বিএফইউজে মহাসচিব এবং বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক কাদের গনি চৌধুরী মঙ্গলবার নিউইয়র্কে কর্মরত সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন
বিএফইউজে মহাসচিব এবং বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক কাদের গনি চৌধুরী মঙ্গলবার নিউইয়র্কে কর্মরত সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন

সত্য খুঁজে বের করা, তা রক্ষা করা সাংবাদিকের প্রধান কাজ: কাদের গনি চৌধুরী

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব এবং বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক কাদের গনি চৌধুরী বলেন, সাংবাদিকতা হচ্ছে সত্যের আরাধনা। সাংবাদিকের কাজ সত্যকে খুঁজে বের করা। সেই সত্যকে রক্ষা করা। সত্য না থাকলে আস্থা থাকে না, আর আস্থার অভাব হলে গণতন্ত্রও থাকে না।

স্থানীয় সময় গতকাল মঙ্গলবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে নিউইয়র্ক বাংলাদেশ প্রেসক্লাব আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় কাদের গনি চৌধুরী এ কথা বলেন। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন উপলক্ষে বাংলাদেশ থেকে আগত সাংবাদিকদের সঙ্গে নিউইয়র্কে কর্মরত সাংবাদিকদের এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়।

বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন কাদের গনি চৌধুরী। তিনি বলেন, সাংবাদিকতা পুরোপুরি সত্যতার ভিত্তিতে হতে হবে। এখানে মিথ্যা কিংবা অর্ধসত্যের কোনো স্থান নেই। এ ক্ষেত্রে আপসেরও কোনো সুযোগ নেই। সংবাদমাধ্যম দেশের জনগণ ছাড়া কারও কাছে দায়বদ্ধ নয়। কালোকে কালো, আর সাদাকে সাদা বলাই সাংবাদিকতার মূলমন্ত্র।

কাদের গনি চৌধুরী বলেন, ‘মনে রাখতে হবে, দাসত্বের সাংবাদিকতাকে মানুষ ঘৃণা করে। ১৭ বছর ধরে আমরা অনেক সাংবাদিককে দাসত্বের সাংবাদিকতা করতে দেখেছি। এ কারণে ফ্যাসিবাদী শাসন দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে এবং সাংবাদিকদের মর্যাদা ম্লান হয়েছে।’

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ–অভ্যুত্থান বিষয়টি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে বলে উল্লেখ করেন কাদের গনি চৌধুরী। তিনি বলেন, যাঁরা দীর্ঘদিন দলীয় ব্যানারের আড়ালে সাংবাদিকতা করেছেন, ক্ষমতার সঙ্গে আঁতাত করে জনগণের স্বার্থ বিসর্জন দিয়েছেন, তাঁরা শেষ পর্যন্ত জনগণের রোষানল থেকে বাঁচতে পারেননি। কেউ দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন, কেউ হত্যা মামলার আসামি হয়ে কারাগারে গেছেন, আবার অনেকে এখনো পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

কাদের গনি চৌধুরী বলেন, ‘এই বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি অমোঘ সত্য হাজির করেছে—সাংবাদিকতা কখনো দলীয় ব্যানারের ভিত্তিতে টিকে থাকতে পারে না। জনগণের আস্থা হারানো মানে সাংবাদিকতার মৃত্যু। সাংবাদিকতা কোনো মুনাফাভিত্তিক ব্যবসা নয়, এটি একটি সম্মানের পেশা।’

সাংবাদিকতার পথ কখনোই সহজ বা মসৃণ ছিল না বলে উল্লেখ করেন বিএফইউজে মহাসচিব। তিনি বলেন, বর্তমানে গণমাধ্যমে যে অনুকূল পরিবেশ বিরাজ করছে, তা অব্যাহত থাকলে সাংবাদিকেরা আরও বেশি সত্য তুলে ধরতে পারবেন। তবে যা ইচ্ছা তা লিখলেই সাংবাদিকতা হয় না। যা মুখে আসে তা বলাই বাক্‌স্বাধীনতা নয়। স্বাধীনতার পাশাপাশি সাংবাদিকদের দায়িত্বশীলতার বিষয়টিও মনে রাখতে হবে।

গণমাধ্যমের সংখ্যা দ্রুত বাড়ার প্রসঙ্গে কথা বলেন কাদের গনি চৌধুরী। তিনি বলেন, অধিকাংশ নতুন গণমাধ্যমের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নেই। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার পরিবর্তে ব্যবসায়ীসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে নানাভাবে হয়রানি, ব্ল্যাকমেল করার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। মুঠোফোন হাতে নিয়েই অনেকে সাংবাদিক পরিচয় দিচ্ছেন। এর ভয়াবহতা থেকে কেউই নিরাপদ নন। এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করেও সামাজিকভাবে মানুষকে হেয়প্রতিপন্ন করা হচ্ছে।

এসব বন্ধে আইনের সঠিক প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দেন কাদের গনি চৌধুরী। তিনি বলেন, অপসাংবাদিকতা ও হয়রানি রোধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে আইনের যাতে অপব্যবহার না হয়, সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে।

কাদের গনি চৌধুরী বলেন, ওয়েজ বোর্ড অনুযায়ী বেতন দিতে হয় না বলেই অসংখ্য ভূঁইফোড় গণমাধ্যম গড়ে উঠছে। এসব গণমাধ্যমের ক্ষেত্রেও ওয়েজ বোর্ড বাধ্যতামূলক করা হলে অপসাংবাদিকতা অনেকাংশে কমে আসবে বলে তিনি মনে করেন।

সাংবাদিকসমাজের বিভাজন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিএফইউজে মহাসচিব। তিনি বলেন, ‘আজকে আমাদের মাঝে বহু বিভাজনের কারণে আমরাই দুর্বল হচ্ছি। সরকার ও মালিকেরা এর সুযোগ নেন।’

সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান কাদের গনি চৌধুরী। তিনি বলেন, সাংবাদিকসমাজ ঐক্যবদ্ধ হলে গণমাধ্যমের অনেক সমস্যা দূর করা সম্ভব হবে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখা যাবে।