অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে পিকআপে করে রোগী নেওয়ার অপেক্ষায় স্বজনেরা। বুধবার বিকেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে
অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে পিকআপে করে রোগী নেওয়ার অপেক্ষায় স্বজনেরা। বুধবার বিকেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

‘দুই ঘণ্টা ধরে মেডিকেলে ঘুরছি, অ্যাম্বুলেন্স পাচ্ছি না’

দুই দিন ধর্মঘট পালন শেষে আজ বুধবার সন্ধ্যায় আগামী এক সপ্তাহের জন্য ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেয় ঢাকা মেডিকেল বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতি।

সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে সাতক্ষীরা থেকে চিকিৎসা নিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসেন করিম খাঁ (৭২)। ১৭ অক্টোবর হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। ১২ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর গতকাল মঙ্গলবার দিবাগত মধ্যরাতে মারা যান তিনি। হাসপাতালের প্রক্রিয়া শেষ করে তাঁর মরদেহ বাড়িতে নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স খুঁজছিলেন স্বজন সাজ্জাদ হোসেন।

বিকেল ৪টার দিকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে কথা হয় সাজ্জাদ হোসেনের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘মরদেহ বাড়ি নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স খুঁজছি। দুই ঘণ্টা ধরে সব জায়গায় ঘুরছি। কিন্তু কেউ যেতে রাজি হচ্ছে না। শুনেছি, ধর্মঘট চলছে। এতে আমরা ভোগান্তিতে পড়েছি।’

শুধু সাজ্জাদ হোসেন নন, ঢাকা মেডিকেলে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস বন্ধ থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছেন রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা। তবে দুই দিন পর আজ বুধবার সন্ধ্যায় আগামী এক সপ্তাহের জন্য ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, যানজট নিরসনে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স পার্কিং স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। রোগী ও তাঁদের স্বজনদের দুর্ভোগ কমানো এবং হাসপাতালে শৃঙ্খলা ফেরাতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে তারা। একই সঙ্গে জরুরি বিভাগের সামনে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির জন্য অস্থায়ীভাবে দেওয়া একটি কক্ষ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সেখানে রোগীর স্বজনদের বসার ব্যবস্থা করা হবে বলে জানানো হয়েছে।

অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে নেওয়া হচ্ছে এক বয়স্ক রোগীকে। ঢাকা মেডিকেল। ২৮ অক্টোবর

এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ২৬ অক্টোবর মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে ঢাকা মেডিকেল বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতি। মানববন্ধন থেকে স্থায়ী পার্কিংয়ের ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত হাসপাতালে অস্থায়ী গাড়ি রাখার জায়গা দেওয়াসহ বেশ কয়েকটি দাবি জানানো হয়েছে। তবে দাবি আদায় না হওয়ায় গতকাল থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট কর্মসূচি পালন শুরু করে সংগঠনটি। এ সংগঠনের অধীনে ১৪০টির মতো বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে।

ঢাকা মেডিকেল সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ধর্মঘটের আগে হাসপাতাল থেকে রোগী নিয়ে যাওয়ার জন্য সহজেই অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যেত। কিন্তু ধর্মঘটের কারণে অনেকে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ‘৯৯৯’–এ ফোন দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করার চেষ্টা করছেন।

আজ বিকেল থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে অবস্থান করে দেখা যায়, হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে অনেকেই বাইরে থেকে ভাড়া করে আনছেন। আবার বাইরে থেকে আসা অ্যাম্বুলেন্সকেও ভয়ভীতি দেখিয়ে ফেরত পাঠাচ্ছেন ধর্মঘট পালন করা চালকেরা। এতে যথাসময়ে অ্যাম্বুলেন্স পাচ্ছেন না রোগীরা। তাঁদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

হাসপাতালের সামনে যানবাহনের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষায় ভোগান্তিতে রোগী ও তাঁর স্বজনেরা। ২৮ অক্টোবর

বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে নাজমা আক্তার নামের এক নারী প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর ভাগনে মিলন ইসলাম সুপারিগাছ থেকে পড়ে গুরুতর আহত হয়েছেন। গতকাল রাতে মিরপুর থেকে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করেন তাঁরা। আজ তাঁকে রাজধানীর নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকেরা। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে ঘুরেও তিনি অ্যাম্বুলেন্স পাচ্ছেন না। পরে বাধ্য হয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করার চেষ্টা করছেন তিনি।

হাসপাতালের ভেতরে স্থায়ী পার্কিংয়ের দাবি

ঢামেক বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির নেতারা বলছেন, এক মাস আগে হাসপাতালে নতুন পরিচালক দায়িত্ব নিয়েছেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি হাসপাতাল প্রাঙ্গণে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স পার্কিং বন্ধ করে দিয়েছেন। পরে তাঁরা হাসপাতালের সামনের রাস্তায় পার্কিং করা শুরু করেন। কিন্তু ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা অবৈধ পার্কিংয়ের দায়ে মামলা দিচ্ছেন। এতে তাঁরাও বিপাকে পড়েছেন। তাঁরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু আমলে না নেওয়ায় বাধ্য হয়ে ধর্মঘট ডেকেছেন।

পাঁচ দফা দাবি হলো—হাসপাতাল প্রাঙ্গণে স্থায়ী পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করা, স্থায়ী পার্কিংয়ের ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত হাসপাতালে অস্থায়ীভাবে গাড়ি রাখার জায়গা নির্ধারণ করে দেওয়া, রাস্তায় গাড়ি রাখলে ট্রাফিক পুলিশের মামলা বন্ধ করা, অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া নির্ধারণ করা এবং অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস নীতিমালা বাস্তবায়ন করা।

এক সপ্তাহের জন্য ধর্মঘট প্রত্যাহার

আজ সন্ধ্যায় ঢাকা মেডিকেল বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সঙ্গে আলোচনায় বসেন হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেন। আলোচনায় চলমান সমস্যার সমাধানে এক সপ্তাহের সময় নেন। পরে রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তির কথা বিবেচনা করে আজ সন্ধ্যা ৬টার দিকে এক সপ্তাহের জন্য ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেন বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির নেতারা।

সন্ধ্যায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইমন আলী প্রথম আলোকে বলেন, পরিচালক তাঁদের কাছে এক সপ্তাহের সময় নিয়েছেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। এ জন্য তাঁরা আগামী এক সপ্তাহের জন্য ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।