বইয়ের মেলা প্রাণের মেলা

ঘুরেফিরে বই কিনছেন পাঠকেরা

কয়েক বছর ধরে বইমেলা মানে ছিল বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী এলাকায় যানবাহনের জট আর ভিড়ের চাপ। রমজান মাসে বইমেলা হওয়ার কারণে এবার কিছুটা ভিন্ন চিত্র। গতকাল শনিবার ছুটির দিনে বইমেলায় উপস্থিতি বেড়েছে। তবে ছিল না অতিরিক্ত ভিড়। এ কারণে অনেকটা স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুরেফিরে বই কিনতে পেরেছেন পাঠকেরা।

চাঁদপুরের শাহরাস্তি থেকে বাবার সঙ্গে বইমেলায় এসেছে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী কৌশিক চক্রবর্তী। মুহম্মদ জাফর ইকবালের কয়েকটি কিশোর উপন্যাস আর একাধিক লেখকের ভূতের গল্পের বই কেনার পর ঘোরাঘুরি করছিল। মুক্তমঞ্চের পাশে কথা হলো কৌশিক ও তার বাবা কেশব চক্রবর্তীর সঙ্গে। কৌশিক জানাল, প্রথমবারের মতো মেলায় এসেছে সে। ভালো লেগেছে।

গতকাল ভিড় দেখা গেল ঢাকা কমিকসের স্টলের সামনে। শিশুদের পাশাপাশি বড়রাও কমিকসের বই কিনছেন। ভাই বোনদের জন্য কমিকস কিনতে রাজধানীর শাহজাদপুর থেকে এসেছেন পার্থ কুণ্ড। পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার এই পাঠক জানালেন, কাজের চাপে এত দিন মেলায় আসার সুযোগ হচ্ছিল না। প্রথমে তিনি লিটল ম্যাগাজিন চত্বরে গিয়েছিলেন। সেখানে কয়েকটি ম্যাগাজিন কিনে কমিকসের স্টলে এসেছেন। পার্থ জানালেন, তিনি এমনিতে বিদেশি কমিকস পড়তেন। তবে মুক্তিযুদ্ধের বীরশ্রেষ্ঠদের নিয়ে ঢাকা কমিকসের সংশপ্তক কমিকসটি পড়ার পরে খুব ভালো লেগেছিল। এ কারণে ছোট ভাইবোনদের জন্যও কয়েকটি কমিকস কিনেছেন। 

ঢাকা কমিকস স্টলের বিক্রয়কর্মী শান্তনা জানালেন, স্টলে সংশপ্তক–এর পাশাপাশি জুম, মহাকাশে প্রাণীক্রনিকলস অফ অ্যালেন স্বপন কমিকসের বিক্রি বেশি। কমিকস কেনার জন্য সব বয়সী পাঠকই তাঁদের স্টলে আসছেন।

ইউপিএলের স্টলেও তরুণ ক্রেতাদের ভিড় দেখা গেল। প্রতিষ্ঠানটির জ্যেষ্ঠ সহকারী ব্যবস্থাপক এ কে এম কামরুজ্জামান জানালেন, তাঁদের স্টলে এবার মেলায় নতুন আসা ফিরোজ আহমেদের অনুবাদ করা রিচার্ড ইটনের ইসলামের উত্থান ও বাংলা সীমান্ত (১২০৪–১৭৬০) বইটি ভালো বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া ইসরাইল খানের সংগ্রহ ও সম্পাদনায় সাময়িকপত্রে হিন্দু–মুসলিম সম্পর্ক (১৯০১–৪৭) বইটি নিয়েও পাঠকদের আগ্রহ রয়েছে।

ইউপিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহরুখ মহিউদ্দিন জানালেন, নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান জানিয়ে তাঁরা এবারের মেলায় অংশ নিয়েছেন। মেলার অর্থনৈতিক গুরুত্ব মাথায় রেখে ভবিষ্যতে সমন্বিত পরিকল্পনায় প্রাধান্য দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

প্রথমা প্রকাশনের স্টলের সামনে বিভিন্ন বয়সের পাঠকদের ভিড় দেখা গেল। প্রথমার বিক্রয় কর্মকর্তা সনাতন বড়াল জানালেন, এবারের মেলায় তাঁদের স্টল থেকে সৈয়দ আবুল মকসুদের লেখা মাওলানা ভাসানীর পূর্ণাঙ্গ জীবনী ভাসানীচরিত, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান ও জনমুক্তির প্রশ্ন, কামরুদ্দীন আহমদের বাংলার এক মধ্যবিত্তের আত্মকাহিনী, আবুল কালাম মোহাম্মদ জাকারিয়ার বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ এবং ডিউক জনের কিশোর হরর নওয়াব বাড়ির অভিশাপ বইগুলো বেশি কিনছেন পাঠকেরা।

অন্যধারার স্টলের সামনে কথাশিল্পী সাদাত হোসাইনকে ঘিরে পাঠকদের ভিড় দেখা গেল। পরের বইমেলা আয়োজনের সময় যাতে রমজানের কথা মাথায় রেখে সময়সূচি সমন্বয় করা হয়, এমন প্রত্যাশার কথা জানালেন তিনি। 

কথাপ্রকাশের ইনচার্জ ইউনূস আলম বললেন, শঙ্কা ছিল, রমজান মাসের কারণে পাঠকসমাগম কম হবে। তবে গত দুই দিনে সেই শঙ্কা অনেকটাই কেটে গেছে। মেলায় পাঠকদের উপস্থিতি আগের কয়েক দিনের তুলনায় বেড়েছে।

বাংলা একাডেমির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গতকাল মেলায় ১৮৫টি বই প্রকাশিত হয়েছে। এদিন বাংলা একাডেমি মেলায় এনেছে মোহাম্মদ আজম সম্পাদিত জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের প্রবন্ধ

জসীমউদ্‌দীন: আধুনিকতা ছাড়িয়ে

জসীমউদ্‌দীন: আধুনিকতা ছাড়িয়ে

কুদরত-ই-হুদা

প্রথমা প্রকাশন

বিশ শতকে উপনিবেশলালিত আধুনিকতার তীব্রতার মধ্যেই জসীমউদ্‌দীন স্বতন্ত্র ধারার সূচনা করেছেন। হয়ে উঠেছেন দেশের অগণন জনমানুষের ভাষ্যকার। ঔপনিবেশিক শিক্ষা ও নন্দনচিন্তার ভেতরে বাস করেও জসীমউদ্‌দীন যেভাবে নিজের আলাদা নিশানা নির্ধারণ করলেন, তা আজও বিস্ময় জাগায়। আদতে তিনি বাংলা সাহিত্যের আদি বা মূলধারার প্রতিনিধি। কিন্তু পশ্চিমা আধুনিকতার চাপে তত দিনে ওই ধারা প্রান্তে গিয়ে ঠেকেছে। এটা জানা সত্ত্বেও জসীমউদ্‌দীন সে পথেই আরও দৃঢ়ভাবে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিলেন। এ তাঁর শৈল্পিক সততা ও দৃঢ়প্রত্যয়েরই পরিচয়। এই বইয়ে কুদরত-ই-হুদা সেই জসীমউদ্‌দীনকে পুনরাবিষ্কার করেছেন। তিনি জসীমউদ্‌দীনের জীবন ও মনের খোঁজ নিয়েছেন। বৃহত্তর পটভূমিতে স্থাপন করে দেখিয়েছেন বৈরী বাস্তবকে তোয়াক্কা না করে কীভাবে জসীমউদ্‌দীন অদ্বিতীয় হয়ে উঠলেন। সুনীলকুমার মুখোপাধ্যায়ের অর্ধশতাব্দীর বেশিকাল পরে, এটি জসীমউদ্‌দীনকে নিয়ে দ্বিতীয় পূর্ণতর ও একক কাজ। 

‘শিশুপ্রহরে’ পাপেটদের সঙ্গে উল্লাস করছে একদল শিশু। গতকাল রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অমর একুশে বইমেলা প্রাঙ্গণে

কুদরত-ই-হুদা প্রাবন্ধিক ও গবেষক। জন্ম ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৮, ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলায়। পিতা কবিরত্ন এম এ হক। মা মহুয়া হক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্জন করেছেন এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি। সরকারি কলেজে অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে বিশেষজ্ঞ পদে কর্মরত। সাংস্কৃতিক রাজনীতি, ইতিহাস অনুসন্ধান, উত্তর-উপনিবেশবাদ তাঁর আগ্রহ ও চর্চার এলাকা। প্রকাশিত গ্রন্থ শওকত ওসমান ও সত্যেন সেনের উপন্যাস: আঙ্গিক বিচার, জসীমউদ্‌দীন, জাতীয়তাবাদী চিন্তার বিকাশ: বাংলাদেশের ষাটের দশকের কবিতা। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত বাঙালির শিক্ষাচিন্তা ১০ খণ্ড ও বাঙালির সমাজচিন্তা ১১ খণ্ডের অন্যতম সম্পাদক। গবেষণাকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ লাভ করেছেন ‘মহাকবি মধুসূদন পদক-২০২৩’।