অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান

প্রাণীরও পূর্ণাঙ্গ জীবনযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে: মার্থা নুসবাম

মানুষের মতো প্রাণীরও নিজস্ব জীবন, অনুভূতি, সামাজিক সম্পর্ক ও বিকাশের আকাঙ্ক্ষা আছে। শুধু প্রাণীর কষ্ট বা ব্যথা কমানো নয়, তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ জীবনযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করাও ন্যায়বিচারের বিষয়।

সে জন্য প্রতিটি প্রাণী প্রজাতির জীবনযাপন ও প্রয়োজন অনুযায়ী সক্ষমতা বিকাশের সুযোগ তৈরি করতে হবে। মার্কিন দার্শনিক মার্থা নুসবাম গতকাল এক বক্তৃতায় এ কথা বলেন।

শুক্রবার রাতে বাঙলার পাঠশালা আয়োজিত মার্থা নুসবাম পাঠচক্রের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ‘জাস্টিস ফর অ্যানিম্যালস: এক্সটেন্ডিং দ্য ক্যাপাবিলিটিজ অ্যাপ্রোচ টু নন-হিউম্যান বিইংস’ শীর্ষক মূল বক্তব্য দেন মার্থা নুসবাম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বাঙলার পাঠশালার প্রতিষ্ঠাতা আহমেদ জাভেদ। আলোচনা করেন অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক এ আই মাহবুবউদ্দিন আহমেদ।

মার্থা নুসবাম বলেন, মানুষের হাতে প্রাণীরা নানাভাবে অন্যায়ের শিকার হচ্ছে। শিল্পভিত্তিক পশুপালন, চোরাশিকার, প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস ও সমুদ্রে প্লাস্টিক দূষণ—এমন আরও উদাহরণ দেওয়া যায়। এসব সমস্যা মোকাবিলায় কাজ করার পাশাপাশি শক্তিশালী নৈতিক ও দার্শনিক ভিত্তিও প্রয়োজন।

নুসবামের মতে, অন্যায় বোঝার ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, প্রাণী সংবেদনশীল। তারা ব্যথা অনুভব করে, উপলব্ধি করে; পৃথিবীকে নিজেদের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে। দ্বিতীয়ত, তারা প্রজাতির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী জীবন যাপন করতে চায়। তৃতীয়ত, মানুষের অবহেলাজনিত আচরণে সেই জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা বাধাগ্রস্ত হলে তা অন্যায় হয়ে ওঠে।

প্রাণীর ন্যায়বিচার নিয়ে প্রচলিত দুটি দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করেন মার্থা নুসবাম। একটি হলো—মানুষের মতো দেখতে বা বুদ্ধিমান প্রাণীকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া। তাঁর মতে, এতে মানুষের মতো নয়—এমন অসংখ্য প্রাণীর দুর্ভোগ উপেক্ষিত থেকে যায়। প্রাণীর মূল্য মানুষের সঙ্গে তার সাদৃশ্যের ওপর নির্ভর করতে পারে না।

নুসবাম বলেন, অন্যদিকে উপযোগবাদে প্রাণীর ব্যথা ও কষ্টকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও প্রাণীর জীবনের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয় না। প্রাণীর প্রয়োজন শুধু ব্যথামুক্ত থাকা নয়। একই সঙ্গে তাদের চলাফেরা, খেলাধুলা, সামাজিক সম্পর্ক, নিজের মতো করে জীবনযাপনের সুযোগ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা প্রয়োজন।

এ প্রসঙ্গে নুসবাম সক্ষমতা পদ্ধতির কথা বলেন। অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের সঙ্গে যৌথভাবে বিকশিত এ পদ্ধতির নিজস্ব সংস্করণ ব্যবহার করে নুসবাম বলেন, ন্যায়ভিত্তিক সমাজে প্রত্যেক সংবেদনশীল প্রাণীর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সমৃদ্ধ জীবনযাপনের সুযোগ থাকা উচিত।

অনুষ্ঠানে অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান বলেন, প্রাণী ও মানুষের ক্ষেত্রে সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রশ্নটি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। সমাজের ক্ষমতার সম্পর্ক যেমন মানুষের মধ্যে বৈষম্য ও দুর্বলতা তৈরি করে, তেমনি মানুষ ও প্রাণীর সম্পর্কেও আধিপত্য ও দুর্বলতার কাঠামো তৈরি হয়।

রেহমান সোবহান আরও বলেন, কোনো প্রাণীকে সম্মান করা হচ্ছে কি না, তা শুধু ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করে না। প্রাণীটি কোন সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বসবাস করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রাণীর প্রতি অন্যায় মোকাবিলায় তাদের দুর্বলতার উৎস বদলে দিতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক এ আই মাহবুবউদ্দিন আহমেদ আলোচনায় প্রাণীর ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে ‘নৈতিক পরিধির’ কথা তুলে ধরেন। বিভিন্ন সমাজে বিভিন্ন প্রাণীকে ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করার বিষয়টি উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, আধুনিক সমাজের উপকরণগত যুক্তিবোধ মানুষ ও প্রাণী-উভয়কেই পণ্যে পরিণত করেছে।

আলোচনায় বাংলাদেশের বাস্তবতা তুলে ধরে বলা হয়। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তার কারণে মানুষের জীবনই যেখানে নানা সংকটে ভরা, সেখানে প্রাণীর পূর্ণাঙ্গ জীবনযাপনের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলা কতটা বাস্তবসম্মত।

জবাবে নুসবাম বলেন, মানুষের ও প্রাণীর সক্ষমতা একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন নয়; বরং এগুলো পাশাপাশি এগোতে পারে। কোনো দেশ দরিদ্র হলে একসঙ্গে সবকিছু করা সম্ভব না–ও হতে পারে। তবে ছোট ছোট পরিবর্তন দিয়েও অগ্রগতি শুরু করা যায়। যেমন, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক কমানো, প্রাণীকে ছোট খাঁচায় আটকে না রাখা ও মাংসকে প্রতিদিনের সস্তা খাদ্যের পরিবর্তে বিলাসপণ্য হিসেবে বিবেচনা করা—এসব পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ।

অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের গবেষক ও শিক্ষার্থীরা প্রাণীর সক্ষমতা, মানব-প্রাণী সম্পর্ক, রাজনৈতিক ক্ষমতা, ফুকোর ‘বায়োপাওয়ার’, শক্তিশালী শিল্পগোষ্ঠীর প্রভাব ও প্রজাতিভিত্তিক সক্ষমতার তালিকা তৈরির বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন করেন।

মার্থা নুসবাম বলেন, প্রাণীর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রীয় আইন গুরুত্বপূর্ণ হলেও পরিবর্তনের জন্য সামাজিক প্রতিরোধ ও তরুণদের সক্রিয়তা প্রয়োজন। তাঁর মতে, তরুণেরা প্রাণীর জীবন সম্পর্কে জানতে ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করলে পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি হতে পারে।

অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্যে আয়োজকেরা বলেন, বক্তৃতার আয়োজনের মধ্যে পাঠচক্রটির কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখতে চান না তাঁরা। ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা, সক্ষমতা ও ভঙ্গুরতার প্রশ্নে ধারাবাহিক পাঠ, আলোচনা ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর গড়ে তুলতে চান তাঁরা।