
তরুণ উদ্যোক্তাদের হাত ধরেই তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন ব্যবসা ও সম্ভাবনার গল্প। তবে একটি উদ্যোগ শুরু করা থেকে সেটিকে টিকিয়ে রাখা ও এগিয়ে নেওয়ার পথ সহজ নয়। নানা চ্যালেঞ্জ, সিদ্ধান্ত ও শেখার অভিজ্ঞতা পেরিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা কীভাবে গড়ে তুলছেন নিজেদের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান—সেই সব গল্প নিয়েই প্রথম আলো ডটকম ও প্রাইম ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে বিশেষ পডকাস্ট শো ‘লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন–৩’। এই পর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ রিদওয়ানুল হকের সঞ্চালনায় অতিথি ছিলেন ‘ইশো’র প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক রায়ানা হোসেন।
ডিজাইন করার ক্ষেত্রে আমরা মূলত তিনটি বিষয় নিশ্চিত করি—ঐতিহ্য, আধুনিকতা ও কার্যকারিতা। অর্থাৎ ডিজাইনে দেশীয় ও বৈশ্বিক ঐতিহ্যের ছাপ থাকবে, সেটি হতে হবে বর্তমান সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং একই সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কার্যকর।
পডকাস্টে অংশ নিয়ে কথাগুলো বলেন রায়ানা হোসেন। পর্বটি প্রচারিত হয় শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) প্রথম আলোর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে।
রায়ানা হোসেন একজন তৃতীয় প্রজন্মের উদ্যোক্তা উল্লেখ করে পডকাস্টের শুরুতেই সঞ্চালক ব্যবসায় তাঁর পরিবারের ইতিহাস এবং নিজের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্পটি জানতে চান।
রায়ানা হোসেন বলেন, ‘ব্যবসায় আমার পরিবারের ইতিহাস প্রায় ৭০ বছরের। রক্সি পেইন্ট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমার দাদার হাত ধরে এই যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে আমার বাবা এবং চাচা মিলে শুরু করলেন ডেকো গার্মেন্টস। তারপর আমি আর্কিটেকচার নিয়ে বিদেশে পড়াশোনা করলাম। দেশের বাইরে গিয়ে পড়াশোনা করার উদ্দেশ্যই ছিল দেশে এসে কিছু করা। এরপর দেশে ফিরে আমার যাত্রা শুরু হলো ‘‘ইশো’’র সঙ্গে।’
হার্ভার্ডে পড়াশোনায় যা শিখছেন, মনে হয়েছিল দেশে এসে তা কাজে লাগাতে পারবেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে রায়ানা হোসেন বলেন, ‘সে সময়ে সেটা কিছুটা কঠিন মনে হলেও এখন আমি সেই শিক্ষা ও অভিজ্ঞতাগুলো কাজে লাগানোর অনেক সুযোগ দেখছি।’
প্রসঙ্গক্রমে সঞ্চালক জানতে চান, আপনি কেন ফার্নিচার ইনডাস্ট্রিতে ব্যবসা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিলেন?
রায়ানা হোসেন বলেন, ‘আমি যখন দেশে ফিরলাম, তখন ফার্নিচার ইন্ডাস্ট্রিতে একটি মার্কেট–গ্যাপ ছিল। মানুষ যেটা চাচ্ছিল এবং মার্কেটে যেটা ছিল তার মধ্যে বিশাল একটা গ্যাপ ছিল। এ কারণেই আমি এখানে কাজ শুরু করি।’
এই গ্যাপটা তিনি কীভাবে বুঝতে পারলেন? জানতে চাইলে রায়ানা হোসেন বলেন, ‘মানুষের রিভিউ এবং আমার নিজের চাহিদা থেকেই এই গ্যাপটা বুঝতে পারি। কোভিড চলাকালীন মানুষের মধ্যে ডিজাইনের ধারণায় একটা বিশাল পরিবর্তন আসে। সে সময় মানুষের মধ্যে গ্লোবাল মিডিয়ার এক্সপোজারটা বেড়ে যায়। যা মানুষের রুচি এবং চিন্তাধারা এমনকি জীবনযাত্রার মধ্যেও একধরনের পরিবর্তন বয়ে নিয়ে আসে। তখনই মানুষের চাহিদা অনুযায়ী আমাদের ডিজাইনের ভাষায় একটা পরিবর্তন নিয়ে আসতে হয়।’
এরপর সঞ্চালক জানতে চান, ইশো প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে তাঁকে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে?
উত্তরে রায়ানা হোসেন বলেন, ‘শুরুর দিকে সবচেয়ে বেশি সমস্যার মুখোমুখি হয়েছি ডিজাইনারদের নিয়ে। আমাদের দেশে খুব ভালো ডিজাইনার নেই, যাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি আছে। ফলে অনেককেই বিদেশে নিয়ে গিয়ে সেগুলো শেখাতে হয়েছে, বোঝাতে হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, প্রোডাকশনেও বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। যেমন কাঠের ধরন চেনা, সবকিছু চকচকে না করে ম্যাট করা—এসব নিয়েও কাজ করতে হয়েছে।
আপনি ফার্নিচার ডিজাইনের সময় স্লিম এবং স্মার্ট টেক্সচারকে গুরুত্ব দেন? এর কারণ কী? সঞ্চালকের এমন প্রশ্নের উত্তরে রায়ানা হোসেন বলেন, ‘এটিই আধুনিক বাংলাদেশের চাহিদা বলে আমি মনে করি। আগে যেমন অনেক বড় ডিজাইনের বিশাল ফার্নিচার মানুষ পছন্দ করতেন, এগুলো এখন আর মানুষ পছন্দ করেন না। মানুষের থাকার জায়গা এখন ছোট হয়ে আসছে। যেমন স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট বা এক-বেডরুমের ঘর। তাই ফার্নিচার এমন হওয়া উচিত, যা ঘরের জায়গা বাঁচায় এবং আধুনিক জীবনযাত্রার সঙ্গে মানানসই হয়।’
এরপর সঞ্চালক জানতে চান, ব্যবসায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আপনি মাল্টি-ন্যাশনাল প্রতিষ্ঠানগুলোর মতো ডেটার ওপর নির্ভর করেন। আসবাবশিল্পে ডেটা-চালিত নীতি কীভাবে কাজ করে?
রায়ানা হোসেন বলেন, এর মূল কারণ ইউনিলিভারের মতো বড় মাল্টি-ন্যাশনাল প্রতিষ্ঠান যেভাবে গ্রাহকের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেয়, আসবাবশিল্পের ক্ষেত্রেও ঠিক একই নিয়ম প্রযোজ্য।
কোভিডের সময় আপনার ব্যবসায়িক সাফল্যের পেছনে ডেটার ভূমিকা কেমন ছিল? জানতে চাইলে রায়ানা হোসেন বলেন, ‘কোভিডের সময় ডেটা বিশ্লেষণ করেই আমরা বুঝতে পেরেছিলাম যে একসময় দীর্ঘমেয়াদে মানুষকে ঘর থেকে কাজ করবে। ডেটার মাধ্যমেই আমরা দ্রুত বুঝতে পারি মানুষ “ওয়ার্ক ফ্রম হোম” সেটআপ, শেলফ কিংবা গেমিং টেবিল খুঁজছে। সেই অনুযায়ী আমরা পণ্য সরবরাহ করি।’
আসবাবপত্রের ডিজাইন করার ক্ষেত্রে ডেটা ও ডিজাইনের মধ্যে কীভাবে সামঞ্জস্য বজায় রাখা উচিত? আপনারা কীভাবে ডিজাইনের অনুপ্রেরণা পান এবং প্রোডাক্ট কালেকশনগুলো কীভাবে তৈরি করেন?
সঞ্চালকের এমন প্রশ্নের উত্তরে রায়ানা হোসেন জানান, ডিজাইন করা উচিত আগামীর কথা ভেবে। ডিজাইন একটি দার্শনিক বিষয়, যা মানুষের পরিস্থিতি, বর্তমান সময় ও রূপকে প্রতিফলিত করে। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে ডিজাইন মানে এমন কিছু, যা অতীতের ঐতিহ্য থেকে অনুপ্রেরণা নিলেও ভবিষ্যতের কথা ভেবে তৈরি করা হয়। যেমন আমাদের প্রতিটি কালেকশনের নামকরণের ক্ষেত্রেও কোনো শহরের ঐতিহ্য, স্থাপত্য বা উপকরণ থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া হয়।’
নন-ব্র্যান্ডেড ফার্নিচার মার্কেট সম্পর্কে নিজের মূল্যায়ন সম্পর্কে রায়ানা হোসেন বলেন, বাংলাদেশে নন-ব্র্যান্ডেড ফার্নিচারের বাজার বেশ বড়। দেশের মোট ফার্নিচার মার্কেটের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই নন-ব্র্যান্ডেড ফার্নিচারের দখলে। অর্থাৎ ব্র্যান্ডেড ফার্নিচারের তুলনায় নন-ব্র্যান্ডেড ফার্নিচারের বাজারের পরিসর অনেক বেশি।
আসবাবপত্রের বাইরে ‘ইজাকায়া’ নামে রেস্টুরেন্ট চালুর পেছনের গল্প জানতে চাইলে রায়ানা হোসেন বলেন, ‘আমি নিজে খেতে খুব ভালোবাসি। ইশো ফ্যাক্টরির কাজ চলার সময়েই জাপানি খাবারের এই ক্যাজুয়াল ডাইনিং কনসেপ্টটি আমি শুরু করি। জাপানে কাজ শেষে গলির ভেতরের রেস্টুরেন্টে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছোট ছোট খাবার খাওয়ার যে সংস্কৃতি রয়েছে, সেটি থেকেই আমি অনুপ্রাণিত হই।’
কোন ভাবনা থেকে শিল্পীদের জন্য ‘আর্ট’ প্ল্যাটফর্ম শুরু করলেন? জানতে চাইলে রায়ানা হোসেন বলেন, ‘আমার নিজের ব্যাকগ্রাউন্ড আর্টস। তাই শুরু থেকেই শিল্পীদের কাজের প্রতি আমার ভীষণ আগ্রহ ছিল। উদীয়মান ও প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশি শিল্পীদের কাজ শুধু দেশের মানুষের কাছে নয়, বরং আন্তর্জাতিক পরিসরেও তুলে ধরতে চেয়েছি। সেই ভাবনা থেকেই ‘‘আর্ট’’ প্ল্যাটফর্মটি তৈরি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের শিল্পীদের কাজ বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার পাশাপাশি তাঁদের জন্য একটি বৃহত্তর প্ল্যাটফর্ম ও ইকোসিস্টেম তৈরি করতে চাই।’
আলোচনার শেষ পর্যায়ে সঞ্চালক জানতে চান, ব্যবসায়িক পরিবারে বেড়ে ওঠা এবং বাবা-মায়ের কাছ থেকে নিজের মতো করে কাজ করার স্বাধীনতা—আপনার উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে কতটা ভূমিকা রেখেছে?
রায়ানা হোসেন বলেন, ‘আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি, কারণ বাবা-মা আমাকে সবসময় নিজের মতো করে কাজ করার এবং ব্যবসাকে নিজের ভাবনায় এগিয়ে নেওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছেন। ছোটবেলা থেকেই আমাদের পরিবারে ব্যবসা নিয়ে আলোচনা হতো। তাই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বিজনেস স্কুলের চেয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে পরিবারের সঙ্গে ব্যবসা নিয়ে হওয়া আলোচনা থেকেই আমি সবচেয়ে বেশি শিখেছি।’