পুলিশি নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহকে আদালতে হাজির করা হয়। ৩০ জুলাই
পুলিশি নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহকে আদালতে হাজির করা হয়। ৩০ জুলাই

এবার হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার

‘আমিই প্রথম আবু সাঈদ হত্যার প্রতিবাদ করেছি’ আদালতকে সাবেক ভিসি কলিমউল্লাহ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায় মুস্তাঈন বিল্লাহ সাব্বির নামে ব্যক্তিকে হত্যাচেষ্টার মামলায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করেছেন আদালত।

এদিন কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কলিমউল্লাহ আদালতকে বলেন, ‘আমিই আবু সাঈদের হত্যার প্রথম প্রতিবাদ করেছি। আমিই প্রতিবাদ জানিয়েছি সবার আগে। এটা রেকর্ড আছে। জুলাই আন্দোলনে আমি কোথাও বিপক্ষ অবস্থান করিনি। আমি আন্দোলন সমর্থন করেছি।’

আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে শুনানি শেষে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইনের আদালত কলিমউল্লাহকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

গত বছরের ১৪ অক্টোবর ভুক্তভোগী মুস্তাঈন বিল্লাহ সাব্বির উত্তরা পশ্চিম থানায় হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলাটি করেন। মামলার অভিযোগ থেকে জানা গেছে, ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে মুস্তাঈন বিল্লাহ সাব্বির অংশ নেন। ১৯ জুলাই বিকেলে উত্তরা পশ্চিম থানাধীন রবীন্দ্রসরণি রোড এলাকায় অবস্থানকালে স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ছাত্র-জনতার ওপর অতর্কিত গুলি চালায়। এ সময় একটি গুলি বাদীর বাঁ হাতের কনুই ছেদ করে বের হয়ে যায় এবং আরও কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়। উপস্থিত লোকজন বাদীকে উত্তরা হাইকেয়ার জেনারেল হাসপাতাল নিয়ে যায়। সেখান থেকে তাঁকে রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (পঙ্গু হাসপাতাল) ভর্তি করা হয়।

২৮ জুলাই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার উপপরিদর্শক মো. আবু সাঈদ আসামি কলিমউল্লাহকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেন। ওই দিন আদালত আসামির উপস্থিতিতে শুনানির জন্য আজ বৃহস্পতিবার দিন নির্ধারণ করেন।

আবেদনে বলা হয়, এ মামলার ঘটনায় আসামি কলিমউল্লাহর জড়িত থাকার যথেষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়। বর্তমানে তিনি জেলহাজতে আছেন। তাঁকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো প্রয়োজন। মামলাটির সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে তদন্তকাজ সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত কলিমউল্লাহকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে আটক রাখা একান্ত প্রয়োজন।

আজ কলিমউল্লাহর পক্ষের আইনজীবী আব্দুল রশীদ এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর বিরোধিতা করে শুনানি করেন। রাষ্ট্রপক্ষে মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন শুনানি করেন। শুনানিতে তদন্ত কর্মকর্তা আবু সাইদ আদালতকে বলেন, তাঁর এই মামলায় সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।

এই আসামি শেখ হাসিনার একজন সুবিধাভোগী

এ সময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা বলেন, শেখ হাসিনাকে ফ্যাসিস্ট বানানোর অন্যতম কারিগর এই কুশীলব বুদ্ধিজীবী। তিনি দিনের ভোট রাতে করানোর বৈধতা দিয়েছেন। আজকের এই আসামি শেখ হাসিনার একজন সুবিধাভোগী। জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের মিছিলে গুলি করা ও তাঁদের লাশ গুম করার পেছনে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এই কলিমউল্লাহ। এ মামলায় তাঁর সংশ্লিষ্টতা থাকায় তদন্ত কর্মকর্তা তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন জানিয়েছেন। আমি এই আবেদনে সমর্থন জানিয়ে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন জানাচ্ছি।

গ্রেপ্তার দেখানোর বিরোধিতা করে আসামিপক্ষের আইনজীবী আব্দুর রশীদ বলেন, তিনি একজন অধ্যাপক। তাঁর নিজস্ব চিন্তাচেতনা আছে। তাঁর কাজ শিক্ষকতা করা। তাঁর কাজ গুলি চালানো নয়। এ মামলায় ৯০ জন আসামি আছে। কিন্তু তাঁর নাম ৬১-৬২-তে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা মামলায় কারাগারে আছেন। সেগুলোতেও এখন জামিনে। হঠাৎ এত দিন পর কেন তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হলো, তা বোধগম্য নয়।

এই আইনজীবী আরও বলেন, হাইকোর্ট থেকে জামিনের ৩০ ঘণ্টা পর আবার গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন আসছে। কবেকার সেই নির্বাচনকালীন দায়িত্বের কথা এত দিন পর টেনে আনা যুক্তিহীন। নিয়ম অনুযায়ী ঘটনার এক বছর পর শোন অ্যারেস্ট দেখাতে পারেন না আদালত। এটা দুই বছর আগের মামলা। তাঁকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী।

আদালতে কলিমউল্লাহ যা বললেন

এ সময় আদালতের অনুমতি নিয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কলিমউল্লাহ বলেন, ‘নির্বাচনে আমি যা দেখেছি, তাই বলেছি। সেখানে আমার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত দায়িত্ব ছিল। এর আগে-পরে কিছু হয়েছে কি না, সেটা তো আমার জানার কথা না।’

এ সময় বিচারক কলিমউল্লাহর উদ্দেশে বলেন, ‘এটা তো আপনার দায়িত্ব। আগে-পরের ঘটনা জানা। আগের বা পরের কোনো অভিযোগ থাকলে আপনি দেখবেন না?’ কলিমউল্লাহ বলেন, ‘এ সম্পর্কিত আমার অনেক আর্টিকেল আছে’। বিচারক বলেন, ‘জি পড়েছি আপনার আর্টিকেল।’

এ সময় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কলিমউল্লাহ আরও বলেন, ‘আমিই আবু সাঈদের হত্যার প্রথম প্রতিবাদ করেছি। আমিই প্রতিবাদ জানিয়েছি সবার আগে। এটা রেকর্ড আছে। জুলাই আন্দোলনে আমি কোথাও বিপক্ষ অবস্থান করিনি। আমি আন্দোলন সমর্থন করেছি।’ উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত এ মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করেন।

আজ দুপুরে হাজতখানা থেকে পুলিশি নিরাপত্তায় তাঁকে বুলেটপ্রুভ জ্যাকেট, হাতকড়া ও হেলমেট পরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে হাঁটিয়ে আদালতে ওঠানো হয়। এ সময় তাঁর হেলমেট, হাতকড়া খুলে দেওয়া হয়। শুনানি শেষে তাঁকে নিচে নামানোর সময় প্রশ্ন করা হলে তিনি কথা বলার চেষ্টা করেন। তবে দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের বাধার কারণে তিনি কথা বলতে পারেননি।

২০২৫ সালের ৭ আগস্ট রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ কলিমউল্লাহকে গ্রেপ্তার করে। ওই দিনই জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এরপর থেকে তিনি কারাগারেই আছেন।