এবার বসন্তে শুরু হলো সিয়াম সাধনার পর্ব। গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে দেশের মুসলিম জনসাধারণ মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য রোজা রাখতে আরম্ভ করলেন। দিনের বেলা পানাহারে বিরত থেকে মাসব্যাপী চলবে আত্মশুদ্ধির এই সাধনা।
ধর্মীয়ভাবে রমজান মাসে রোজা রাখা মুসলিমদের জন্য বাধ্যতামূলক। এই ইবাদত খুবই মর্তবাপূর্ণ। সংযমের এই সাধনা শরীর ও মনকে পরিশুদ্ধ করে।
রোজার শুরু থেকেই মানুষের জীবনযাপনের নিয়মিত ধারা বদলে যায়। রোজার প্রস্তুতি শুরু হয় শেষ রাতে ঘুম থেকে উঠে সাহ্রি খাওয়ার মধ্য দিয়ে। এরপর ফজরের নামাজ আদায়, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, জিকির–আজকারে নিমগ্ন থাকেন রোজাদারেরা। এভাবেই রাতের আঁধার ফিকে হয়ে গেলে তবে শয্যা গ্রহণ করেন।
সকালে প্রাতরাশের প্রয়োজনীয়তা থাকে না বিধায় অনেকেই একটু বিলম্বে ওঠেন। চাকুরেরা অফিস-কাছারিতে যান। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্কুল-কলেজ প্রভৃতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রমজানের ছুটি বা কর্মকাল সংক্ষিপ্ত থাকে। দিনের বেলায় হোটেল–রেস্তোরাঁগুলো থাকে পর্দা নামানো। প্রকাশ্যে পানাহার বা ধূমপায়ীদের ধোঁয়া ওড়ানোর দৃশ্য বিশেষ চোখে পড়ে না।
রোজাদারেরা শুধু পানাহারে বিরত থাকাই নয়; তাঁদের জীবনাচরণের বহুবিধ ক্ষেত্রেই গতানুগতিকতার পরিবর্তন আনার প্রয়াস পান। বাহুল্য কথাবার্তা বলা থেকে বিরত থাকা, রাগ–ক্রোধ দমন, বিবাদ–বিসংবাদ এড়িয়ে চলা, অন্যায় কাজ থেকে নিজেকে নিবৃত্ত রাখা, এমন অনেকভাবে আত্মনিয়ন্ত্রণের ভেতর দিয়ে স্রষ্টার সন্তুষ্টি লাভের জন্য তাঁরা সদা সচেষ্ট থাকেন।
বরাবরের মতোই গতকালও দিনের মধ্যভাগ থেকে বদলে যাতে থাকে দৃশ্যপট। খাবারের দোকানগুলোর সামনে, পাড়া-মহল্লার মোড়ে, ফুটপাতে বসে যায় ইফতারির পসরা। এই পসরায় মুড়ি, ছোলা, পেঁয়াজু, বেগুনি, জিলাপি, ঘুগনি—এসবের একচেটিয়া আধিপত্য। এর সঙ্গে আছে খেজুর, সালাদসহ মাংস, মিষ্টির হরেক রকম পদ, ফলফলাদি প্রভৃতি। এবার আবহাওয়া একটু চড়া বলে রোজা খোলার পর তৃষ্ণা নিবারণের জন্য শরবতের গ্লাসে চুমুক দিতে অধিকতর আগ্রহী ছিলেন রোজাদারেরা।
বেলা গড়ানোর পর থেকেই ইফতারির পসরাগুলোর সামনে ক্রেতাদের সমাগম ঘটতে থাকে। আবার ফিরে আসে কেনাকাটার ব্যস্ততার সেই চেনা দৃশ্য। বিকেলের পর থেকেই রাজধানীতে রোজাদারেরা চেষ্টা করেন হাতের কাজ শেষ করে ঘরে ফিরে প্রিয়জনকে নিয়ে একত্রে ইফতার করতে। এ কারণে বেলা গড়ানোর পর থেকে গণপরিবহন ও মেট্রোরেলের স্টেশনগুলোতে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের ভিড় বাড়তে থাকে।
ওদিকে বাসাবাড়িতেও ইফতারি তৈরি করা নিয়ে রান্নাঘরে গৃহিণীদের কর্মব্যস্ততাও শুরু হয় দুপুরের পর থেকে। সন্ধ্যার আগেই রান্নাবান্না শেষে সবাই মিলে খাবার টেবিলে বসে যান মাগরিবের আজানের অপেক্ষায়। বেলা ডোবার পরপর সেই বহুল কাঙ্ক্ষিত আজানের ধ্বনি কানে এলেই রোজাদারেরা পরম করুণাময় আল্লাহর রহমত কামনা করে খাদ্য–পানীয় গ্রহণ করে রোজা সম্পন্ন করেন।
পবিত্র রমজান মাসে জীবনযাত্রা, পরিবেশের দৃশ্যপটে এই পরিবর্তনের পাশাপাশি আরও এক রকমের পরিবর্তন ঘটে যায়, যা রমজান মাসের সংযম, শিক্ষা, নীতিনৈতিকতার সঙ্গে কিছুতেই মেলে না। কিন্তু আমাদের এখানে বরাবরই সেই পরিবর্তনটি ঘটছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কাঁচাবাজারে হেন কোনো পণ্য নেই, রমজান মাসে যার দাম পরিবর্তিত হয়নি।
প্রতিনিয়তই আমরা মুখে মুখে সংযমের কথা বলি আর বাজারে তার অসংযমী প্রতিক্রিয়া দেখে যাই। কেন এমন হয়? কে জবাব দেবে? জবাব হয়তো নিজেরই দেওয়া প্রয়োজন সবার আগে। এই রমজান মাস সবার জন্য কল্যাণকর হোক।