সুনামগঞ্জের টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে অগ্নিকাণ্ড
সুনামগঞ্জের টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে অগ্নিকাণ্ড

নাইকোর কাছে ১২,৩৭১ কোটি টাকা চেয়ে ৫১২ কোটি পাচ্ছে বাংলাদেশ

সুনামগঞ্জের টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে বিস্ফোরণের ঘটনায় ক্ষতিপূরণ মামলার চূড়ান্ত রায় অবশেষে আসছে। বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তিসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতের (ইকসিড) রায়ে বাংলাদেশ ৪ কোটি ২০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ পেতে পারে, যা বাংলাদেশি মুদ্রার বর্তমান মূল্যে ৫১২ কোটি টাকার সমপরিমাণ। এ ক্ষতিপূরণ দেবে কানাডার কোম্পানি নাইকো রিসোর্সেস।

যদিও বাংলাদেশ সরকার ও বাপেক্স টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে গ্যাস পুড়িয়ে ফেলা ও পরিবেশের ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ হিসেবে দাবি করেছিল ১০১ কোটি ৪০ লাখ ডলার (১২ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা)।

জ্বালানি বিভাগ, পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের ছয়জন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আইনজীবীদের মাধ্যমে পাওয়া মামলার রায়ের একটি সংক্ষিপ্তসার থেকে ক্ষতিপূরণের অঙ্কটি জানা গেছে। তবে রায়ের বিস্তারিত প্রকাশিত হয়নি। পুরো রায় পাওয়ার পর আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে এবং সরকারের পরামর্শ নিয়ে করণীয় ঠিক করা হবে। কর্মকর্তারা আরও বলছেন, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ অনেক কম। বাংলাদেশের ক্ষতি অনেক বেশি হয়েছে। পাশাপাশি মামলা চালাতেও অনেক খরচ হয়েছে।

ক্ষতিপূরণের বিষয়টি প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানও। তিনি বলেন, ক্ষতিপূরণের খবর প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। বিস্তারিত রায় দেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

টেংরাটিলায় বিস্ফোরণ

বিস্ফোরণের পর টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রের পাশের এলাকার মাটি পরীক্ষা করা হচ্ছে

সুনামগঞ্জের ছাতকে অবস্থিত টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ২০০৩ সালে নাইকোর কাছে হস্তান্তর করা হয়। তারা খননকাজ শুরুর পর ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি ও ২৪ জুন গ্যাসক্ষেত্রটিতে দুটি মারাত্মক বিস্ফোরণ ঘটে। অগ্নিকাণ্ডের ফলে গ্যাসক্ষেত্রের মজুত গ্যাস পুড়ে যায় এবং আশপাশের স্থাপনা ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এ জন্য নাইকোর কাছে ৭৪৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করে পেট্রোবাংলা, তা দিতে অস্বীকৃতি জানায় প্রতিষ্ঠানটি।

ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য ২০০৭ সালে বাংলাদেশের আদালতে মামলা করে পেট্রোবাংলা। পাশাপাশি বন্ধ করে দেওয়া হয় নাইকোর কাছে থাকা ফেনী গ্যাসক্ষেত্রের বিল পরিশোধ। নাইকোর বিরুদ্ধে মামলা পরে হাইকোর্টে যায়। হাইকোর্ট বাংলাদেশে থাকা নাইকোর সব সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং সম্পাদিত চুক্তি বাতিলের নির্দেশ দেন। পরে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে গেলে সেখানেও পেট্রোবাংলার পক্ষেই রায় আসে।

২০২০ সালের ১৯ মে এক সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছিলেন, নাইকো ছাতক গ্যাসক্ষেত্র বিস্ফোরণের ঘটনায় তারা দায়ী নয় মর্মে ঘোষণা চেয়ে ২০১০ সালে ইকসিডে একটি সালিসি মোকদ্দমা দায়ের করে। ২০১৬ সালে বাপেক্স আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের দিয়ে গঠিত একটি কমিটির মাধ্যমে একটি সমীক্ষা পরিচালনা করে। পরে নাইকোর কাছে বাপেক্স ১১ কোটি ৮০ লাখ ডলার এবং বাংলাদেশ সরকার ৮৯ কোটি ৬ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়ে ইকসিডে নালিশ করে। দুয়ে মিলে ক্ষতিপূরণের দাবি দাঁড়ায় ১০১ কোটি ৪০ লাখ ডলার (বর্তমান মূল্যে ১২ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা)।

ক্ষতিপূরণের খবর প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। বিস্তারিত রায় দেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, উপদেষ্টা, খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়

নসরুল হামিদ আরও বলেছিলেন, ইকসিড ট্রাইব্যুনাল ২০০৫ সালের বিস্ফোরণের জন্য যৌথ উদ্যোগ চুক্তির অধীন শর্ত ভঙ্গের জন্য নাইকোকে দায়ী করে ২৮ ফেব্রুয়ারি (২০২০) রায় প্রদান করেন।

নাইকোর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের নালিশি মামলাসংশ্লিষ্ট পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের দুজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, দেশে শুরুতে নাইকোর কাছে যে ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়েছিল, ইকসিডে তার চেয়ে অনেক বেশি অর্থ চাওয়া হয়েছে। এটা নিয়ে শুনানিতে প্রশ্ন উঠেছিল। আরও কিছু ব্যাপার আছে। তাই পুরো রায় না দেখে আগাম কিছু বলা সম্ভব নয়। তাঁরা আরও বলেন, বিগত সরকারের সময় মামলার রায় নিয়ে আগাম তথ্য প্রকাশ করায় কিছুটা জটিলতা তৈরি হয়েছিল। ইকিসডের গোপনীয়তা ভঙ্গের অভিযোগ তোলা হয়েছিল। তাই এবার তাড়াহুড়া না করে বিস্তারিত রায় আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

প্রতিবাদ জানিয়েছিল জাতীয় কমিটি

২০০৮ সালে নিম্ন আদালতে মামলার সময় নাইকোর কাছে ৭৪৬ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ দাবি করায় তার প্রতিবাদ জানিয়েছিল তেল-গ‍্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ‍্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি। তারা বলেছিল, টেংরাটিলায় ক্ষতি ৭৪৬ কোটি টাকা নয়, প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা।

কমিটির পক্ষ থেকে তখন আরও দাবি করা হয়, ২০০৫ সালের দুর্ঘটনার পর সরকারের তদন্ত কমিটি বলেছিল, গ্যাস পুড়েছে ৩০০ কোটি ঘনফুট। যদিও ক্ষতির পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার ২০০ কোটি ঘনফুট।

তেল-গ‍্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সাবেক সদস‍্য সচিব আনু মুহাম্মদ গতকাল শুক্রবার প্রথম আলোকে বলেন, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণে শুরু থেকেই গাফিলতি ছিল। মামলা দায়ের এবং শুনানি পরিচালনায়ও দুর্বলতা ছিল। তাই যথাযথ ক্ষতিপূরণ পাওয়া গেল না। তবে নাইকো যে দায়ী, ক্ষতিপূরণের রায়ে সেটা প্রমাণ হলো। এটা নৈতিক বিজয়। ক্ষতিপূরণের পরিমাণের বিষয়ে সুযোগ থাকলে সরকার আপিল করতে পারে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামও মনে করেন, দাবির তুলনায় ক্ষতিপূরণের অঙ্কটি হতাশাজনক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মামলার পুরো রায় পেলে এটি পর্যালোচনা করা হবে। মামলা পরিচালনায় মোট কত খরচ হয়েছে, তা-ও হিসাব করা হচ্ছে।

ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণে শুরু থেকেই গাফিলতি ছিল। মামলা দায়ের এবং শুনানি পরিচালনায়ও দুর্বলতা ছিল।
আনু মুহাম্মদ, সাবেক সদস্যসচিব, তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ–বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি

সন্তুষ্ট হওয়ার কিছু নেই

সরকারি তৎপরতার বাইরে ২০১৬ সালে বাংলাদেশের উচ্চ আদালতে নাইকোর বিরুদ্ধে মামলা করেন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম। আদালতের কাছে তিনি দুটি প্রতিকার চান। একটি হলো, নাইকোর সব সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা ও বিস্ফোরণের কারণে ক্ষতিপূরণ আদায়। আদালত নাইকোর সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেন এবং বাংলাদেশের কাছে নাইকোর বিক্রির অর্থ ২ কোটি ৭০ লাখ ডলার না দিতে সরকারকে নির্দেশ দেন। থেমে যায় নাইকোর গ্যাস বিল দেওয়ার প্রক্রিয়া।

ক‍্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ক্ষতিপূরণের দাবি পূরণে সক্ষমতার নিশ্চয়ই ঘাটতি ছিল। বিলিয়ন ডলার চেয়ে মিলিয়ন ডলার পেয়ে সন্তুষ্ট হওয়ার কিছু নেই। প্রকৃত ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হবে।

পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রটি ছাতক পূর্ব ও ছাতক পশ্চিম নামে দুটি অংশে বিভক্ত। অগ্নিকাণ্ডে ছাতক পশ্চিম অংশের একটি স্তরের গ্যাস পুড়ে গেলেও অন্যান্য স্তর এবং ছাতক পূর্ব অংশের গ্যাস মজুত অক্ষত রয়েছে। এই গ্যাসক্ষেত্রে সম্ভাব্য মজুত ২ থেকে ৫ ট্রিলিয়ন (লাখ কোটি) ঘনফুট বলে বিবেচনা করা হয়।

ছাতক গ্যাসক্ষেত্রে নতুন কূপ খননের জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রস্তুত করা আছে। ইকসিডের চূড়ান্ত রায় পেলে আইনজীবীদের মতামত নিয়ে দ্রুত পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন পেট্রোবাংলার দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।