
প্রিয় পাঠক, প্রথম আলোয় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে আপনাদের লেখা। আপনিও পাঠান। গল্প-কবিতা নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা। আপনার নিজের জীবনের বা চোখে দেখা সত্যিকারের গল্প; আনন্দ বা সফলতায় ভরা কিংবা মানবিক, ইতিবাচক বা অভাবনীয় সব ঘটনা। শব্দসংখ্যা সর্বোচ্চ ৬০০। দেশে থাকুন কি বিদেশে; নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বরসহ পাঠিয়ে দিন এই ঠিকানায়: readers@prothomalo.com
রোজার ছুটিতে কুমিল্লায় গিয়েছি। ১৯৭৫ সালের একটি দিনের কথা।আমার স্বামীর গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার দেবীদ্বারে, শহরের বাড়ি মোগলটুলিতে। স্বামী কুমিল্লার নিমসারের জোনাব আলী কলেজে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক। আর আমি চাকরি করি চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলে। আমার বাবার বাড়ি নোয়াখালীর হাতিয়ায় হলেও ছোটবেলা থেকেই আমরা চট্টগ্রামে স্থায়ী। বাবা ছিলেন কাস্টমস কর্মকর্তা। ১৯৫৯ সালে বাবা পাঁচলাইশ থানার সামনে জায়গা কিনে বাড়ি করলেন। এর আগে আমরা চট্টগ্রামের কালুরঘাট এ কে খান ম্যাচ ফ্যাক্টরির কলোনিতে থাকতাম। ক্লাস ওয়ান থেকে আমার স্কুল-কলেজ সবই চট্টগ্রামে।
বিয়ের পরও আমাকে চট্টগ্রামেই থাকতে হলো। কারণ, আমার চাকরি চট্টগ্রামে। ছোট্ট সন্তান নিয়ে পৈতৃক বাড়িতেই থাকি; কিন্তু স্বামী দূরে থাকেন, তাই ছুটিছাটা হলেই আমাকে কুমিল্লার মোগলটুলিতে ছুটতে হয়।
যেদিনের কথা লিখছি, তারিখ মনে নেই; কিন্তু ১৯৭৫ সাল, এটা মনে আছে।
শিক্ষক স্বামীর ঘরে ঢুকে দেখি কুমিল্লা বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষার খাতার স্তূপ। একটা বান্ডিলও খোলা হয়নি। খাতা দেখার ব্যাপারে ছিল ওর বড্ড অনীহা। বুঝলাম, পরিস্থিতি ভালো নয়।
আমাকে একটা অদ্ভুত ও কঠিন দায়িত্ব দিলেন স্বামী। বললেন, ‘প্রধান পরীক্ষক মোবাশ্বের আলী স্যারকে খাতাগুলো ফেরত দিয়ে আসো তো। আমার খাতা দেখতে ভালো লাগে না।’
মোবাশ্বের আলী স্যার তখন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের অধ্যাপক। ভাষাসৈনিক, খ্যাতিমান সাহিত্যিক, অনুবাদক। তাঁর দু-একটি বই নিজেও পড়েছি। এমন একজন ব্যক্তিকে আমার স্বামীর অপারগতার কথা জানাতে যাব আমি! বুক কাঁপতে লাগল। কিন্তু কী আর করা, কর্তার ইচ্ছায় কর্ম।
বাধ্য ছাত্রীর মতো খাতার বোঝা নিয়ে স্যারের বাসায় গেলাম। তিনি খুব অবাক হলেন আমার কথা শুনে। বললেন, ‘খাতা দেখার জন্য কত আবেদন থাকে। আমরা বাছাই করে পরীক্ষক নিয়োগ করি। আর আমার ছাত্র কিনা খাতা না দেখে ফেরত পাঠায়!’
আমার স্বামী ছিলেন মোবাশ্বের আলী স্যারের সরাসরি ছাত্র। স্বামীর মুখে স্যারের অনেক গল্প শুনেছি। স্যারের কথায় কী বলব বুঝতে পারছিলাম না।
মোবাশ্বের স্যার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি কত দূর পড়াশোনা করেছি। জানালাম, বাংলায় এমএ পাস করে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলে শিক্ষকতা করছি।
জবাব শুনেই বললেন, ‘তুমি ওকে খাতা দেখার কাজে সাহায্য করবে। আর আমার ছাত্রকে বলবে কোনো ওজর–আপত্তি চলবে না।’
খাতা ফেরত নিয়ে এলাম। ছাত্রও শিক্ষকের আদেশ মেনে নিলেন।
আমার ছেলে তখন ছোট—হাঁটি হাঁটি পা পা। ওকে সামলে খাতার আনুষঙ্গিক কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে রইলাম। খাতা দেখে জমা দেওয়ার জন্য এক সপ্তাহের কম সময় ছিল।
খাতার নম্বর যোগ করা, টপশিট নম্বর তোলা, নম্বর ফর্দ তৈরি করা, অর্থাৎ খাতার বহিরাঙ্গিক সব কর্মই সমাধা করে দিলাম। সেই দুই-চার দিনে কতবার যে চা বানাতে হলো!
খাতা দেখার ভয়ে কর্তা ভদ্রলোক শেষ পর্যন্ত পেশা পরিবর্তন করেছিলেন। একটি বেসরকারি সংস্থায় যোগ দিয়ে নির্বাহী পরিচালক পদ থেকে অবসর নিলেন।
আর আমি সেই যে খাতা দেখার সূচনা করেছিলাম, সেটা চলল প্রায় পুরোটা চাকরিজীবন। বাংলা বিষয়ের শিক্ষক মানে যত ছাত্র তত খাতা। তাই খাতার রাজ্যে ডুবে থাকতে হতো দিনের অনেকটা সময়।
আমি নিজেও এখন অবসরজীবনে আছি। যদিও ছাত্র পড়ানো থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হতে পারিনি। তবে খাতা দেখার চাপ নেই!
‘কর্তা’র খাতা দেখার ব্যাপারে আমার সাহায্য-সহযোগিতার কথা শ্রদ্ধেয় মোবাশ্বের স্যার মনে রেখেছিলেন। দেখা হলেই হেসে সেদিনের কথা মনে করিয়ে দিতেন। তাঁর অনুরোধে বেশ কয়েকবার তাঁর কুমিল্লার বাগিচাগাঁওয়ের বাসায় গিয়েছি। সাদর আতিথেয়তা পেয়েছি।
মোবাশ্বের স্যার গত হয়েছেন ২০০৫ সালে। কুমিল্লা স্টেশন থেকে বের হয়ে বাগিচাগাঁও পার হওয়ার সময় তাঁর বাসা দেখে কত কথা মনে পড়ে। চোখ সজল হয়ে ওঠে।