এলপিজি ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটের কারণে সিলিন্ডার গ্যাস বিক্রির সব দোকান বন্ধ থাকায় ভোগান্তিতে পড়েন গ্রাহকেরা। ধর্মঘট প্রত্যাহারের পর দোকান থেকে সিলিন্ডার নিয়ে গন্তব্যে ফিরছেন এক ব্যক্তি। গতকাল বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকায়
এলপিজি ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটের কারণে সিলিন্ডার গ্যাস বিক্রির সব দোকান বন্ধ থাকায় ভোগান্তিতে পড়েন গ্রাহকেরা। ধর্মঘট প্রত্যাহারের পর দোকান থেকে সিলিন্ডার নিয়ে গন্তব্যে ফিরছেন এক ব্যক্তি। গতকাল বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকায়

ধর্মঘট প্রত্যাহার, কাটেনি এলপিজি সিলিন্ডার সংকট

  • বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে গ্যাস সিলিন্ডার।

  • আমদানি বাড়াতে জ্বালানি বিভাগের পাঁচ উদ্যোগ।

  • এলপিজির আমদানি বেড়ে বাজারে সরবরাহ সংকট কমতে পারে।

তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) বিক্রি বন্ধ করতে ডাকা ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তবে এরপরও এলপিজি সংকট কাটছে না। বাজারে এলপিজি সরবরাহে ঘাটতি আছে।

আমদানি বাড়াতে এলপিজি কোম্পানির দাবি পূরণে ইতিমধ্যে ৫ দফা উদ্যোগ নিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। আমদানি বাড়ানোর প্রক্রিয়াও শুরু করেছে কয়েকটি কোম্পানি। সরবরাহ স্বাভাবিক হতে আরও কিছুদিন লাগতে পারে।

এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) সূত্র বলছে, গত বছর অধিকাংশ কোম্পানি এলপিজি আমদানি করেনি। মূলত পাঁচটি কোম্পানি সিংহভাগ আমদানি করেছে। আরও ৫ থেকে ৬টি কোম্পানি কিছু কিছু আমদানি করেছে। মোট আমদানি হয়েছে সাড়ে ১৮ লাখ টন। একই বছরে বিক্রি হয়েছে এর চেয়ে বেশি। আগের বছর আনা এলপিজিও বিক্রি হয়েছে।

সরবরাহ কম থাকার সুযোগে ১ হাজার ৩০৬ টাকার এলপিজির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে আড়াই হাজার টাকায়ও বিক্রি হচ্ছে। বেশি দাম দিয়েও এলপিজি পাচ্ছেন না কেউ কেউ। অনেকে বিদ্যুৎ-চালিত চুলা কিনে রান্নার কাজ সারছেন। দুই সপ্তাহ ধরে এমন পরিস্থিতি চলছে।

সরকারের পাঁচ উদ্যোগ

এরই মধ্যে গত রোববার এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে জ্বালানি বিভাগ। পরদিন সোমবার ‘এলপিজির আমদানি বাড়াতে চেয়ে অনুমতি পাননি ব‍্যবসায়ীরা’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে প্রথম আলো।

আমদানিকারকেরা বলছেন, এলপিজি আমদানি করে মজুত রাখার তেমন সুযোগ নেই। বিশ্ববাজারে দাম নিয়মিত ওঠানামা করে। মজুত করলে বাড়তি মুনাফার সঙ্গে বড় ধরনের লোকসানের ঝুঁকিও থাকে। তাই প্রতি মাসের চাহিদা হিসাব করেই এলপিজি কেনা হয়।

জ্বালানি বিভাগ সূত্র বলছে, এলপিজির চলমান সংকট নিরসনে পাঁচটি উদ্যোগ নিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। শুল্ক কমাতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও এলসি (ঋণপত্র খোলা) সহজ করতে বাংলাদেশ ব‍্যাংককে অনুরোধ করে চিঠি দেওয়া হয়েছে। পাঁচটি কোম্পানিকে বাড়তি আমদানির অনুমতি দিতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে (বিইআরসি) চিঠি পাঠানো হচ্ছে। এতে এলপিজির আমদানি বেড়ে বাজারে সরবরাহ সংকট কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সরবরাহ কম থাকার সুযোগে ১ হাজার ৩০৬ টাকার এলপিজির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে আড়াই হাজার টাকায়ও বিক্রি হচ্ছে। বেশি দাম দিয়েও এলপিজি পাচ্ছেন না কেউ কেউ। অনেকে বিদ্যুৎ-চালিত চুলা কিনে রান্নার কাজ সারছেন। দুই সপ্তাহ ধরে এমন পরিস্থিতি চলছে।

শীর্ষ এলপিজি আমদানিকারক কোম্পানি ওমেরা এলপিজির পরিচালক ও লোয়াবের সাবেক সভাপতি আজম জে চৌধরী প্রথম আলোকে বলেন, বাড়তি এলপিজি এনে কেউ মজুত করে না। এখন আমদানি আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে এক-দুই মাস সময় লাগতে পারে।

দেশের অন্যতম শীর্ষ এলপিজি আমদানিকারক মেঘনা গ্রুপের ফ্রেশ এলপি গ্যাসের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা আবু সাঈদ রাজা প্রথম আলোকে বলেন, আমদানি বাড়াতে উদ্যোগ নিয়েছে মেঘনা। এ মাসের শেষে বা আগামী মাসের শুরুতে সরবরাহ বাড়তে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংককে ঋণপ্রাপ্তির আবেদন ও এলসি খোলার প্রক্রিয়া দ্রুত নিষ্পত্তির অনুরোধ করে গতকাল চিঠি দিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। একই দিনে সবুজ জ্বালানি বিবেচনায় এলপিজি-সংশ্লিষ্ট উৎপাদন ও আমদানি পর্যায়ে আরোপিত ভ্যাট কমানোর জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এতে আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। আর উৎপাদন পর্যায়ে (সিলিন্ডারে গ্যাস ভরার প্ল্যান্ট) সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।

আমদানির সীমা বৃদ্ধির জন্য ওমেরা, মেঘনা, যমুনা, ইউনাইটেড আই গ্যাস ও ডেল্টা থেকে পাওয়া আবেদনের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তি দিয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে বিইআরসিকে অনুরোধ করা হয়েছে। এর বাইরে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে যেকোনো কৃত্রিম সংকট তৈরির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে মন্ত্রিসভা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করা হয়েছে।

জ্বালানি বিভাগ বলছে, অপারেটরদের আমদানি করা এলপিজির প্রকৃত চিত্র জানার জন্য চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরসংলগ্ন স্টোরেজ পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দিতে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের অফিস আদেশ প্রদান করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো, যাতে এলপিজির আমদানি ও ডিস্ট্রিবিউটর, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা পর্যায়ে সরবরাহ ব্যবস্থার প্রকৃত অবস্থা জানা যায়।

সরকারের এসব উদ্যোগের পরিপ্রেক্ষিতে লোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক প্রথম আলোকে বলেন, এখনই তো সরবরাহ বাড়ানো যাবে না। তবে আমদানি বাড়াতে ইতিমধ্যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিগগিরই এলপিজির সরবরাহ বাড়বে।

জ্বালানি বিভাগ বলছে, অপারেটরদের আমদানি করা এলপিজির প্রকৃত চিত্র জানার জন্য চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরসংলগ্ন স্টোরেজ পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দিতে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের অফিস আদেশ প্রদান করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো, যাতে এলপিজির আমদানি ও ডিস্ট্রিবিউটর, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা পর্যায়ে সরবরাহ ব্যবস্থার প্রকৃত অবস্থা জানা যায়।

দিনভর চরম ভোগান্তি

এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড গতকাল সকাল থেকে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয় বুধবার রাতে। ঢাকা, গাজীপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে এলপিজি সিলিন্ডারের বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ থাকে। চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরেও এলপিজির সিলিন্ডার পাওয়া যায়নি। রাজধানীর শেওড়াপাড়ার সাজিয়া আফরিন বলেন, বুধবার রাতে এলপিজি শেষ হয়েছে। গতকাল সব দোকান বন্ধ। না পেয়ে হোটেল থেকে খাবার কিনে আনতে হয়েছে।

চট্টগ্রামের আতুরার ডিপো এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম বলেন, তিন দিন ধরে বাসার আশপাশের সব দোকান ঘুরে এলপিজি পাওয়া যায়নি। বাড়তি দাম দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না। গতকাল তিন কিলোমিটার দূরের এক এলাকায় গিয়ে দেখেন সব দোকান বন্ধ।

গতকাল বিকেলে বিইআরসির সঙ্গে বৈঠকের পর ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন ব্যবসায়ীরা। বৈঠকে নেতারা তিনটি দাবি উত্থাপন করেন—সারা দেশে চলমান প্রশাসনিক অভিযান বন্ধ করা, বিতরণকারী ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন বৃদ্ধি করা এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা।

বুধবার রাতে এলপিজি শেষ হয়েছে। গতকাল সব দোকান বন্ধ। না পেয়ে হোটেল থেকে খাবার কিনে আনতে হয়েছে।
রাজধানীর শেওড়াপাড়ার সাজিয়া আফরিন

বৈঠকে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ আশ্বস্ত করেছেন যে চলমান অভিযানের বিষয়ে তাঁরা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলবেন এবং কমিশন বাড়াতে আইনগত পদক্ষেপ নেবেন। জাহাজ-সংকটের মধ্যেও পণ্য আমদানির জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন এলপিজি আমদানিকারকেরা। এর ফলে আগামী সপ্তাহের মধ্যে সরবরাহের সংকট কিছুটা স্বাভাবিক হতে পারে।

তবে এলপি গ‍্যাস ব্যবসায়ী সেলিম খান বলেন, অপারেটরদের কাছ থেকে সিলিন্ডার কিনতেই তাঁদের ১ হাজার ৩০০ টাকার বেশি দিতে হচ্ছে। তাই ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার দেড় হাজার টাকার কম দামে বিক্রি করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়।

ধর্মঘট প্রত্যাহার হওয়ায় ভোক্তা এলপিজি পাবেন কি না জানতে চাইলে গত রাতে সেলিম খান প্রথম আলোকে বলেন, সংকট কাটাতে বাজারে এলপিজির সরবরাহ বাড়াতে হবে।

তবে এলপি গ‍্যাস ব্যবসায়ী সেলিম খান বলেন, অপারেটরদের কাছ থেকে সিলিন্ডার কিনতেই তাঁদের ১ হাজার ৩০০ টাকার বেশি দিতে হচ্ছে। তাই ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার দেড় হাজার টাকার কম দামে বিক্রি করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়।

বাড়তি আমদানির অনুমতি বিষয়ে বিইআরসির চেয়ারম্যান গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ব্যবসায়ীরা তো অপ্রয়োজনে বাড়তি আমদানি করবেন না। গৃহস্থালি ছাড়া শিল্পেও এলপিজির চাহিদা বাড়ছে। তাই আমদানির ক্ষেত্রে আপাতত সীমা রাখার কোনো দরকার নেই। এ নিয়ে জ্বালানি বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। আর যাঁরা বাড়তি আমদানি করতে চাইবেন, বিইআরসি তাঁদের অনুমোদন দেবে।