ছোট মেয়ে সানজিদার সঙ্গে খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করতে এসেছেন গুলনাহার বেগম। আজ শনিবার দুপুরে রাজধানীর জিয়া উদ্যানে
ছোট মেয়ে সানজিদার সঙ্গে খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করতে এসেছেন গুলনাহার বেগম। আজ শনিবার দুপুরে রাজধানীর জিয়া উদ্যানে

খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারতে গুলনাহার বললেন, ‘চোখোত পানি আটকাইতে পারছি না গো’

‘মানুষের ভালা কাম করছে, দেশেরও ভালা করছে। উনি চইলা গেছে বইলাই বুকডা এক্কেবারে দুমড়াইয়া গেছে। উনাকে ভালোবাসি বইলাই চোখোত পানি আটকাইতে পারছি না গো।’

চোখের পানি মুছতে মুছতে কথাগুলো বলছিলেন বৃদ্ধা গুলনাহার বেগম। আজ শনিবার দুপুরে তাঁর সঙ্গে কথা হয় রাজধানীর জিয়া উদ্যানে। খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করতে এসেছেন তিনি। গুলনাহারের বয়স জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কত হবি আর, পয়ষট্টি বা সত্তর।’

গুলনাহার বেগমের বাড়ি নীলফামারী। তাঁর চার মেয়ে। সম্প্রতি তিনি রাজধানীর মিরপুরে ছোটো মেয়ে সানজিদার বাসায় বেড়াতে এসেছেন। ছোট মেয়েই আজ তাঁকে জিয়া উদ্যানে খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করতে নিয়ে এসেছেন।

সানজিদা বলেন, গত মঙ্গলবার খালেদা জিয়ার মৃত্যুর সংবাদ শুনে তাঁর মা সারাদিন কিছুই মুখে তোলেননি। শুয়ে শুয়ে কান্না করেছেন।

সানজিদা আক্তার বলেন, ‘খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবর শুনেই মার সে কি কান্না! একবার দেখার জন্য খুব জেদ করছিলেন। এত দিন পারিনি; কারণ, অনেক ভিড় ছিল। তাই আজ নিয়ে এলাম।’

সানজিদা আক্তার আরও বলেন, তাঁদের পরিবার কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। তবে তাঁরা সবাই খালেদা জিয়াকে পছন্দ করেন।

খালেদা জিয়ার মৃত্যুর সংবাদ শুনে কেঁদেছিলেন কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে গুলনাহার বলেন, ‘মনের ভেতরডা খুব খারাপ লাগছিল গো।’

গুলনাহার বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘তাঁরে (খালেদা জিয়া) একবার সামনাসামনি দেহবার খুব শখ আছিল গো। কিন্তু কুনুদিনই দেহা হয় নাই। টিভিতেই দেহছি। অহন উনার কবরডা দেহছি। উনি কবরত শুইয়া আছেন। লাখ লাখ মানুষ উনার কবরের কাছত আইতেছে। ভালা মানুষ না হইলে কি আর এত্ত মানুষ আইতো?’

শীত উপেক্ষা করে তিন বৃদ্ধ এলেন শ্রদ্ধা জানাতে

গত বুধবার খালেদা জিয়ার দাফনের পর এখনো অনেকেই খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করার জন্য জিয়া উদ্যানে আসছেন।

গত বৃহস্পতিবার থেকে জিয়া উদ্যানে হাজারো মানুষ এসে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, দেশ এক নক্ষত্রকে হারিয়েছে। গণতন্ত্রের জন্য, দেশের জন্য খালেদা জিয়া আমৃত্যু লড়াই করে গেছেন। এই লড়াই তাঁকে মানুষের হৃদয়ে ঠাঁই দিয়েছে। মানুষ তাঁদের প্রিয় নেত্রীর জন্য ছুটে আসছেন, কেউ কবর জিয়ারত করতে; কেউবা আসছেন একবার কবরের মাটি ছুঁয়ে দেখতে। গতকাল শুক্রবার হাজারো মানুষ এসে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন খালেদা জিয়াকে।

এরই ধারাবাহিকতায় আজও মানুষের ঢল রয়েছে জিয়া উদ্যানে। সকালে কথা হয় তিন বৃদ্ধের সঙ্গে। তাঁরা হলেন ৮০ বছর বয়সী সিরাজুদ্দৌলা, ৭০ বছর বয়সী একরামুল হক ও ৬৮ বছর বয়সী তোফায়েল আহমেদ।

জিয়া উদ্যানের প্রবেশ মুখে গাড়ি থেকে নেমে নেমে খালেদা জিয়ার কবর পর্যন্ত যেতে একবার বিরতি দেন তাঁরা। ৭০ বছর বয়সী একরামুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘পায়ের ব্যথায় হাঁটতে পারি না। তাই বসতে হয়।’

শীত উপেক্ষা করে খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করতে এসেছেন সিরাজুদ্দৌলা, একরামুল হক ও তোফায়েল আহমেদ। আজ শনিবার দুপুরে রাজধানীর জিয়া উদ্যানে

এই তিন ব্যক্তির বাড়ি ফেনি জেলায়। তাঁরা দাবি করেন, খালেদা জিয়ার সঙ্গে তাঁদের পারিবারিক সম্পর্কও রয়েছে। তবে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তাঁরা সম্পৃক্ত নন। স্বচ্ছ রাজনীতিক হওয়ায় খালেদা জিয়াকে সব সময় পছন্দ করতেন তাঁরা। তাই কবর জিয়ারতে এসেছেন।

একরামুল হক বলেন, ‘খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবর শুনে মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়। জানাজায় অংশ নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় সাহস করিনি। সবাইকেই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে। কিন্তু তাঁর মৃত্যুটা দেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। আমরা দোয়া করি, সৃষ্টিকর্তা যেন তাঁর কবরে শান্তি দেন।’

দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্দেশে তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘স্বাধীনতার পরে আমরা একটা সুন্দর দেশ গঠন করতে পারিনি। সবাই নিজ স্বার্থে ব্যস্ত। এখন একটা সম্ভাবনা জেগেছে। বিএনপি, জামায়াত সবাই মিলে দেশকে গঠন করতে হবে। তাঁদের উচিত নিজ স্বার্থের ঊর্ধ্বে দেশকে স্থান দেওয়া। খালেদা জিয়া সেই চেষ্টা করে গেছেন সব সময়। তাঁর থেকে এই শিক্ষা নিতে হবে।’