শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবরে তাঁর কার্যালয় দখল করেন ছাত্র–জনতা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, তেজগাঁও, ঢাকা, ৫ আগস্ট ২০২৪
শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবরে তাঁর কার্যালয় দখল করেন ছাত্র–জনতা।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, তেজগাঁও, ঢাকা,
৫ আগস্ট ২০২৪

আসিফ মোহাম্মদ শাহানের লেখা

স্থিতিশীলতার সাফল্য, রূপান্তরের সীমাবদ্ধতা

বাংলাদেশের সর্বশেষ অন্তর্বর্তী সরকারের মূল্যায়ন করতে গেলে প্রথমেই একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—এই সরকারকে প্রচলিত মানদণ্ডে বিচার করলে ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আশঙ্কা থাকবে। একে যেমন পূর্ববর্তী কর্তৃত্ববাদী সরকারের সঙ্গে তুলনা করা যায় না, তেমনি পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের সঙ্গেও নয়। এমনকি ১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গেও এর সরাসরি তুলনা যথাযথ হবে না।

কারণ, ১৯৯০-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কাজ ছিল একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করে গণতান্ত্রিক ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ তৈরি করা। কিন্তু ২০২৪ সালের অন্তর্বর্তী সরকারকে সেই দায়িত্বের পাশাপাশি আরও একটি অনেক বড় ঐতিহাসিক প্রত্যাশা বহন করতে হয়েছে—জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে নতুন রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা জন্ম নিয়েছিল, তাকে একটি নতুন প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক বন্দোবস্তে রূপ দেওয়া। অর্থাৎ এই সরকার ছিল সত্যিকার অর্থেই একটি গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকার। তাই এর মূল্যায়নের মানদণ্ডও হতে হবে অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতা থেকে।

তবে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এটি মনে রাখা প্রয়োজন, ইতিহাসে প্রায় সব গণ-অভ্যুত্থান বা বিপ্লব-পরবর্তী সরকারই একটি জটিল উত্তরণ-সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। ব্রিন্টন (১৯৩৮) কিংবা স্টোন (২০১৪) বিপ্লব-পরবর্তী অস্থিরতার কথা বলেছেন; আসেফ বায়াত সেই অভিজ্ঞতাকে ‘অ্যাগোনি অব ট্রানজিশন’ বা ‘উত্তরণ-সংকট’ ধারণার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন। এ ধরনের সরকারের সামনে একই সঙ্গে দুটি কঠিন দায়িত্ব থাকে।

প্রথমত, পতিত শাসনব্যবস্থার রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করা। দ্বিতীয়ত, অভ্যুত্থান থেকে জন্ম নেওয়া পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়ন করা। কিন্তু এই দুটি লক্ষ্য প্রায়ই একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। সংকট মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন স্থিতিশীলতা, আর সংস্কারের জন্য প্রয়োজন প্রতিষ্ঠিত স্বার্থকে চ্যালেঞ্জ করার রাজনৈতিক সাহস। তাই একটি অভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকারের প্রকৃত সক্ষমতা নির্ভর করে এই দুই বিপরীতমুখী চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার ওপর।

সরকারকে একদিকে অর্থনীতি, প্রশাসন ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে স্থিতিশীল করতে হয়; অন্যদিকে জনগণের প্রত্যাশা থাকে পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ভেঙে নতুন প্রতিষ্ঠান, নতুন নিয়ম ও নতুন সামাজিক চুক্তি প্রতিষ্ঠার।

অর্থাৎ একটি সরকার কতটা সৎ বা জনপ্রিয়, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও শেষ পর্যন্ত নির্ধারক হয়ে ওঠে—সে সংকট মোকাবিলা এবং পরিবর্তনের প্রত্যাশা—এই দুই বিপরীতমুখী দায়িত্ব একসঙ্গে কতটা সামলাতে পারে। সরকারকে একদিকে অর্থনীতি, প্রশাসন ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে স্থিতিশীল করতে হয়; অন্যদিকে জনগণের প্রত্যাশা থাকে পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ভেঙে নতুন প্রতিষ্ঠান, নতুন নিয়ম ও নতুন সামাজিক চুক্তি প্রতিষ্ঠার। স্থিতিশীলতা অনেক সময় ধারাবাহিকতা চায়, আর সংস্কার চায় বিদ্যমান স্বার্থকে চ্যালেঞ্জ করতে। তাই একটি ক্ষেত্রে ব্যর্থতা অন্য ক্ষেত্রকেও দুর্বল করে দেয়। সরকার যদি সংকট সামলাতে না পারে, তাহলে জনগণের আস্থা হারায়; আর জনগণের আস্থা হারালে কাঠামোগত সংস্কারের রাজনৈতিক ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য এই চ্যালেঞ্জ আরও কঠিন ছিল। কারণ, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় যে রাজনৈতিক ঐক্য তৈরি হয়েছিল, তার ছিল একটি অভিন্ন লক্ষ্য—কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান। সেই লক্ষ্য পূরণ হওয়ার পর খুব দ্রুতই রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের নির্বাচনী ও সাংগঠনিক স্বার্থ রক্ষার হিসাব–নিকাশে ফিরে যায়। ফলে সরকারকে এমন এক বাস্তবতায় কাজ করতে হয়, যেখানে ঐকমত্যের জায়গা দখল করে প্রতিযোগিতা, অবিশ্বাস ও রাজনৈতিক দর-কষাকষি। এই বাস্তবতা বিবেচনায় না নিলে অন্তর্বর্তী সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতা—কোনোটিই সঠিকভাবে বোঝা সম্ভব নয়।

আসিফ মোহাম্মদ শাহান

এই প্রেক্ষাপটে সংকট মোকাবিলার ক্ষেত্রে সরকারের পারফরম্যান্সকে মোটামুটি ইতিবাচকই বলতে হবে। অর্থনীতি এমন এক অবস্থায় ছিল, যেখানে অনেকেই গভীর সংকটের আশঙ্কা করেছিলেন। যদিও সরকার দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কারের পথে খুব বেশি এগোয়নি, তবু অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। একইভাবে জটিল আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক পরিবেশেও তারা তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে পেরেছে। একটি শক্তিশালী প্রতিবেশী রাষ্ট্র যখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তর নিয়ে স্পষ্ট অস্বস্তি প্রকাশ করছিল, তখনো সরকার অপ্রয়োজনীয় সংঘাত এড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হয়। এই অর্জনগুলোকে অবহেলা করা ঠিক হবে না।

কিন্তু জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের প্রকৃত পরীক্ষা ছিল অন্য জায়গায়। এই আন্দোলনের লক্ষ্য কেবল একটি অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করা ছিল না। এর কেন্দ্রে ছিল একটি নতুন সামাজিক চুক্তির আকাঙ্ক্ষা—এমন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা, যা হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈষম্যহীন এবং যা প্রতিষ্ঠা করবে একটি দায় ও দরদের সমাজ।

এই প্রত্যাশার বিচারে অন্তর্বর্তী সরকারের মূল্যায়ন অনেক বেশি মিশ্র। নিঃসন্দেহে সরকার একটি অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে পেরেছে, যা ছিল তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দায়িত্ব। একই সঙ্গে জুলাই সনদের মাধ্যমে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে একটি ন্যূনতম ঐকমত্য গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে। পুরো সময়জুড়ে মতপ্রকাশের ক্ষেত্রও পূর্ববর্তী সরকারের তুলনায় অনেক বেশি উন্মুক্ত ছিল। এই অর্জনগুলো গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং অন্তর্বর্তী সরকার এর জন্য কৃতিত্ব দাবী করতেই পারে।

তবে এখানেই সরকারের সাফল্যের গল্পটা শেষ হয়ে যায়। জুলাই অভ্যুত্থানের লক্ষ্য ছিল কেবল নির্বাচন নয়; বরং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈষম্যহীন ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং তার জন্য প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় সংস্কার নিশ্চিত করা।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংস্কারের রাজনৈতিক কল্পনা সংকুচিত হতে থাকে। যে প্রক্রিয়াটি একটি নতুন সামাজিক চুক্তি নির্মাণের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের চরিত্র পুনর্নির্ধারণ করার কথা ছিল, তা ক্রমে রাজনৈতিক অভিজাতদের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সমঝোতার আলোচনায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। ফলাফল হিসেবে যে ঐকমত্য তৈরি হয়, তা ছিল ভঙ্গুর। ফলে জুলাই সনদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত রয়ে গেছে; আর গণতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি নির্মাণের সুযোগও হয়তো অপূর্ণই থেকে যাবে।

জুলাই অভ্যুত্থানের লক্ষ্য ছিল কেবল নির্বাচন নয়; বরং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈষম্যহীন ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং তার জন্য প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় সংস্কার নিশ্চিত করা।

আরও উদ্বেগজনক ছিল নাগরিক অধিকার রক্ষার প্রশ্নে সরকারের দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থান। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা নারীরা ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ও নাগরিক পরিসর থেকে অদৃশ্য হয়ে যান। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর হামলার ঘটনায় সরকার খুব কম ক্ষেত্রেই দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। একই সঙ্গে মবোক্রেসি উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে ওঠে এবং অনেক ক্ষেত্রে আইনের শাসনের বিকল্প বাস্তবতায় পরিণত হতে শুরু করে। সংবাদমাধ্যমের ওপর হামলা, ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা এবং রাজনৈতিক গোত্রতন্ত্রের পুনরুত্থানও এ সময়ে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। এসব ক্ষেত্রে সরকারের নীরবতা কিংবা অনীহা তার নৈতিক কর্তৃত্বকে দুর্বল করেছে এবং পরিবর্তনের প্রকল্পকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

তাহলে প্রশ্ন হলো, এই ব্যর্থতাগুলো কি অনিবার্য ছিল, নাকি এগুলোর একটি বড় অংশ রাজনৈতিক কৌশল ও রাষ্ট্র পরিচালনার সীমাবদ্ধতার ফল? এই প্রশ্নের উত্তরই আমাদের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রকৃত মূল্যায়নের দিকে নিয়ে যায়। নিশ্চয়ই অন্তর্বর্তী সরকার অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কাজ করেছে এবং সেই বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া উচিত। কিন্তু তাদের কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল, যা কেবল পরিস্থিতির কারণে নয়; বরং রাজনৈতিক কৌশল ও রাষ্ট্র পরিচালনার ঘাটতিরও প্রতিফলন।

এই সীমাবদ্ধতাগুলোর মধ্যে প্রথমটি ছিল সরকারের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির অস্পষ্টতা। জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার যে পরিমাণ জনসমর্থন ও নৈতিক বৈধতা অর্জন করেছিল, বাংলাদেশের ইতিহাসে তার তুলনা খুব কমই আছে। বিআইজিডির ২০২৪ সালের জরিপও দেখিয়েছিল, জনগণ রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অর্থবহ পরিবর্তনের প্রত্যাশা করছিল এবং এর জন্য সরকারকে পর্যাপ্ত সময় দিতে প্রস্তুত।

কিন্তু এই বিরল রাজনৈতিক পুঁজি সরকার কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারেনি। সংস্কারের লক্ষ্য কী, কোন পরিবর্তনগুলো অপরিহার্য, কিংবা সেগুলো সাধারণ মানুষের জীবনকে কীভাবে প্রভাবিত করবে—এসব বিষয়ে সরকার কখনোই একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক ভাষ্য তৈরি করতে পারেনি। ফলে সংস্কারপ্রক্রিয়া ধীরে ধীরে জনসম্পৃক্ততা হারিয়ে রাজনৈতিক অভিজাতদের মধ্যকার আলোচনায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। যে সংস্কারের সামাজিক ভিত্তি তৈরি হওয়ার কথা ছিল, সেটি আর গড়ে ওঠেনি।

সরকার রাজনৈতিক বাস্তবতা ভুলভাবে মূল্যায়ন করেছিল। তারা ধরে নিয়েছিল জুলাইয়ের রাজনৈতিক ঐক্য দীর্ঘস্থায়ী হবে। কিন্তু ইতিহাস বলে, কোনো গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী জোটই দীর্ঘদিন টিকে থাকে না। সাধারণ শত্রুর পতনের পর রাজনৈতিক শক্তিগুলো আবার নিজ নিজ স্বার্থ রক্ষায় মনোনিবেশ করে।

দ্বিতীয়ত, সরকার নিজেই একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির দৃষ্টান্ত স্থাপনের সুযোগ হারায়। দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে মেধাভিত্তিক ও নিরপেক্ষ নিয়োগ নিশ্চিত করার পরিবর্তে তারা অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সমঝোতার পথ বেছে নেয়। একই সঙ্গে তথ্য কমিশন কিংবা মানবাধিকার কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করতে অযৌক্তিক বিলম্ব করে। যে সরকার নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ার কথা বলেছিল, তার নিজের রাজনৈতিক আচরণেই সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা যায়নি।

তৃতীয়ত, সরকার রাজনৈতিক বাস্তবতা ভুলভাবে মূল্যায়ন করেছিল। তারা ধরে নিয়েছিল জুলাইয়ের রাজনৈতিক ঐক্য দীর্ঘস্থায়ী হবে। কিন্তু ইতিহাস বলে, কোনো গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী জোটই দীর্ঘদিন টিকে থাকে না। সাধারণ শত্রুর পতনের পর রাজনৈতিক শক্তিগুলো আবার নিজ নিজ স্বার্থ রক্ষায় মনোনিবেশ করে। বাংলাদেশেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। রাজনৈতিক দলগুলো যখন এই নতুন রূপ নেয়, সরকারের হাতে তখন কোনো বিকল্প কৌশল ছিল না। ফলে সরকার ক্রমশ আলোচনার নিয়ন্ত্রক নয়, বরং রাজনৈতিক চাপের প্রতি প্রতিক্রিয়াশীল একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। এই বাস্তবতাকেই মির্জা হাসান যথার্থভাবেই ‘দুর্বলের ভারসাম্য’ বলে অভিহিত করেছেন, যেখানে সরকার ক্ষমতায় থাকলেও রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে না।

চতুর্থত, অন্তর্বর্তী সরকারের শুরু থেকেই একটি স্পষ্ট নীতিগত অবস্থান নেওয়া উচিত ছিল—কোনো নাগরিকের অধিকার লঙ্ঘন, যে-ই করুক না কেন, কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়; এবং রাষ্ট্রকে সব সময় আইনের শাসন ও যথাযথ বিচারপ্রক্রিয়ার পক্ষেই থাকতে হবে। বাস্তবে সরকার সেই দৃঢ়তা দেখাতে পারেনি। এর পেছনে কারণও ছিল। ম্যাক্স ওয়েবারের ভাষায়, একটি কার্যকর রাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো বৈধ বলপ্রয়োগের একচেটিয়া অধিকার তার হাতে থাকা। কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থানের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা জনগণের আস্থাকে এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল যে অন্তর্বর্তী সরকার সম্ভবত সেই ক্ষমতা প্রয়োগে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। কিন্তু এই দ্বিধার মূল্য ছিল বড়। রাষ্ট্র যখন নিজের বৈধ কর্তৃত্ব প্রয়োগে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তখন অন্য শক্তিগুলো সেই শূন্যস্থান দখল করে।

সরকারের আরও কিছু প্রতীকী পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ ছিল। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর হামলার সময় আরও স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া, সংস্কার কমিশনগুলোতে নারী, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের অধিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা, কিংবা নারী সংস্কার কমিশনের বিরুদ্ধে অনাকাঙ্ক্ষিত ও বিষাক্ত সমালোচনার সময় প্রকাশ্যে তার পাশে দাঁড়ানো—এসব পদক্ষেপ রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারত। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সরকার নীরব থেকেছে। এর ফলে এমন একটি বার্তা গেছে যে সংগঠিত চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে নিজের অবস্থান থেকে সরিয়ে আনা সম্ভব। এতে শুধু সরকারের বৈধতাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি; বরং জুলাই অভ্যুত্থানের সুযোগ নিয়ে নিজেদের সংকীর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের চেষ্টা করা বিভিন্ন গোষ্ঠীও আরও শক্তিশালী হয়েছে।

সবশেষে অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরেই দৃশ্যমান ছিল নেতৃত্বের বিভাজন। পরবর্তীকালে একাধিক উপদেষ্টার বক্তব্য থেকে জানা যায়, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অনেক সিদ্ধান্ত অল্প কয়েকজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল; অনেক উপদেষ্টাকেই নীতিনির্ধারণী আলোচনায় সম্পৃক্ত করা হতো না। যে সরকারকে একটি ঐতিহাসিক উত্তরণকাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এতটা কেন্দ্রীভূত হওয়া কার্যকর শাসনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একই সঙ্গে যাঁরা এখন এই সীমাবদ্ধতার কথা প্রকাশ্যে বলছেন, তাঁদের অনেকেই তখন নীরব ছিলেন। ভেতর থেকে সেই ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের চেষ্টা না করে পরে সমালোচনা করা—এটিও এক অর্থে জুলাই অভ্যুত্থানের প্রতি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতারই আরেকটি প্রকাশ।

অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরেই দৃশ্যমান ছিল নেতৃত্বের বিভাজন। পরবর্তীকালে একাধিক উপদেষ্টার বক্তব্য থেকে জানা যায়, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অনেক সিদ্ধান্ত অল্প কয়েকজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল; অনেক উপদেষ্টাকেই নীতিনির্ধারণী আলোচনায় সম্পৃক্ত করা হতো না।

এই সীমাবদ্ধতাগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু ব্যর্থতা নয়; বরং শুরুতে আলোচিত উত্তরণ-সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্রের সীমিত সক্ষমতারই বহিঃপ্রকাশ। সংকট সামলানো এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া—এই দুই কাজ একই সঙ্গে সম্পন্ন করার মতো রাজনৈতিক প্রস্তুতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার দক্ষতা সরকারের ছিল না। ফলে তারা উত্তরণের প্রথম ধাপ—স্থিতিশীলতা ও নির্বাচন—মোটামুটি সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারলেও দ্বিতীয় ধাপ—নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত নির্মাণ—আর এগিয়ে নিতে পারেনি।

অবশ্যই এই মূল্যায়নের অর্থ এই নয় যে অন্তর্বর্তী সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ ছিল। বরং তাদের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ তৈরি করা এবং একটি গভীর অনিশ্চয়তার সময় রাষ্ট্রকে কার্যকর রাখা। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল, সেটিকে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের সামনে একটি নতুন রাষ্ট্র কল্পনার সুযোগ এনে দিয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার সেই সুযোগকে পুরোপুরি নষ্ট করেনি, কিন্তু ইতিহাস যে বিরল জানালাটি খুলে দিয়েছিল, সেটিকে স্থায়ী রাজনৈতিক বন্দোবস্তে রূপ দেওয়ার সাহস ও সক্ষমতাও দেখাতে পারেনি।

* আসিফ মোহাম্মদ শাহান: অধ্যাপক, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়