ফেসবুকে পারসিয়ান বিড়াল দত্তক দেওয়ার এমন প্রলোভনে প্রতারিত হচ্ছেন অনেক।
ফেসবুকে পারসিয়ান বিড়াল দত্তক দেওয়ার এমন প্রলোভনে প্রতারিত হচ্ছেন অনেক।

পারসিয়ান বিড়ালে প্রতারণার ফাঁদ

পারসিয়ান বিড়াল বিনা মূল্যে দত্তক দেওয়া হবে, এমন ফেসবুক পোস্টে আগ্রহী হয়ে ফাঁদে পড়ছেন কয়েকজন। বিনা মূল্যের হলেও দিনাজপুর থেকে পাঠানোর খরচ হিসেবে নানা অজুহাতে টাকা নেওয়ার পর বিড়ালের বাচ্চা হয়েছে, এমন কথা বলেও চাওয়া হয় বাড়তি অর্থ। কিন্তু এরপর বিড়াল আর আসেনি, লাপাত্তা ফেসবুক পোস্টদাতাও।

এমন প্রতারণার শিকার হয়ে কয়েকজন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৮ জানুয়ারি মামলা করেছেন। এটি তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)।

মামলায় বাদী হয়েছেন নিয়াজ মাহমুদ। তিনি ঢাকার খিলক্ষেত থানার পূর্ব কুড়িলে থাকেন। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ সেমিস্টারের শিক্ষার্থী তিনি। মামলার সাক্ষীরা হলেন সাভারের তনিমা মেহেরীন, ঢাকার জুরাইনের সোহানা আক্তার, ময়মনসিংহের মনিষা আক্তার মনসুরা। গত বছরের ৩১ অক্টোবর থেকে ১ নভেম্বর পর্যন্ত ফেসবুকে প্রতারণার বিভিন্ন ঘটনাকে তুলে ধরে মামলাটি করা হয়েছে।

দিনাজপুর থেকে নিয়াজ মাহমুদের কাছ থেকে প্রথমে ৬০০ টাকা চাওয়া হয়। এরপর কয়েক দফায় নেওয়া হয় আরও ৩ হাজার ৪৫০ টাকা। কিন্তু বিড়াল আর আসেনি।

আরহাম হোসাইন মনির নামে এক ব্যক্তিসহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে মামলায় আসামি করা হয়েছে। তাঁদের ঠিকানা ও পরিচয় জানা যায়নি। যে নম্বরগুলো থেকে তাঁরা যোগাযোগ করতেন, সেগুলো এখন বন্ধ।

মামলাকারী নিয়াজ মাহমুদের আইনজীবী বাহাউদ্দিন আল ইমরান প্রথম আলোকে বলেন, মামলাটির তদন্ত শেষে আগামী ২২ ফেব্রুয়ারি আদালতে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে ডিবিকে।

যেভাবে প্রতারণার খপ্পরে

মামলার বাদী নিয়াজ মাহমুদ গত বছরের ৩১ অক্টোবর আরহাম হোসাইন মনিরের ফেসবুকে পোস্টে পারসিয়ান বিড়ালটি সম্পর্কে জানতে পারেন। সেখানে ‘আর্জেন্ট’ লিখে বিড়াল দত্তক নেওয়া প্রসঙ্গে দেওয়া পোস্টে বলা হয়েছিল, বিড়াল বেচাকেনা যেহেতু হারাম, তাই ভালো একটি পরিবারকে দিতে চাই। যাদের আগে বিড়াল পালার অভিজ্ঞতা আছে, আর মাঝে মাঝে দেখাতে পারবে, তাদেরই দেওয়া হবে। মেয়ে বিড়াল। ভ্যাকসিন দিতে হবে।

অনেকেই বলছে তুমিই প্রতারণার বিষয়টি ধরতে পারো নাই, আমরা পারব কীভাবে? আসলেই আমি বুঝতে পারিনি।
—তনিমা মেহেরীন, শিক্ষানবিশ আইনজীবী

ভুল বানানে লেখা এই পোস্টদাতার ফেসবুক প্রোফাইল ছবিটি ছিল পবিত্র কাবা শরিফের সামনে তার দাঁড়ানো অবস্থায়।

নিয়াজ মাহমুদ এই পোস্ট দেখে আরহাম হোসাইন মনিরের মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করেন। নিয়াজ মামলার এজাহারে বলেছেন, তখন এক নারী ফোন ধরে বিড়ালের বিষয়ে ভয়েস মেসেজে বিভিন্ন তথ্য জানাতে থাকেন। দিনাজপুরের বিরামপুরের মিজান মার্কেট এলাকায় গিয়ে বিড়ালটি নিয়ে আসতে বলেন। তাতে অসুবিধা হলে বিড়ালটিকে বাসে করে ঢাকা পাঠাতে পারবেন বলে জানান।

তখন নিয়াজ তাঁর বন্ধু সিয়াম আহমেদকে পাঠিয়ে বিড়ালটি আনতে পারবেন বলে জানান। নিয়াজকে পরদিনই সকাল ৯টায় গিয়ে বিড়ালটি আনতে বলা হয়। কিন্তু ঠিক ওই সময়ে ওই বন্ধুর পক্ষে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না নিয়াজ জানালে আসামিরা আবার যোগাযোগ করে জানান, বিড়ালটিকে রাতের বাসেই ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করছেন। তবে খরচ বাবদ ৬০০ টাকা পাঠাতে হবে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে কোন নম্বরে টাকা পাঠাতে হবে, তা জানিয়ে দিলে নিয়াজ টাকা পাঠান।

সাভারের শিক্ষানবিশ আইনজীবী চার হাজার ৮০০ টাকা পাঠিয়েও বিড়াল পাননি। তিনি বলেছেন, এমন প্রতারণার শিকার হয়ে অর্থ খুইয়েছেন অনেকে।

নাবিল পরিবহনের একটি বাসে বিড়ালটি ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে বলে নিয়াজকে জানানো হয়। এরপর এ পরিবহনের কর্মী পরিচয়ে একজন নিয়াজকে ফোন করে জানান, বিড়ালটিকে ঢাকা পাঠাতে হলে বিড়ালের জন্য বিশেষ ব্যাগ কিনতে হবে। খরচ দিতে হবে ১ হাজার ৪৫০ টাকা। নিয়াজ টাকা পাঠালে কিছুক্ষণ পর ওই ব্যক্তি আবার ফোন করে করে বলেন, তিনি যে বিড়ালটি নিতে চাচ্ছেন ওটার জন্য বড় ব্যাগ লাগবে, তাই আরও ১ হাজার ২০০ টাকা লাগবে। তখন নিয়াজ আরেকজনের মাধ্যমে এ টাকাও পাঠান।

কিছুক্ষণ পর পরিবহনকর্মী পরিচয় দেওয়া ব্যক্তি নিয়াজকে ফোন করে জানান, বিড়ালটি বাচ্চা প্রসব করেছে। প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছে। তাই বিড়ালের মালিক যাতে বিড়ালটি নিয়ে যান। নিয়াজ ফোন করে বিড়ালদাতাদের নম্বরে ফোন করলে তাঁরা নিয়াজকে জানান, তাঁদের মামা মারা গেছেন, তাই তাঁরা এখন যেতে পারবেন না। নিয়াজ আবার বাসের ওই ব্যক্তিকে ফোন করেন। তিনি তখন বলেন, আরও ৬০০ টাকা পাঠালে বিড়ালটিকে যত্ন করে পাঠাতে পারবেন।

রাজধানীতে বিড়াল পোষার মানুষ যে বেড়েছে, তা দেখা যায় সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পেট কার্নিভালে

দিনভর ফোনে কথা চালাচালির পর পরদিন ১ নভেম্বর সকালে নিয়াজ খিলক্ষেতে বাসের নির্ধারিত কাউন্টারে গিয়ে অপেক্ষা করার সময় বাসের ওই ব্যক্তিকে ফোন দেন। নিয়াজ বলেন, কিন্তু ওই ব্যক্তি নানা হুমকি দিতে থাকেন। সন্দেহ হওয়ায় তিনি বিড়ালদাতাদের যে নম্বরগুলোতে এর আগে কথা হয়েছিল, সে নম্বরগুলোতে চেষ্টা করে দেখেন তাঁকে ব্লক করে দেওয়া হয়েছে।

নিয়াজ তখন সরকারি জরুরি সেবার নম্বর ৯৯৯–এ কল করে বিষয়টি জানিয়ে বিড়ালটি উদ্ধার করে দেওয়ার অনুরোধ জানান। কিন্তু সেখান থেকে সদুত্তর না পেয়ে খিলক্ষেত থানায় মামলা করতে যান। কিন্তু থানায় মামলা না করে আদালতে মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হয় নিয়াজকে।

নিয়াজ এভাবে প্রতারিত হওয়ার ঘটনা তুলে ধরে ফেসবুকে পোস্ট দিলে একই ধরনের প্রতারণার শিকার অন্য ব্যক্তিরাও তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানাতে থাকেন। নিয়াজের সঙ্গে যোগাযোগ করে মামলায় যুক্ত হওয়া এবং সাক্ষ্য দিতে আগ্রহী হওয়ার কথাও বলেন।

প্রতারিত আরও, দিনাজপুর থেকেই

এই মামলার সাক্ষী সাভারের তনিমা মেহেরীন একজন শিক্ষানবিশ আইনজীবী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনেকেই বলছে তুমিই প্রতারণার বিষয়টি ধরতে পারো নাই, আমরা পারব কীভাবে? আসলেই আমি বুঝতে পারিনি।’

প্রতারণার ফাঁদে কীভাবে পড়লেন, জানতে চাইলে তনিমা বলেন, তাঁর একটি দেশি-বিদেশি মিশ্র জাতের বিড়াল আছে। পারসিয়ান বিড়াল নিয়ে পোস্ট দেখলে দাম জানতে চাইতেন। তারপর একদিন একজনের কাছ থেকে ফোন পেলেন পারসিয়ান পুরুষ বিড়াল লাগবে কি না। জানালেন, তাঁরা স্বামী–স্ত্রী কানাডা চলে যাবেন। ধর্মীয় নানা কথা বলে জানালেন, তাঁরা বিড়াল বিক্রি করবেন না। ভালো একটি পরিবার চাচ্ছেন, যিনি তাঁদের বিড়ালটিকে ভালো রাখবেন।

স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দেওয়া এই প্রতারক দম্পতিও দিনাজপুর থেকে বিড়ালকে বাসে তুলে দিতে চেয়েছিলেন বলে জানান তনিমা। ব্যাগের ছবি দিয়ে তাকে জানানো হয়, এর জন্য ৪ হাজার ৫০০ টাকা দিতে হবে। বিড়ালকে পরানোর জন্য ডায়াপারের জন্য দুই হাজার টাকা দিতে হবে। আনুষঙ্গিক সব মিলিয়ে ৬ হাজার টাকা পাঠানোর জন্য চাপ দিতে থাকলে তনিমার মনে একটু সন্দেহ দেখা দেয়। তখন তাঁদের নিজেদের টাকা দিয়ে বিড়াল পাঠাতে বললে জানান, তাঁদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা হয়ে গেছে।

এমন সব পারসিয়ান বিড়াল বিক্রির নানা ছবি আছে ফেসবুকে

তনিমা ৪ হাজার ৮০০ টাকা পাঠালে বাসে বিড়ালটি পাঠানোর কথা জানানো হয়েছিল তনিমাকে। তিনি বলেন, ‘প্রতারকেরা জানায় রাত ৯টার দিকে বিড়ালকে বাসে তুলে দেবে। তারপর একসময় দেখলাম, আমার সঙ্গে কথোপকথনের সবকিছু ডিলিট করে ফেলেছে। আমাকেও ব্লক করে দিয়েছে।’

‘আমার হয়তো ৪ হাজার ৮০০ টাকা গেছে। কিন্তু প্রতারণার ফাঁদে পড়ে অনেকে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকাও দিয়ে দিচ্ছেন প্রতারকদের। এভাবে সংখ্যাটা শুধু বাড়ছেই,’ বলেন তিনি।

তনিমা বলেন, মামলা করার পরও ফেসবুকে বিড়ালের প্রলোভন দেখিয়ে পোস্ট দেওয়া বন্ধ হয়নি। একই বিড়ালকে একবার বিছানায় বসিয়ে আবার বাথরুমে নিয়ে ছবি তুলে পোস্ট দেওয়া হচ্ছে, যাতে অন্য কেউ বুঝতে না পারেন যে একই বাসার ছবি।

বিড়াল পালার সংখ্যাও বেড়েছে

কোভিড মহামারির পর থেকে ঢাকাসহ সারা দেশেই পোষা প্রাণী বিশেষ করে বিড়াল লালন–পালনকারী মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। ২০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) এবং কেয়ার ডিইউ–এর উদ্যোগে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি প্রাঙ্গণে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয় ‘পেট কার্নিভ্যাল’। সেখানেও বিড়ালের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।

গত বছরের ২১ আগস্ট প্রথম আলোতে ‘হাসপাতালে দীর্ঘ লাইন, বেশির ভাগ রোগীই বিড়াল’ শিরোনামের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকার ৪৮ কাজী আলাউদ্দিন রোডে অবস্থিত কেন্দ্রীয় ভেটেরিনারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর মধ্যে বিড়ালের সংখ্যা প্রায় ৯০ শতাংশ। হাসপাতালটিতে প্রতিদিন গড়ে ৭০০ থেকে ৮০০টি প্রাণীকে নেওয়া হয় চিকিৎসার জন্য।

নগরে এখন অনেকেই বিড়াল পুষছেন। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পেট কার্নিভ্যালে প্রিয় পোষা বিড়ালটিকে নিয়ে র‍্যাম্পে হাঁটেন এই তরুণী

গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোতে ‘বিড়ালের খাবার আমদানি বছরে ৪০০ কোটি টাকার’ শিরোনামের আরেকটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশে শখ করে বিড়াল পোষার প্রবণতা বাড়ছে। এতে বড় হচ্ছে এই প্রাণীর জন্য প্রক্রিয়াজাত খাবারের বাজার।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিড়াল পালার সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি প্রতারণার সংখ্যাও বাড়ছে। আইনজীবী বাহাউদ্দিন আল ইমরান বলেন, এককভাবে চিন্তা করলে প্রতারণার শিকার ভুক্তভোগীর টাকার পরিমাণ কম মনে হতে পারে, তবে প্রতারকেরা এমন শত শত মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। আদালতকে তিনি বলেছেন, প্রয়োজনে তিনি এমন শত শত ভুক্তভোগীকে সাক্ষী হিসেবে হাজির করতে পারবেন।

পিপল ফর অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারপারসন রাকিবুল হক এমিল প্রথম আলোকে বলেন, পোষা প্রাণী যাঁরা কেনেন, দত্তক নেন ও পোষেন, তাঁরা প্রাণীটির প্রতি যথেষ্ট আবেগপ্রবণ থাকেন। ফলে এই ধরনের প্রাণী কেনা ও পরিচর্যার ক্ষেত্রে যাঁরা বাণিজ্যিক সেবা দিচ্ছেন, তাঁদের নৈতিক ও পেশাদার হওয়াটা জরুরি।

প্রাণিপ্রেমীদের প্রতারণা সম্পর্কে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি; একই সঙ্গে বলেন, ব্যবসায়ীদেরও নিজেদের ব্যবসার স্বার্থে নানান ক্ষেত্রে প্রতারকদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে।