‘বাংলাদেশে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ সেমিনারে কথা বলছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। চট্টগ্রাম, ২১ মে
‘বাংলাদেশে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ সেমিনারে কথা বলছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। চট্টগ্রাম, ২১ মে

ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় চরম অরাজকতা, সমন্বিত পদক্ষেপের আহ্বান টিআইবির

বাংলাদেশে ইলেকট্রনিক বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা বর্তমানে চরম নীতিগত দুর্বলতা ও প্রায়োগিক অরাজকতার শিকার। এমন উদ্বেগ জানিয়ে এই খাতের বিশৃঙ্খলা নিরসনে ১২ দফা সুপারিশ দিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামে আয়োজিত এক অংশীজন সেমিনারে সম্প্রতি প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটি তুলে ধরার সময় এই উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক), চট্টগ্রামের সহযোগিতায় আয়োজিত এই সেমিনার অনুষ্ঠিত হয় বলে টিআইবির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর প্রকাশিত এই গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১-এ বিভিন্ন অংশীজনের দায়িত্ব নির্ধারণ করা হলেও এর বাস্তবায়ন ও কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়েছে। ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী ও আমদানিকারকদের মাধ্যমে ই-বর্জ্য সংগ্রহকেন্দ্র স্থাপন, তহবিল গঠন, জনসচেতনতা কার্যক্রমের কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি। এমনকি চট্টগ্রামের জাহাজভাঙাশিল্প থেকে আসা পুরোনো ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম বিক্রয় বা ব্যবহার বিষয়ে কোনো নীতিমালা নেই। বৈদ্যুতিক গাড়ি, সোলার প্যানেল, ব্যাটারিচালিত খেলনা, ড্রোন ইত্যাদি থেকে সৃষ্ট ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো পরিকল্পনা এখন পর্যন্ত গ্রহণ করা হয়নি।

সেমিনারে গবেষণা প্রতিবেদনের বিস্তারিত তথ্য ও সুপারিশসমূহ তুলে ধরেন গবেষণা সহযোগী আব্দুল্লাহ্ জাহীদ ওসমানী। উপস্থাপনায় উঠে আসে, বর্তমানে দেশে উৎপাদিত মোট ই-বর্জ্যর প্রায় ৯৭ শতাংশই কোনো ধরনের প্রশাসনিক তদারকি ছাড়াই পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর উপায়ে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক ও নিরাপদ পুনঃপ্রক্রিয়ার আওতায় আসে মাত্র ৩ শতাংশ বর্জ্য।

টিআইবি বলছে, দেশে ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক পণ্য থেকে উৎপন্ন বিষাক্ত ই-বর্জ্যের পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে বাড়লেও এর সঠিক ব্যবস্থাপনায় নীতিনির্ধারণী স্থবিরতা ও সুশাসনের তীব্র ঘাটতি বিদ্যমান। অরাজকতা নিরসনে টিআইবির ১২ দফা সুপারিশের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ই-বর্জ্য বিধিমালা ও বাসেল কনভেনশনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে অবৈধ আমদানি ও রপ্তানি বন্ধ করা; তদারকি সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ছাড়পত্র ও নিবন্ধন প্রক্রিয়া ডিজিটাল করার মাধ্যমে দুর্নীতি বন্ধ করা; বিটিআরসি ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সমন্বয়ে ‘ওয়ান-স্টপ’ সেবা চালু করে তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং সোলার প্যানেল ও ইলেকট্রিক যানবাহনের বর্জ্য মোকাবিলায় দ্রুত একটি দীর্ঘমেয়াদি ‘ই-বর্জ্য রোডম্যাপ’ প্রণয়ন করা।

ই-বর্জ্যের ঝুঁকি নিরসনে সরকারি-বেসরকারি অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বব্যাপী ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অগ্রগতি প্রয়োজনের তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে। বৈশ্বিকভাবে প্রতিনিয়ত যে পরিমাণ ই-বর্জ্য তৈরি হচ্ছে, তার এক–চতুর্থাংশের কম অংশ যথাযথ প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থাপনা বা রিসাইক্লিংয়ের আওতায় আসে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের শুধু সচেতন হলেই চলবে না।’

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘সচেতনতা অবশ্যই প্রয়োজনীয়, তবে কার্যকর নীতি বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্র পরিচালনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বে যাঁরা আছেন, তাঁদের দায়বদ্ধতা এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। এই দুটি বিষয়ের সঠিক সমন্বয়ের মাধ্যমেই আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারব। সব অংশীজনের সম্মিলিত সচেতনতা এবং কার্যকর অংশগ্রহণের মাধ্যমেই ই-বর্জ্যের সংকটকে সম্ভাবনায় রূপান্তর করে একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে আমরা আশাবাদী।’

ইলেকট্রনিক পণ্যের ব্যবহার অপরিহার্য হলেও মেয়াদোত্তীর্ণ এসব পণ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা না করলে দেশ অচিরেই এক ভয়ংকর সংকটের সম্মুখীন হবে বলে সতর্ক করেন সনাক চট্টগ্রামের সভাপতি মো. দেলোয়ার হোসেন মজুমদার। সেমিনারে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে দেশে ই-বর্জ্য সংগ্রহ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত এবং এর পুনর্ব্যবহার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও অপ্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে হয়ে থাকে। এর ফলে মারাত্মক পরিবেশ দূষণ ঘটছে এবং সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি চরম আকার ধারণ করছে।’

সেমিনারের সঞ্চালক ছিলেন টিআইবির পরিবেশ ও জলবায়ু অর্থায়ন বিভাগের কো-অর্ডিনেটর নাবিল হক।