আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল

জবানবন্দিতে সাক্ষী

‘আমার বাচ্চার বয়স দুই মাস,ওকে এতিম করবেন না’

আজ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ জবানবন্দি দেন শফিকুল ইসলাম। তাঁকে ২০২২ সালের জানুয়ারিতে মাইক্রোবাসে করে তুলে নেওয়া হয়েছিল।

রাজধানীর জাপান গার্ডেন সিটি এলাকা থেকে ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে একটি মাইক্রোবাসে করে তাঁকে তুলে নেওয়া হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন মো. শফিকুল ইসলাম নামের একজন মুফতি। জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ‘প্রহারের একপর্যায়ে আমি একজন অফিসারের দুই পা জড়িয়ে ধরে বলি, আমার বাচ্চার বয়স মাত্র দুই মাস, ওকে এতিম করবেন না, আমাকে যত পারেন প্রহার করেন, তবে আমাকে একবারে মেরে ফেলবেন না।’

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে র‌্যাবের টিএফআই সেলে গুম করে রাখার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলার চতুর্থ সাক্ষী হিসেবে আজ সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১–এ জবানবন্দি দেন শফিকুল ইসলাম।

জবানবন্দিতে শফিকুল ইসলাম বলেন, তিনি কওমি মাদ্রাসা থেকে দাওরা হাদিস পাস করেছেন। তিনি একজন মুফতি। কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ থেকে তিনি স্নাতকোত্তর করেছেন। বর্তমানে পূর্বাচলে অবস্থিত মারকাজুস সুনান মাদরাসা ও এতিমখানার প্রিন্সিপাল ও মাদ্রাসা মসজিদের ইমাম ও খতিবের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ঢাকা মহানগর (পল্টন) অঞ্চলের সহ–সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

২০২২ সালের ১৩ জানুয়ারি জাপান গার্ডেন সিটি এলাকা থেকে একটি মাইক্রোবাসে করে তুলে নেওয়া হয় উল্লেখ করে জবানবন্দিতে শফিকুল ইসলাম বলেন, গাড়িটি এক জায়গায় গিয়ে ধীরে চলতে থাকে এবং গাড়িটি দাঁড়িয়ে যায়। দুজন লোক তাঁকে ধরে গাড়ি থেকে নামান। একপর্যায়ে তাঁকে ছোট একটি কক্ষে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। এর দুই–তিন দিন পর তাঁকে আরেকটি কক্ষে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য একটি চেয়ারে বসান। তাঁকে অনেক বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তিনি কোনো জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত কি না, সে বিষয়ে স্বীকারোক্তি দিতে বলা হয়। তখন তিনি বলেন, ‘আমি এসব বিষয়ে কিছু জানি না। একপর্যায়ে লাঠি দিয়ে আমার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হয়। একপর্যায়ে আমাকে হুমকি দিয়ে বলে যে, “এই চেয়ারে বসিয়ে শায়খ আবদুর রহমানকে, জসিম উদ্দিন রহমানীকে বসিয়ে সার্ফ এক্সেল দিয়ে ধুয়ে তাদের পেট থেকে সবকিছু বের করা হয়েছে, তোকেও তা–ই করা হবে।”’ তাঁকে আরও বলা হয়, ‘হয় জঙ্গি হিসেবে স্বীকারোক্তি দিবি, নয় তোকে কেটে টুকরা টুকরা করে সমুদ্রের পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হবে অথবা এখানে রেখে পাগল বানিয়ে ঢাকা শহরে ছেড়ে দেওয়া হবে, ঢাকা শহরের অধিকাংশ পাগল আমাদের তৈরি।’

এমন পরিবেশ তৈরি করা হয় যেন তাঁকে তখনই মেরে ফেলা হবে উল্লেখ করে শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘একপর্যায়ে আমি হাউমাউ করে কাঁদতে থাকি। প্রহারের একপর্যায়ে আমি একজন অফিসারের দুই পা জড়িয়ে ধরে বলি, “আমার বাচ্চার বয়স মাত্র দুই মাস, ওকে এতিম করবেন না, আমাকে যতো পারেন প্রহার করেন, তবে আমাকে একবারে মেরে ফেলবেন না।’”

এ সময় সাক্ষী কান্নায় ভেঙে পড়েন। শফিকুল ইসলাম আরও বলেন, এরপর তাঁকে পা থেকে উঠিয়ে চেয়ারে বসিয়ে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাঁরা বলতে থাকেন ‘সে (শফিকুল) খুবই রহস্যজনক, সহজে তার থেকে স্বীকারোক্তি আসবে না।’ জিজ্ঞাসাবাদকারীরা তাঁর ঘুম কমিয়ে দিতে বলেন।

শফিকুল ইসলামের জবানবন্দি গতকাল শেষ হয়নি। আজ মঙ্গলবার আবার তাঁর জবানবন্দি গ্রহণ করা হবে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে র‌্যাবের টিএফআই সেলে গুম করে রাখার ঘটনায় ১৭ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাটি হয়। তাঁদের মধ্যে ১০ আসামি ঢাকা সেনানিবাসের সাবজেলে আছেন। তাঁরা হলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম, তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, মো. কামরুল হাসান, মো. মাহাবুব আলম এবং কে এম আজাদ, কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন ও আনোয়ার লতিফ খান (অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে), লে. কর্নেল মো. মশিউর রহমান, সাইফুল ইসলাম ও মো. সারওয়ার বিন কাশেম। গতকাল তাঁদের ট্রাইব্যুনালে আনা হয়।

এই মামলার অপর সাত আসামি পলাতক। তাঁরা হলেন জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর সাবেক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, র‌্যাবের সাবেক মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ (পরে আইজিপি হন), এম খুরশীদ হোসেন ও মো. হারুন অর রশিদ এবং লে. কর্নেল (অব.) মুহাম্মাদ খায়রুল ইসলাম।