
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে আংশিকভাবে বিতর্কমুক্ত বলা গেলেও সম্পূর্ণ প্রশ্নাতীত বলা কঠিন বলে মন্তব্য করেছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)।
সংস্থাটি বলেছে, দীর্ঘ সময় পর তুলনামূলকভাবে অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা গণতান্ত্রিক বৈধতা বাড়িয়েছে। তবে কিছু সীমাবদ্ধতা ও অনিয়মের অভিযোগ ছিল। সেসবের নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আজ বুধবার সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পর্যবেক্ষক সংস্থা হিসেবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে সুজনের এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংস্থার সদস্য একরাম হোসেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট পর্যবেক্ষণের জন্য সুজনের পক্ষ থেকে ৬৪টি জেলার ৬৪টি নির্বাচনী এলাকা বাছাই করা হয়। প্রশিক্ষিত পর্যবেক্ষকদের মাধ্যমে পদ্ধতিগতভাবে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রধান নির্বাচন কমিশনার, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল-বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ-বিভিন্ন রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গণমাধ্যমের মন্তব্যও বিবেচনায় নিয়েছে সুজন।
সুজনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, অধিকাংশ কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তবে কয়েকটি স্থানে সহিংসতা, আচরণবিধি লঙ্ঘন ও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রশাসন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিলেও কিছু অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ভোটের দিন সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণ স্বাভাবিক ছিল বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে সংস্থাটি। তবে গণভোটে কয়েকটি আসনে ভোটারদের প্রভাবিত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভোট গণনা প্রক্রিয়া অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বাভাবিক থাকলেও পঞ্চগড়-২ ও রাজবাড়ী-২ আসনে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সার্বিকভাবে গণভোট প্রক্রিয়া মোটামুটি শান্তিপূর্ণ হলেও কিছু এলাকায় প্রভাব বিস্তার ও অনিয়মের বিচ্ছিন্ন অভিযোগ ছিল।
সার্বিক পর্যবেক্ষণে ৯টি মানদণ্ডে এবারের নির্বাচন মূল্যায়ন করেছে সুজন। এগুলো হলো—
এক. নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন নির্বাচনের আইনি কাঠামোর সঠিকতার জন্য অনেকগুলো সুপারিশ করেছিল। কিন্তু অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ আমলে নেওয়া হয়নি। ফলে এবারের নির্বাচনে সেগুলোর অভাব পরিলক্ষিত হয়।
দুই. ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অধিকাংশ যোগ্য নাগরিক ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিলেন এবং ভোটার তালিকা নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক বা অসন্তোষ তেমনভাবে পরিলক্ষিত হয়নি। ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির মানদণ্ডে নির্বাচনটিকে তুলনামূলকভাবে সন্তোষজনক বলা যায়।
তিন. একটি মানসম্মত নির্বাচনে যোগ্য ও আগ্রহী ব্যক্তিদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ অবাধ ও উন্মুক্ত থাকতে হয়। এই মানদণ্ডের দিক থেকে এবারের নির্বাচন তুলনামূলকভাবে অংশগ্রহণমূলক ছিল।
চার. একটি অর্থবহ নির্বাচনের জন্য নির্বাচকমণ্ডলীর সামনে একাধিক বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক বিকল্প থাকা আবশ্যক। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক জোট ও দল অংশগ্রহণ করায় এবং নির্বাচনী প্রচারে অবাধে অংশ নিতে পারায়, প্রায় সব আসনে ভোটারদের সামনে একাধিক বিকল্প উপস্থিত ছিল এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাত্রা তীব্র ছিল। ফলে এই মানদণ্ডে নির্বাচনকে প্রতিযোগিতামূলক বলা যেতে পারে।
পাঁচ. একটি সুষ্ঠু নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের আচরণে পক্ষপাতের অভিযোগ উঠলে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয়। এই মানদণ্ডে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে মোটামুটিভাবে সফল হওয়ায় নির্বাচনকে সন্তোষজনক বলা যেতে পারে।
ছয়. একটি মানসম্মত নির্বাচনে ভোটারদের ভীতিমুক্ত পরিবেশে নির্বিঘ্নে ও স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকতে হয়। এই মানদণ্ডে নির্বাচনকে উচ্চমানসম্পন্ন নির্বাচন হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
সাত. একটি মানসম্মত নির্বাচনে যেকোনো প্রার্থীরই নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকতে হবে। নির্বাচনের আগেই অথবা ফলাফল ঘোষণার আগেই যদি কোনো প্রার্থী জয়ী হবেন আর কে বা কারা পরাজিত হবেন, তা নির্ধারিত থাকে বা জনমনে এমন ধারণা প্রোথিত হয়ে যায়, তবে নির্বাচনটি প্রহসনে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এই মানদণ্ডে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে উত্তীর্ণ বলা যেতে পারে।
আট. ভোট গ্রহণ শেষে গণনা ও ফলাফল ঘোষণার প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও যাচাইযোগ্য হওয়া একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের অন্যতম শর্ত। এই মানদণ্ডে এবারের নির্বাচন কাঙ্ক্ষিত মানের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে পেরেছে বলে আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয় না।
নয়. ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অংশগ্রহণ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভোট গ্রহণ ও ফলাফল ঘোষণার বিভিন্ন ধাপে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা লক্ষ করা গেছে, যদিও কিছু সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। সামগ্রিক বিচারে নির্বাচনটি গ্রহণযোগ্যতা অর্জনে সক্ষম হয়েছে বলে আংশিকভাবে বলা যেতে পারে। তবে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের জন্য আরও বিশদ পর্যালোচনা প্রয়োজন।
এবারের নির্বাচনের বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য ও প্রবণতা উঠে এসেছে সুজনের পর্যবেক্ষণে। সংস্থাটি বলছে, প্রায় দুই ডজন প্রার্থী অভিযুক্ত ঋণখেলাপি এবং বেশ কয়েকজনের দ্বৈত নাগরিকত্ব ত্যাগের দালিলিক প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনে অবাধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারা এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। অন্তত ৪৫ জন ঋণখেলাপি প্রার্থী, কোনো কোনো ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ পান। এই তালিকায় বিএনপির ৪১ জন আর জামায়াতে ইসলামীর ৪ জন প্রার্থী ছিলেন বলে পত্রপত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
দ্বিদলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার অভ্যুদয়কে এবারের নির্বাচনের একটি উল্লেখযোগ্য আউটকাম (ফল) বলে মনে করছে সুজন। পর্যবেক্ষণে তারা বলেছে, এই নির্বাচনে বিএনপি জোট ও জামায়াত জোট সম্মিলিতভাবে প্রায় ৯০ শতাংশ ভোট কুড়াতে এবং যৌথভাবে ২৮৯ আসনে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে। নির্বাচনটি আশাতীতভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। অতীত পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিএনপি ও জামায়াতের শক্তি-সামর্থ্য ভারসাম্যপূর্ণ না হলেও সবাইকে অবাক করে দিয়ে জামায়াত জোট প্রায় সব আসনে বিএনপির সঙ্গে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পেরেছে। এটিকে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য ইতিবাচক নির্দেশক হিসেবে গণ্য করা যায়।
একটি সহযোগী শক্তি থেকে মূলধারার প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশের মাধ্যমে জামায়াত চমকপ্রদ সাফল্য দেখাতে সক্ষম হয়েছে বলে উল্লেখ করেছে সুজন। সংস্থাটি বলছে, ঢাকা মহানগরের ছয়টি আসনে জয়ী হওয়া এবং আরও আটটি আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের মাধ্যমে জামায়াতের শিক্ষিত ও নগরভিত্তিক সমর্থন লাভের নির্দেশনা পাওয়া যায়।
নির্বাচন সম্পর্কে সার্বিকভাবে সুজন বলেছে, এটি অপেক্ষাকৃত শান্তিপূর্ণ হয়েছে। পাশাপাশি নির্বাচনে বিজয়ী দলের নেতা কর্তৃক পরাজিত দলের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা এবং পরাজিত দল কর্তৃক বিজয়ীদের অভিনন্দন জানানো নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠার পূর্বাভাস বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেওয়া বা না নেওয়ার বিষয়কে কেন্দ্র করে বিজয়ী ও পরাজিতদের মধ্যে সৃষ্ট বিরোধ এবং ১১-দলীয় ঐক্যভুক্ত দলগুলো কর্তৃক মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান বর্জন নতুন শঙ্কার জন্ম দিয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা, দ্রুতই সংকট কেটে যাবে।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন সুজনের সম্পাদক ও প্রধান নির্বাহী বদিউল আলম মজুমদার। বিএনপির সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়া সম্পর্কে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, এ ক্ষেত্রে তাদের (বিএনপি) আইনি বাধ্যবাধকতা আছে। যেহেতু জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জনগণ অনুমোদন করেছে, একই সঙ্গে গণভোটে সংস্কারের ৪৮টি বিষয় অনুমোদিত হয়েছে। তাঁরা শপথ না নেওয়ায় জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। তবে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি বলেছে, তারা পরিপূর্ণভাবে সংস্কার বাস্তবায়ন করবে। এটা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।’
নির্বাচন সম্পর্কে বদিউল আলম মজুমদারের সার্বিক মূল্যায়ন হলো, এই নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পেরেছে। নির্বাচন মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে হয়েছে। সর্বোপরি সব দল নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়েছে। যেসব অভিযোগ সামনে এসেছে, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব সেগুলো তদন্ত করা। নির্বাচনের পরও এটা করার সুযোগ আছে। তিনি বলেন, এই কমিশনের মেয়াদকালে এটি সমাধান হবে বলে তাঁরা আশাবাদী।