সুশৃঙ্খল জীবনযাপনে কমবে বুক জ্বালাপোড়া

‘গলা ও বুক জ্বালাপোড়া সচেতনতা সপ্তাহ ২০২৩’ উপলক্ষে ২৬ নভেম্বর রাজধানীর মহাখালীতে শেখ রাসেল জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকেরা
 ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ মানুষ গলা ও বুক জ্বালাপোড়া সমস্যায় ভোগেন। এটাকে বলা হয় ‘গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ’ বা সংক্ষেপে জিইআরডি। এ রোগে অনেক ক্ষেত্রে গুরুতর সমস্যা দেখা দেয়। তবে নিয়ম মেনে জীবনযাপন ও পরিমিত খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুললে এবং চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করলে গলা ও বুক জ্বালাপোড়া থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

‘গলা ও বুক জ্বালাপোড়া সচেতনতা সপ্তাহ ২০২৩’ উপলক্ষে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে এমন পরামর্শ দিয়েছেন গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা। ২৬ নভেম্বর রাজধানীর মহাখালীতে শেখ রাসেল জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে অনুষ্ঠিত হয় গোলটেবিলটি। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে আরো উঠে আসে মদ্যপান, ধূমপান, মসলাযুক্ত খাবার, কোমল পানীয় পরিহারের কথা। নিয়মিত শরীরচর্চার বিষয়ে জোর দেন তাঁরা।

বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর ২০ থেকে ২৬ নভেম্বর ‘গলা ও বুক জ্বালাপোড়া সচেতনতা সপ্তাহ’ পালন করা হয়। গোলটেবিল বৈঠকের বৈজ্ঞানিক অংশীদার এসোরাল মাপস এবং সহযোগিতায় ছিল এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। অনুষ্ঠানটি সরাসরি প্রচারিত হয় প্রথম আলোর ফেসবুক পেজে।

আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, জাতীয় অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হাসান খান, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ডা. এ কে আজাদ খান, শেখ রাসেল জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক ডা. গোলাম কিবরিয়া, যুগ্ম–পরিচালক ডা. মাসুদুর রহমান, অধ্যাপক ডা. মো. সিরাজুল ইসলাম, ডা. তৌহিদুল করিম মজুমদার, অভিনেত্রী জয়া আহসান, প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হক এবং ইমেরিটাস সম্পাদক নাঈমুল ইসলাম খান।

‘গলা ও বুক জ্বালাপোড়া সচেতনতা সপ্তাহ ২০২৩’ উপলক্ষে আয়োজিত গোলটেবিলে জাতীয় অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হাসান খান। শেখ রাসেল জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, মহাখালী ঢাকা, ২৬ নভেম্বর ২০২৩

বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় অধ্যাপক ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ডা. মাহমুদ হাসান খান। স্বাগত বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘আমরা যখন খাবার খাই, খাবারের সাথে সাথে পাকস্থলীর অ্যাসিড শরীরের নিচের দিকে নামে। যদি এর উল্টো ঘটে অর্থাৎ পাকস্থলীর অ্যাসিড নিচে না নেমে বরং ওপরে গলার দিকে উঠে আসে, তখন আমরা বুকে জ্বালাপোড়া অনুভব করি। একে “অ্যাসিড রিফ্লাক্স” বলা হয়। আমরা অনেকেই এটাকে গ্যাস্ট্রিক, গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা বা অ্যাসিডিটি বলে থাকি। এই রোগ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতেই আমাদের এই আলোচনা।’

‘গলা ও বুক জ্বালাপোড়া সচেতনতা সপ্তাহ ২০২৩’ উপলক্ষে আয়োজিত গোলটেবিলে অধ্যাপক অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। শেখ রাসেল জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, মহাখালী ঢাকা, ২৬ নভেম্বর ২০২৩

এই রোগের ভুক্তভোগী অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, ‘আমি বেশ কয়েক বছর শারীরিক এই সমস্যায় ভুগেছি। জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে আমি নিয়মিত চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করে থাকি। খাবারে পরিমিতিবোধ ও জীবনযাপন ঠিক রাখলে বুক জ্বালাপোড়া থেকে রেহাই পাওয়া যায়।’

বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক এ কে আজাদ খান বলেন, ‘অতিরিক্ত খাবার খেয়ে পাকস্থলীর ওপর চাপ সৃষ্টি করলে হজমপ্রক্রিয়ায় গোলমাল হয়। তাই একবারে অতিরিক্ত খাবার খাওয়া যাবে না।’

সাংবাদিক নাঈমুল ইসলাম খান ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে বলেন, ‘বছরে কমপক্ষে একবার আমাকে এই সমস্যার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হতে হতো। জীবনযাত্রা সুশৃঙ্খল করে ৫-৬ বছর ধরে বেশ সুস্থ আছি।’

কথাশিল্পী ও সাংবাদিক আনিসুল হক বলেন, ‘সুন্দরভাবে বাঁচা, ভালোভাবে বাঁচা—বিষয়গুলো বুঝতে হবে। সচেতন হয়ে জীবনযাপন করলে পরিপাকতন্ত্রের এই সমস্যা খুব একটা কাছে আসতে পারবে না।’

 ‘গলা ও বুক জ্বালাপোড়া সচেতনতা সপ্তাহ ২০২৩’ উপলক্ষে আয়োজিত গোলটেবিলে কথাশিল্পী ও সাংবাদিক আনিসুল হক। শেখ রাসেল জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, মহাখালী ঢাকা, ২৬ নভেম্বর ২০২৩

নাক থেকে নাভি পর্যন্ত সব ব্যথাই সন্দেজনক, তাই এমনটা হলে সতর্ক থাকতে হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক সিরাজুল ইসলাম। তিনি আরও বলেন, ‘ধূমপান, মদপান বাদ এবং সুশৃঙ্খল জীবনযাপনই পারে এই সমস্যা থেকে রেহাই দিতে। অনেক দিন ধরে এই সমস্যায় ভুগলে এটা থেকে ক্যান্সার হয়। সুতরাং সচেতনতার বিকল্প নেই।’

‘সারাক্ষণ খাবার খেয়ে খাদ্যনালীকে ব্যস্ত রাখা যাবে না। খাবার গ্রহণে পরিমিতিবোধ বজায় রাখতে হবে,’ বলেন শিশুবিশেষজ্ঞ ইফতেখার মাহমুদ।

অভিনেত্রী জয়া আহসান বলেন, ‘আমার এক পরিচিত এই রোগের কারণে বেশ কয়েক বছর ভুগেছেন। সব কিছুর সময়মতো চিকিৎসা প্রয়োজন। আমাদের বাড়ির অনেক নারীকেই দেখি, তাঁরা সময়মতো খাবার খান না, নিজের যত্ন নেন না। আমার অনুরোধ, মায়েরা আগে নিজের যত্ন নেবেন। কারণ মায়েরা সুস্থ থাকলে তাঁদের সন্তান এবং সংসার সুন্দর করে দেখাশোনা করতে পারবেন।’

 ‘গলা ও বুক জ্বালাপোড়া সচেতনতা সপ্তাহ ২০২৩’ উপলক্ষে আয়োজিত গোলটেবিলে অভিনেত্রী জয়া আহসান। শেখ রাসেল জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, মহাখালী ঢাকা, ২৬ নভেম্বর ২০২৩

শেখ রাসেল জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক মো. গোলাম কিবরিয়া বলেন, ‘অসুস্থ বোধ করলে নিজে নিজে ইন্টারনেটভিত্তিক চিকিৎসা না নিয়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াও গলা ও বুক জ্বালাপোড়া থেকে ভালো থাকা যায়।’

ডা. মাসুদুর রহমান বলেন, ‘খাবার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় খাদ্যনালি থেকে পাকস্থলীতে নামে। পাকস্থলীতে হজম প্রক্রিয়া হয়। পাকস্থলী থেকে যেন জারক রসসহ অন্যান্য উপাদান খাদ্যনালিতে না যেতে পারে, সে জন্য পাকস্থলীতে একমুখী একটা দরজা (ভাল্ভ) রয়েছে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে খাবার খেলে অনেক সময় পাকস্থলী থেকে খাবার খাদ্যনালিতে চলে এলে জারক রসের কারণে গলা-বুক জ্বালাপোড়া করে এবং মুখে টক পানি চলে আসে। তাই খাবার গ্রহণে সচেতন হতে হবে।’

অধ্যাপক সাইদা রহিম বলেন, ‘পাকস্থলী থেকে অ্যাসিড তৈরি রোধ করতে এখন অনেক ওষুধ তৈরি হয়েছে। ওষুধগুলো যেন সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে, সেভাবে ব্যবহার করতে হবে।’

বুক জ্বালাপোড়া করলে ভুক্তভোগী সঠিক সেবা কোথায় পাবেন তা নিয়ে অনেকেই দ্বিধায় থাকেন। এই রোগের আধুনিক সব পরীক্ষার ব্যবস্থা ও চিকিৎসা শেখ রাসেল জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে আছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির মেডিক্যাল গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক তৌহিদুল করিম মজুমদার।