
সিরাজগঞ্জ–বগুড়া নতুন রেলপথ কোন দিক দিয়ে কোন পর্যন্ত যাবে, আগে থেকেই নির্ধারণ হয়ে আছে। কিন্তু বিএনপি সরকার গঠনের পর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম নতুন রেলপথে কিছুটা পরিবর্তন আনতে রেলপথ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছিলেন। প্রতিমন্ত্রীর সেই চাওয়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নাকচ করে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন, এটি পরিবর্তন করা যাবে না। আগে থেকে ঠিক করা পথ (রুট) ধরে রেললাইন বসবে।
বর্তমান সরকার সিরাজগঞ্জ–বগুড়ার মধ্যে নতুন ৭৬ কিলোমিটার মিশ্র গেজ (মিটারগেজ ও ব্রডগেজ) রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নে জোর দিয়েছে। এ রেলপথ নির্মাণ হলে সিরাজগঞ্জ থেকে রেলপথে বগুড়ার দূরত্ব ১১৪ কিলোমিটার কমে যাবে। এতে যাত্রার সময় প্রায় তিন ঘণ্টা কমে আসবে। এখন ট্রেনে ঘুরপথে বগুড়ায় যেতে হয়। ঢাকা থেকে ট্রেন সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও নাটোর হয়ে সান্তাহার দিয়ে বগুড়া শহরে যায়। নতুন রেললাইন হলে ট্রেন সিরাজগঞ্জ থেকে কামারখন্দ, রায়গঞ্জ, শেরপুর, শাজাহানপুর ও কাহালু হয়ে বগুড়া শহরে যাবে।
রেলপথ মন্ত্রণালয় ১৬ জুন বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনে। তাঁর পরামর্শ চায়। সব শুনে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের অনুরোধ আমলে না নিয়ে আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মৌখিক নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রকল্পটি ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পায়। ভারতীয় ঋণের অর্থে এটি বাস্তবায়ন করার কথা ছিল। কিন্তু জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভারতীয় সরকার প্রকল্পে অর্থায়ন না করার কথা জানিয়ে দেয়। ২০২৬ সালের ৩০ জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা ছিল। এতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।
ভারত সরে যাওয়ার পর এ প্রকল্পে অর্থায়নে রাজি হয়েছে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি)। এ কারণে প্রকল্প প্রস্তাব সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশোধনের পর ব্যয় বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ১২ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত করা হচ্ছে। সংশোধন প্রস্তাবটি এখন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে আছে। অনুমোদনের পর তা একনেকে ওঠার কথা।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, সম্ভাব্য ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণ হলো সময়মতো প্রকল্পটির কাজ শুরু করতে না পারা। এর মধ্যে ডলারের দাম বেড়েছে। এ ছাড়া প্রকল্পে নতুন কিছু সেতু ও উড়ালসড়ক যুক্ত করা হয়েছে। জমির মূল্যও বেড়ে গেছে। এসব কারণে প্রকল্পের ব্যয়ও বাড়ছে।
রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নতুন রেলপথটি সিরাজগঞ্জ থেকে বগুড়ার রানীরহাট হয়ে বগুড়া শহর পর্যন্ত যাওয়ার কথা। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম চেয়েছিলেন, নতুন রেলপথটি বগুড়া শহর অবধি না নিয়ে রানীরহাট থেকে শহরের বাইরে দিয়ে গাবতলী উপজেলা পর্যন্ত যাবে। এর ফলে ১৫ কিলোমিটার বাড়তি রেলপথ নির্মাণ করতে হতো।
সিরাজগঞ্জ–বগুড়া রেলপথে মোট ১১টি স্টেশন থাকবে। সিরাজগঞ্জ জংশন, কৃষ্ণদিয়া, রায়গঞ্জ, চান্দাইকোনা, সনকা, শেরপুর, আরিয়া বাজার ও রানীরহাটে নতুন আটটি রেলস্টেশন নির্মাণ করা হবে। অন্যদিকে বগুড়া, কাহালু ও সদানন্দপুর রেলস্টেশন পুনর্নির্মাণ করা হবে।
বিষয়টি নিয়ে ১ জুন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে একটি চিঠি লেখেন। চিঠিতে প্রতিমন্ত্রী লেখেন, নতুন যে রেলপথটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেটি বগুড়া শহরের ভেতর না নিয়ে গাবতলী নিয়ে গেলে উত্তরবঙ্গের যোগাযোগব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যুক্ত হবে।
বর্তমানে কাহালু থেকে বগুড়া শহরের ভেতর দিয়ে গাবতলী পর্যন্ত রেলপথ রয়েছে। পুরোনো এ রেলপথ উঠিয়ে ফেলার অনুরোধ জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে লেখা চিঠিতে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিদ্যমান রেলপথটি ঘনবসতিপূর্ণ ও ব্যস্ত এলাকার মধ্য দিয়ে গেছে। এ পথে সাতটি গুরুত্বপূর্ণ রেলক্রসিং আছে। এসব রেলক্রসিংয়ে প্রতিদিন একাধিকবার ট্রেন চলাচলের কারণে দীর্ঘ সময় যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে। ফলে শহরের গুরুত্বপূর্ণ নানা স্থানে ব্যাপক যানজট দেখা দেয়।
চিঠিতে প্রতিমন্ত্রী আরও লেখেন, রেলক্রসিংগুলোর কারণে অনেক ক্ষেত্রে প্রতিদিন গড়ে প্রায় চার ঘণ্টা পর্যন্ত যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এতে সেসব এলাকার বাসিন্দারা দুর্ভোগের শিকার হন। সেই সঙ্গে নগর ব্যবস্থাপনা, জরুরি সেবা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব দেখা দেয়।
বিষয়টি সমাধান হয়ে গেছে। রেলপথে পরিবর্তন আনা হবে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন।মো. ফাহিমুল ইসলাম, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব।
নতুন সরকারের প্রভাবশালী প্রতিমন্ত্রীর কাছ থেকে এমন চিঠি পেয়ে খানিকটা বিপাকে পড়েন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প–সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কারণ, প্রতিমন্ত্রীর কথা মেনে রেলপথ বসালে প্রকল্পের ব্যয় আরও বেড়ে যাবে। নতুন করে জমি অধিগ্রহণ ও নকশা করতে গেলে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আরও সময় লাগবে।
প্রতিমন্ত্রীর চাওয়া অনুযায়ী প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হলে শহর থেকে বেশ দূর দিয়ে রেলপথ যাবে। বিষয়টি জানার পর বগুড়া শহর বিএনপির নেতা–কর্মী ও স্থানীয় লোকজন এর বিরোধিতা করেন।
শেষ পর্যন্ত রেলপথ মন্ত্রণালয় ১৬ জুন বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনে। তাঁর পরামর্শ চায়। সব শুনে প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের অনুরোধ আমলে না নিয়ে আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মৌখিক নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রতিমন্ত্রীর চাওয়া প্রধানমন্ত্রী নাকচ করার বিষয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বিষয়টি সমাধান হয়ে গেছে। রেলপথে পরিবর্তন আনা হবে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন।
পুরোনো রেললাইনের কারণে বগুড়া শহরের যানজটের প্রসঙ্গ চিঠিতে লিখেছিলেন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। এ বিষয়ে সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম বলেন, রেললাইনের কারণে বগুড়া শহরে যানজটের যে বিষয়টি আছে, সেটি আলাদা প্রকল্প করে সমাধান করা হবে। নতুন রেললাইনে প্রয়োজন অনুযায়ী পাতাল ও উড়ালসড়ক নির্মাণ করা হবে।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে, বগুড়া শহরে থাকা পুরোনো রেলপথ উঠিয়ে ফেলতে গেলে স্থানীয় মানুষ বাধা দেবেন। এ ছাড়া শহরের ভেতর রেলের দামি জমি ও স্থাপনা রয়েছে, সেগুলোও পরিত্যক্ত হয়ে যাবে। দখল হয়ে যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়েও প্রতিমন্ত্রীর অনুরোধ নাকচ করেছেন।
সিরাজগঞ্জ–বগুড়া রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পটি ‘খুবই গুরুত্বপূর্ণ’ বলে মন্তব্য করেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব। তিনি বলেন, সংশোধন প্রস্তাব অনুমোদন করা হলেই ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
প্রতিমন্ত্রীর চাওয়া মেনে পরিকল্পনা কিংবা নকশায় বদল না হলেও সিরাজগঞ্জ–বগুড়া রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণে ব্যয় বাড়ছে। প্রকল্প–সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মূল ডিপিপিতে মোট ৯৬০ একর জমি অধিগ্রহণের কথা বলা আছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৯২১ কোটি টাকা।
তবে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত পথনকশা নির্ধারণ ও ভূমি অধিগ্রহণ পরিকল্পনা প্রণয়ন করার পর প্রয়োজনীয় জমির পরিমাণ দাঁড়ায় ৯০১ দশমিক ৭৭ একর। পরবর্তী সময় বগুড়া ও সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসকের চূড়ান্ত ব্যয় প্রাক্কলনে এ খাতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৪৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা।
প্রকল্প–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, স্থানীয় পর্যায়ে জমির দাম বেড়ে যাওয়ায় অধিগ্রহণ ব্যয়ও বেড়েছে। জমি অধিগ্রহণ বাবদ প্রয়োজনীয় অর্থ এরই মধ্যে সিরাজগঞ্জ ও বগুড়া জেলার প্রশাসকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় ৮৬ দশমিক ৫১ কিলোমিটার মূল রেললাইন ও ৩৭ কিলোমিটার শাখা রেললাইন নির্মাণ করা হবে। করতোয়া নদীর ওপর ২৪৬ মিটার ও ইছামতী নদীর ওপর ২০৫ মিটার দৈর্ঘ্যের দুটি বড় সেতুসহ মোট ১২১টি ছোট–বড় সেতু নির্মাণের পরিকল্পনাও এ প্রকল্পে রয়েছে। ঢাকা–রংপুর মহাসড়কের ওপর একটি রেল ওভারপাস ও ঢাকা–নাটোর মহাসড়কের ওপর আরেকটি ওভারপাস নির্মাণ করা হবে।
এ পথে মোট ১১টি রেলস্টেশন থাকবে। সিরাজগঞ্জ জংশন, কৃষ্ণদিয়া, রায়গঞ্জ, চান্দাইকোনা, সনকা, শেরপুর, আরিয়া বাজার ও রানীরহাটে নতুন আটটি রেলস্টেশন নির্মাণ করা হবে।
অন্যদিকে বগুড়া, কাহালু ও সদানন্দপুর রেলস্টেশন পুনর্নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া রানীরহাট এলাকায় একটি ‘ওয়াই’ আকৃতির রেললাইন নির্মাণ করা হবে, যার একটি মুখ বগুড়ার দিকে, অন্যটি কাহালুর দিকে যাবে।