
বাজেট আলোচনায় সরকারি দলের সদস্যদের ‘সিংহের’ ভূমিকায় দেখা গেলেও সেবা ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ‘বিড়ালের’ ভূমিকায় দেখা যায় বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ।
প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘স্বপ্নের বাজেট’ আখ্যা দিয়ে শফিকুল ইসলাম বলেছেন, জনগণ স্বপ্ন নয়, বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট চায়।
আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে পটুয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ এ কথা বলেন। এ সময় তিনি স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ব্যাংকিং খাত ও দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন নিয়ে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন।
এর আগে বেলা ১১টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের অধিবেশন শুরু হয়।
শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এই বাজেট একটি স্বপ্নের বাজেট। কিন্তু আমরা চাই শুধু স্বপ্ন নয়, বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট। সে কারণেই বিরোধী দলের আলোচনা সরকারি দলের পছন্দ হয় না।’
বাজেটের প্রকৃত সফলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে এই সংসদ সদস্য বলেন, সংসদ সদস্যদের টেবিল চাপড়ানোর ওপর বাজেটের সাফল্য নির্ভর করে না; সাধারণ মানুষের মুখের হাসিই এর প্রকৃত মানদণ্ড।
নিজের এলাকায় বাজেটের আগে অনুষ্ঠিত ‘নাগরিক ভাবনা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে শফিকুল ইসলাম বলেন, মানুষ তাঁকে বলেছেন, সংসদের আলোচনা শুনলে মনে হয়, দেশের সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে; কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায় না।
বাজেট প্রণয়নে সাধারণ মানুষ ও সংসদ সদস্যদের কার্যকর অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয় না বলেও অভিযোগ করেন শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, উন্নত বিশ্বে বাজেট উপস্থাপনায় ইনফোগ্রাফিক, ভিজ্যুয়াল ড্যাশবোর্ড ও সহজবোধ্য তথ্যচিত্র ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে সে ধরনের উপস্থাপনা এখনো দেখা যায় না।
বাজেটের কাঠামো নিয়েও সমালোচনা করেন শফিকুল ইসলাম। তাঁর ভাষ্য, ‘আয়ের হিসাব দেখলে মনে হয়, দেশ উন্নত; কিন্তু ব্যয়ের পরিকল্পনা ও কর্মসূচি দেখলে মনে হয়, আমরা এখনো উন্নয়নশীল দেশের জায়গাতেই আছি। বাজেটে অনেক “আশার ঘর” তৈরি করা হয়েছে, কিন্তু সেগুলোর দরজা এখনো খোলা হয়নি।’
সুশাসনের ওপর গুরুত্বারোপ করে জামায়াতের এই সংসদ সদস্য বলেন, সম্পদের অভাবে নয়, বরং সুষম বণ্টন ও সুশাসনের অভাবেই সংকট তৈরি হয়। পবিত্র কোরআনের একটি আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, সৎ ও দক্ষ মানুষের হাতে দায়িত্ব থাকলে আল্লাহ এমন জায়গা থেকেও রিজিকের ব্যবস্থা করেন, যা মানুষের কল্পনারও বাইরে।
আলোচনায় স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন শফিকুল ইসলাম। তিনি আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সরকারি সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেন, একটি মানবিক হাসপাতাল, যেখানে ৭০০ শয্যার মধ্যে ১৮০টি বিনা মূল্যে, প্রতিদিন ২৩টি স্বাভাবিক প্রসব হয় এবং রোগী-স্বজনদের বিনা মূল্যে খাবার দেওয়া হয়। সেখানে মাত্র ছয়টি শিশু মারা যাওয়ার অজুহাতে লাইসেন্স বাতিল করা হলো।
এ প্রসঙ্গে শফিকুল ইসলাম প্রশ্ন রাখেন, ‘দেশে যখন হামে ৩০০ শিশু মারা গেল, তখন স্বাস্থ্যমন্ত্রী পদত্যাগের কথা ভাবলেন না কেন?’
শফিকুল ইসলামের দাবি, ওই হাসপাতালের ২৪৭ জন বিদেশি শিক্ষার্থীসহ প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন। তাঁরা স্বাস্থ্যসচিব, মহাপরিচালক কিংবা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পাচ্ছেন না। এতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শিক্ষা খাতের বরাদ্দ নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে বরাদ্দে তার প্রতিফলন দেখা যায় না। তাঁর অভিযোগ, এমপিওভুক্ত প্রায় দুই লাখ শিক্ষক মে মাসের বেতন এখনো পাননি। পরিবার নিয়ে তাঁরা মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।
এই সংসদ সদস্য প্রশ্ন তোলেন, ‘শিক্ষকেরা নিয়মিত বেতন না পেলে আমরা কীভাবে বলব শিক্ষা এগিয়ে যাচ্ছে?’
ব্যাংকিং ও শিল্প খাতের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরে শফিকুল ইসলাম ইসলামী ব্যাংকে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তারকারী একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সমালোচনা করেন। একই সঙ্গে স্টিল ও আয়রনশিল্পের কাঁচামালের ওপর শুল্ক ও নিয়ন্ত্রক শুল্ক বৃদ্ধির কারণে দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কার কথাও বলেন।
দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন
দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন প্রসঙ্গে এই সংসদ সদস্য বলেন, পদ্মা সেতুর পরও পটুয়াখালী ও কুয়াকাটাগামী সড়কের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। তাঁর ভাষায়, ‘ভাঙ্গা পর্যন্ত রাস্তা সিঙ্গাপুরের মতো মনে হয়, কিন্তু এরপর পটুয়াখালী-কুয়াকাটা পর্যন্ত রাস্তা একেবারে অজপাড়াগাঁয়ের মতো।’
পদ্মা সেতুর ব্যয় বৃদ্ধির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘১৫ হাজার কোটি টাকার পদ্মা সেতু ৪৫ হাজার কোটি টাকায় শেষ হয়। এই মেগা প্রজেক্ট মানেই মেগা দুর্নীতি।’
ভাঙ্গা-কুয়াকাটা মহাসড়কের উন্নয়ন, পায়রা বন্দরের সম্প্রসারণ, নদীভাঙন রোধ, নৌপথের নাব্যতা বৃদ্ধি এবং মাদক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান তিনি। বক্তব্যের শেষ দিকে সংসদ সদস্যদের কুয়াকাটা সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মেগা প্রজেক্টের অর্থ তখনই সার্থক হবে, যখন তৃণমূলের মানুষ এর সুফল পাবে।’