেফালীর মলিন থ্রি-পিস। বেশ ক্ষুধার্ত দেখাচ্ছিল তাঁদের। দুদিন আগে ইমামনগর গ্রামে কদমগাছ কেটে লাকড়ি করার কাজ করেছিলেন তাঁরা। এর পর থেকে আর কোনো কাজ নেই। মানিক বলেন, ‘আমরা নিত্য আনি নিত্য খাই। আইজ তিন দিন ধরে কাজ নাই। খুব কষ্টে আছি।’
কথা আরেকটু এগোল তাঁদের সঙ্গে। পদ্মার ওপারে ফরিদপুরে এককালে তাঁদের পৈতৃক বাড়ি ছিল। তাঁদের জন্মের অনেক আগে নদীভাঙনে সেসব নিশ্চিহ্ন হয়েছে। নবাবগঞ্জের বলমন্ত চরের বাগমারা এলাকায় এখন থাকেন তাঁরা। ঘরভাড়া দিতে হয় ১ হাজার ৫০০ টাকা। তাঁদের তিন মেয়ে, এক ছেলে। বড় মেয়ে মরিয়ম আক্তারের বিয়ে দিয়েছেন সম্প্রতি ৮০ হাজার টাকা খরচ করে। বান্দুরায়। জামাই মোটর গ্যারেজের মেকানিক, আয় ভালোই। কিন্তু এত টাকা জোগাড় হলো কী করে?
দিনমজুরি করা ছাড়া আর কোনো কাজও জানা নেই মানিক-শেফালী দম্পতির। উপার্জনের বিকল্প কোনো উৎসও নেই। টানা তিন দিনের বেকারত্ব চতুর্থ দিনে ঘুচবে কি, কে জানে! বাগমারার দিকে ফিরতি পথে চলে যাচ্ছিলেন তাঁরা এই অনিশ্চয়তা নিয়েই।
এবার শেফালী জানালেন, বাগমারা গ্রাম ও আশপাশের যেসব গ্রামে তাঁরা কাজ করেন, মেয়ের বিয়ের জন্য সাহায্য চাইলে গৃহস্বামীদের অনেকে বেশ ভালো রকম অর্থসহায়তা দিয়েছেন। এ এলাকার মানুষের অবস্থা ভালো। অনেকে বিদেশে থাকেন। দান-খয়রাতের হাত ভালো। সাহায্য চাইলে তাঁরা ফেরাননি। এর পাশাপাশি নিজেদের কাছে একটু একটু করে জমানো যা ছিল, তাই দিয়ে বিয়ের পর্ব পার হয়েছে। তবে মেয়ের বিয়ে দিতে গিয়ে তাঁদের হাত একেবারে শূন্য। অন্য দুই মেয়ে সাবিহা আনজুম আর মিম আক্তার গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। সবার ছোট সন্তান ছেলে। নাম নূর মোহাম্মদ। তাকে সৈয়দপুরে এক আবাসিক মাদ্রাসায় দিয়েছেন।
মানিক-শেফালী বলেন, তাঁদের সংসারে অনেক খরচ। ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা, ঘরভাড়া আর বাজার খরচ। ধরাবাঁধা আয় থাকলে কিছুটা নিশ্চয়তা থাকে। কিন্তু তা নেই। ফলে সব সময়ই একরকম দুশ্চিন্তা মনের মধ্যে কালো মেঘের মতো ছেয়ে থাকে। মাসে ২০-২২ দিনের বেশি কাজ জোটে না। কোনো কোনো মাসে আরও কম। এমনও হয় যে সারা মাসে মাত্র ১০-১২ দিন কাজ মেলে। বাকি দিনগুলো বেকার কাটে। এ এলাকায় এখন দিনমজুরি খাবার ছাড়া ৫০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করে। মানিক পুরো মজুরি পেলেও শেফালি পান অর্ধেক। কোনো দিন মানিক কাজ পান তো শেফালি পান না। ফলে মাসে গড়পড়তা ১২ থেকে ১৬ হাজার টাকার আশপাশেই থাকে তাঁদের আয়।
বাজারদরের লম্বা ফিরিস্তি দিয়ে এই দম্পতি বলেন, মাছ-মাংসে তো হাত দেওয়া যায় না, ডিমের হালিও ৬০ টাকা। চাল ৪৫ টাকা থেকে বেড়ে এখন ৫৫ টাকা। ৬০ টাকা কেজির কমে কোনো সবজি নেই, তেলের দাম ২১০ টাকা লিটার। এসব বলতে বলতে একপর্যায়ে বলেন, বিস্তারিত বলে কী হবে, এসব সবাই জানেন। দম্পতির কথার উপসংহার হলো—ইদানীং বাজারদর যেমন বেড়েছে, তাতে এই আয়ে তাঁদের অনেক দিনই তিন বেলার খাবার হয় না।
দিনমজুরি করা ছাড়া আর কোনো কাজও জানা নেই মানিক-শেফালী দম্পতির। উপার্জনের বিকল্প কোনো উৎসও নেই। টানা তিন দিনের বেকারত্ব চতুর্থ দিনে ঘুচবে কি, কে জানে! বাগমারার দিকে ফিরতি পথে চলে যাচ্ছিলেন তাঁরা এই অনিশ্চয়তা নিয়েই।