আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত ‘আদিবাসী জনগণ: জীবন, ভূমি অধিকার ও সংস্কৃতির সম্মান’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে অতিথিরা। রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে বৃহস্পতিবার সকালে
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত ‘আদিবাসী জনগণ: জীবন, ভূমি অধিকার ও সংস্কৃতির সম্মান’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে অতিথিরা। রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে বৃহস্পতিবার সকালে

আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে সেমিনার

সংবিধানে ‘উপজাতি, নৃগোষ্ঠী’ শব্দ বাদ দিয়ে ‘আদিবাসী’ যুক্ত করার দাবি

সংবিধান সংশোধন করে ‘উপজাতি’ বা ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’র মতো শব্দগুলো বাদ দিয়ে সেখানে ‘আদিবাসী’ শব্দ অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন একটি আলোচনা সভার বক্তারা। একই সঙ্গে আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমি মালিকানার আইনগত স্বীকৃতি, কার্যকর ভূমি কমিশন গঠন এবং তাঁদের ভূমি দখল ও উচ্ছেদ বন্ধে সরকারকে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

আজ বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘আদিবাসী জনগণ: জীবন, ভূমি অধিকার ও সাংস্কৃতিক সম্মান’ শীর্ষক এক সেমিনারে আলোচকেরা এ কথাগুলো বলেন। আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি), ব্লাস্ট, টিআইবি, নিজেরা করি, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদসহ ১৬টি মানবাধিকার ও উন্নয়ন সহযোগী সংগঠন যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে।

সেমিনারে আলোচনাপত্র উপস্থাপন করেন মানবাধিকারকর্মী ইলিরা দেওয়ান। সেখানে বলা হয়, সংবিধানের ২৩(ক) ধারায় থাকা ‘উপজাতি, নৃগোষ্ঠী’ শব্দগুলো বাদ দিয়ে তার পরিবর্তে ‘ইন্ডিজেনাস পিপল’–এর যথোপযুক্ত বাংলা শব্দ যুক্ত করতে হবে।

এমন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান সেমিনারে বলেন, এভাবে ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে না বলে সরাসরি ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহার করে দেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে। ঘুরিয়ে বলার প্রবণতা প্রকারান্তরে আদিবাসী স্বীকৃতির দাবিকে দুর্বল করছে এবং যারা আদিবাসী শব্দ ব্যবহারের বিপক্ষে, তাদের জন্য সুযোগ তৈরি করছে। সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক, ভাষাগত, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ঐতিহ্যের ভিত্তিতে নিজেদের আদিবাসী পরিচয়ে পরিচিত করার অধিকার তাঁদের রয়েছে।

ইফতেখারুজ্জামানের মতে, আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমি মালিকানার আইনগত স্বীকৃতি নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি। তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি কমিশন থাকলেও প্রতিষ্ঠার পর থেকে এটি কার্যকরভাবে ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করতে পারেনি। অন্যদিকে সমতলের আদিবাসীদের জন্য এখনো কোনো পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করা হয়নি।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন, সংবিধানে আদিবাসীদের অধিকারসংক্রান্ত যেসব বিধান রয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলোই এখনো স্পষ্ট নয়। আবার কিছু বিধান কার্যকরভাবে বাস্তবায়নও করা যায়নি। তাঁর মতে, সংবিধানের এসব ধারার যথাযথ ব্যাখ্যা ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত না হলে আদিবাসীদের সার্বিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি সম্ভব হবে না।

সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মাধবী মারমা বলেন, আদিবাসীদের ভূমি অধিকার, ভাষা ও সংস্কৃতি পরস্পরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ভূমি হারালে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়ে। একই সঙ্গে তিনি মাতৃভাষায় শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, সরকার ইতিমধ্যে পাঁচটি আদিবাসী ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা চালু করেছে। তবে শিক্ষকসংকটসহ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি তিনি অভিভাবকদেরও সন্তানদের মাতৃভাষা ও সংস্কৃতিচর্চায় আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।

বর্তমান সরকার আদিবাসী ইস্যুতে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে বলে সেমিনারে মন্তব্য করেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য আন্না মিনজ। তিনি বলেন, জাতীয় সংসদে সমতল ও পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে। সংবিধানে প্রত্যাশিতভাবে স্বীকৃতি না থাকলেও সরকারের বিভিন্ন নীতিগত নথিতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বীকৃতি ও অধিকার অন্তর্ভুক্ত হওয়া আশাব্যঞ্জক।

গারো, সাঁওতাল, চাকমা, মারমাসহ দেশের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যকে শক্তি হিসেবে গ্রহণ করে কাউকে পেছনে না ফেলে সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং। তিনি বলেন, আদিবাসীদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, ভূমি, বন, ভাষা ও মানবাধিকারের বিষয়গুলোতে রাষ্ট্র, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যমসহ সবাইকে আরও সচেতন হতে হবে। তাঁর মতে, পারস্পরিক সম্মান, শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার মাধ্যমেই একটি সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।

সেমিনারটি পরিচালনা করেন এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা। এতে আরও বক্তব্য দেন লেখক ও গবেষক ঈশিতা দস্তিদার।

আরও যেসব দাবি

আলোচনায় আদিবাসীদের অধিকার নিশ্চিতে যেসব দাবি ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়—

১. জাতিসংঘের আদিবাসী–বিষয়ক স্থায়ী ফোরামে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের ধারাবাহিকতায় সরকারিভাবে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালন করা।

২. আদিবাসীদের অধিকার সুরক্ষায় জাতীয় পর্যায়ে একটি পৃথক সেল গঠন করা।

৩. আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় পর্যটন উন্নয়নে তাঁদের সংস্কৃতি, জীবনধারা ও ঐতিহ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করে নীতিমালা প্রণয়ন করা।

৪. আদিবাসীদের জন্য ৫ শতাংশ কোটা এবং অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য অতিরিক্ত ৩ শতাংশ কোটা কার্যকর করা।

৫. আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় স্থানীয় আদিবাসী নারীদের স্বাস্থ্যকর্মী ও ধাত্রী হিসেবে প্রশিক্ষণ ও নিয়োগের ব্যবস্থা করা।