বগুড়ার সারিয়াকান্দির শালুখা চরে গরু চরাতে নিয়ে যাচ্ছেন এক নারী
বগুড়ার সারিয়াকান্দির শালুখা চরে গরু চরাতে নিয়ে যাচ্ছেন এক নারী

ভোর থেকে গোয়ালঘরে, তবু হিসাবের খাতায় নাম নেই নারীদের

ভোরের আলো ফোটার আগেই দিন শুরু হয় রিনা খাতুনের। যমুনা নদীর চরে পাবনার বেড়া উপজেলার চরপেঁচাকোলা গ্রামে তাঁর বাড়ি। ভোরে উঠে ঘরের কাজ শুরুর আগেই গোয়ালঘরে ছুটতে হয় তাঁকে। গরুকে খাবার দেওয়া, গোয়াল পরিষ্কার, বাছুরের দেখভাল, দুধ দোহন—কয়েক ঘণ্টা কেটে যায় এই করেই। এরপর রান্না, সন্তানদের দেখাশোনা, সংসারের অন্য কাজ। কিন্তু মাস শেষে দুধ বিক্রির টাকা কার হাতে যায়? সেই প্রশ্নে রিনা খাতুন একটু থেমে যান। তিনি বলেন, ‘টাকা তো আমার স্বামীর কাছেই থাকে।’

এই গল্প শুধু রিনা খাতুনের নয়, দেশের হাজারো দুগ্ধ খামারি পরিবারের বাস্তবতা। প্রতিদিন ভোর হতেই নারীরা ঢোকেন গোয়ালঘরে, বড় অংশের কাজে শ্রমের জোগান দেন তাঁরা। অথচ তাঁদের এই অবদান থেকে যায় আড়ালেই।

ঢাকায় পাঠানোর জন্য খামারি ও গৃহস্থরা গরু নিয়ে এসেছেন। সম্প্রতি রাজশাহীর বাঘা উপজেলার পদ্মা নদীর হালিম মাস্টারের ঘাটের পাশে

এ পরিপ্রেক্ষিতে আজ ১ জুন বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে বিশ্ব দুগ্ধ দিবস। এবার দিবসের প্রতিপাদ্য ‘দুগ্ধ উৎপাদনে নারী খামারি: উন্নয়নে অগ্রযাত্রা’।

দেশের কৃষি অর্থনীতিতে প্রাণিসম্পদ গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত। এ খাতের অন্যতম চালিকা শক্তি গ্রামীণ নারী। বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) গবেষকদের এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি উৎপাদনে প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের অংশগ্রহণ ১৯৮৭ সালে ছিল ৪৩ শতাংশ। ২০০০ সালে তা বেড়ে ৫১ শতাংশ এবং ২০০৮ সালে আরও বেড়ে ৬৯ শতাংশে পৌঁছায়। এরপর আর কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি, তবে এই হার আরও বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘উইমেন এমপাওয়ারমেন্ট অ্যান্ড লাইভস্টক ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণা বলছে, পশুপালন, খাদ্য সরবরাহ, দুধ সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনের প্রায় সব ধাপেই নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

শ্রম আছে, স্বীকৃতি নেই

প্রখর রোদে ছাতা মাথায় চরে গরু নিয়ে যাচ্ছেন এক নারী। বগুড়ার সারিয়াকান্দির শালুখা চরে

বাংলাদেশের দুগ্ধ খাত এখনো মূলত ক্ষুদ্র পারিবারিক খামারনির্ভর। একটি বা দুটি গরু নিয়ে পরিচালিত খামারের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। এসব খামারে আলাদা শ্রমিক নিয়োগের সুযোগ থাকে না।

ফলে পশুর খাবার প্রস্তুত করা, গোয়াল পরিষ্কার করা, গোবর ব্যবস্থাপনা, বাছুরের পরিচর্যা, দুধ দোহন থেকে শুরু করে অনেক ক্ষেত্রে দুধ সংগ্রহকেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়ার কাজটিও করেন পরিবারের নারীরা। তবে এই শ্রমের বড় অংশই অবৈতনিক। জাতীয় আয় পরিমাপের প্রচলিত ব্যবস্থায় এসব কাজের অর্থনৈতিক মূল্য হিসাবে আসে না। পরিবারের সদস্য হিসেবে করা দায়িত্ব বলেই ধরে নেওয়া হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, বাস্তবে বাংলাদেশের গ্রামীণ নারীদের বড় একটি অংশ দিনে চার ঘণ্টার বেশি সময় ব্যয় করে গবাদিপশুর পেছনে। কিন্তু তাঁদের অধিকাংশের নাম খামারের মালিকানা নথিতে থাকে না। দুধ বিক্রির আয় বা খামার সম্প্রসারণের সিদ্ধান্তেও তাঁদের অংশগ্রহণ সব সময় সমান নয়।

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান প্রথম আলোকে বলেন, দেশের দুগ্ধশিল্প ৯০ শতাংশ ছোট খামারির ওপর নির্ভর করে। এখানে নারীদের শ্রম বেশি, স্বীকৃতি, মালিকানা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ সবই কম। এটা হয়তো বৈশ্বিক প্রবণতাও। কিন্তু এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ দরকার।

দুগ্ধ খামার বদলে দিচ্ছে জীবন

২০০৯ সালে বাবার উৎসাহে মাত্র দুটি গাভি দিয়ে খামার শুরু করেন বেড়া উপজেলার মাহফুজা মীনা। ধীরে ধীরে তাঁর খামারে গরুর সংখ্যা ৮০ ছাড়ায় এবং দৈনিক দুধ উৎপাদন পৌঁছায় প্রায় ৩২০ লিটারে। বর্তমানে পুনর্গঠনের কাজ চলায় উৎপাদন কমে এখন দৈনিক প্রায় ২০০ লিটার।

মাহফুজা শিক্ষকতার পাশাপাশি নিজেই খামারের সার্বিক তদারকি করেন। গরুর খাবার, পরিচর্যা, রোগ ব্যবস্থাপনা ও দুধ বিক্রি—সব ক্ষেত্রেই তাঁর সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। স্থানীয় খামারিদের কাছে তিনি একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিত।

মাহফুজা মীনার ভাষায়, ‘গ্রামের নারীরা খামারের পেছনে অনেক পরিশ্রম করেন, কিন্তু তাঁদের কাজের মূল্যায়ন কম হয়। আমি চাই, নারীরা শুধু সহকারী হিসেবে নয়, খামারের মূল উদ্যোক্তা হিসেবেও পরিচিতি পাক।’

পাবনার ক্ষুদ্র দুগ্ধ খামার নিয়ে ২০২৪ সালে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, দুগ্ধ খামারে নারীদের সম্পৃক্ততা শুধু আয়ই বাড়াচ্ছে না বরং খাদ্যনিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা এবং পরিবারে মতামত দেওয়ার সুযোগও বাড়াচ্ছে।

গবেষণাটি বলছে, একসময় যেসব নারী পরিবারের আর্থিক বিষয়ে কথা বলতেন না, তাঁদের অনেকেই এখন গরু কেনা, খাদ্য কেনা কিংবা সন্তানের পড়াশোনার খরচ–সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে অংশ নিচ্ছেন। মোবাইল ব্যাংকিং, সঞ্চয় ও ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমেও তাঁদের অংশগ্রহণ বাড়ছে।

সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বেড়েছে খানিকটা

গত এক দশকে দুগ্ধ ও প্রাণিসম্পদ খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানেও পরিবর্তন এসেছে। বিএলআরআইয়ের গবেষণা অনুযায়ী, প্রাণিসম্পদ ও হাঁস-মুরগি পালনের ক্ষেত্রে ৪২ শতাংশ পরিবারে নারী প্রধান সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী। ৩৯ শতাংশ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেন পুরুষ এবং ১৯ শতাংশ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত হয় যৌথভাবে।

ময়মনসিংহের ২০০ জন নারী খামারিকে নিয়ে ‘ক্যাবি অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড বায়োসায়েন্স’ সাময়িকীতে ২০২৪ সালে প্রকাশিত হয় ‘লাইভস্টক ফার্মিং অ্যান্ড ওমেন এমপাওয়ারমেন্ট ইন রুরাল বাংলাদেশ: আ মিক্সড মেথড অ্যাপ্রোচ’ শীর্ষক গবেষণাপত্রটি।

এই গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, প্রাণিসম্পদ খাতে যুক্ত নারীদের মধ্যে ৭৫ শতাংশের ক্ষমতায়নের মাত্রা ছিল মধ্যম পর্যায়ের। খামারের আকার, প্রাণিসম্পদ বিষয়ে জ্ঞান, সম্প্রসারণ সেবার সঙ্গে যোগাযোগ ও প্রশিক্ষণ—এসব বিষয় নারীদের প্রাণিসম্পদ খাতে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্তকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করেছে।

গবেষণার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রাণিসম্পদ খাতে অংশগ্রহণকারী নারীদের ক্ষমতায়নের স্কোর অংশগ্রহণ না করা নারীদের তুলনায় গড়ে ১৬ পয়েন্ট বেশি।

তবু রয়ে গেছে বৈষম্য

একই গবেষণা দেখিয়েছে, গ্রামীণ এলাকার নারীরা এখনো নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন। বিশেষ করে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং পর্যাপ্ত বাজার–সুবিধার অভাব অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের প্রাণিসম্পদ খাতে সম্পৃক্ত হওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

নারীরা উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও খামারের মালিকানা, ঋণপ্রাপ্তি বা বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে কতটা পিছিয়ে আছেন, এটা নিয়ে নিজের গবেষণার অভিজ্ঞতা জানালেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সাদিকা হক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ঘরের গরু পালনে সর্বোচ্চ শ্রম দিলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই একজন নারী তো প্রয়োজনে এটি বিক্রি করে দিতে পারেন না।

দেশের দুগ্ধ খাতের বড় উৎস হলো পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলা। পাবনার বেড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জানান, উপজেলায় মোট ৩ হাজার ১৮ জন খামারির মধ্যে প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ জন নারী রয়েছেন। তাঁদের অনেকেই শুধু পরিবারের সদস্য হিসেবে নয়, সরাসরি খামার পরিচালনার সঙ্গেও যুক্ত।

মিল্ক ভিটার আওতাধীন সাঁথিয়া উপজেলার বোয়ালমারী প্রাথমিক দুগ্ধ সমবায় সমিতির সভাপতি বেলায়েত হোসেন বলেন, তাঁদের সমিতির ৭২ জন সদস্যের মধ্যে ৫ জন নারী। এসব নারী সদস্য নিজেরাই গাভির পরিচর্যা, দুধ দোহন, গোখাদ্য সংগ্রহ, গরুর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং সমিতিতে দুধ সরবরাহের মতো কাজ পরিচালনা করেন।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের (২০১৯–২০২২) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইমার্জেন্সি অ্যাকশন প্ল্যানের আওতায় মোট ৫ লাখ ৯৭ হাজার ২৪৯ জন খামারিকে আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হয়। এর মধ্যে পুরুষ খামারিই ছিলেন ৪ লাখ ৮৭ হাজার ৫৭৪ জন, নারী খামারি ১ লাখ ৯ হাজার ৬৪৯ এবং ট্রান্সজেন্ডার ছিলেন ২৬ জন।

অন্যভাবে বললে মোট ৪ লাখ ১৭ হাজার ২০৯টি ডেইরি খামার এবং ১ লাখ ৮০ হাজার ৪০টি পোলট্রি খামার প্রণোদনার আওতায় আসে। এর মধ্যে পুরুষ খামারি ৮১.৬৪ শতাংশ এবং নারী খামারি ১৮.৩৬ শতাংশ।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেইরি সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আশিকউল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুগ্ধশিল্প খাতে নারীরা হলেন আনসাং হিরো। তাঁরা সবচেয়ে বেশি শ্রম দেন। কিন্তু তাঁদের এ শ্রমের স্বীকৃতি মেলে না।’

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) বহুদিন ধরেই বলে আসছে, কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতে নারীদের জন্য পুরুষদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং গ্রামীণ দারিদ্র্য কমে।

বাংলাদেশের দুগ্ধ খাতও এর ব্যতিক্রম নয়। নারীদের প্রশিক্ষণ, ঋণপ্রাপ্তি, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো গেলে এই খাত আরও শক্তিশালী হতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।