লন্ডনের ইজলিংটনের এই বাড়িটি একসময় বাংলাদেশ হাউস ছিল। বাড়িটি পরে বিক্রি করে দেওয়া হয়
লন্ডনের ইজলিংটনের এই বাড়িটি একসময় বাংলাদেশ হাউস ছিল। বাড়িটি পরে বিক্রি করে দেওয়া হয়

লন্ডনে স্মৃতির ‘বাংলাদেশ হাউস’ রাখা যায়নি, কালচারাল সেন্টারও আর হয়নি

লন্ডনে ঐতিহাসিক বাংলাদেশ হাউস সরকার বিক্রি করে দিয়েছিল আগেই, কথা ছিল আরেকটি বাড়ি কিনে গড়ে তোলা হবে ‘বাংলাদেশ কালচারাল সেন্টার’। একটি বাড়ি কেনাও হয়েছিল, কিন্তু তা–ও পরে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এরপর দুই দশক গড়ালেও আর কোনো উদ্যোগ নেই। বাড়ি বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ অলস পড়ে আছে ব্যাংকে। এই অর্থের পরিমাণ কত, তা–ও স্পষ্ট করছে না বাংলাদেশ হাইকমিশন।

যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বাংলাদেশিদের অর্থে কেনা হয়েছিল এই বাড়ি, পাকিস্তান আমলে। স্বাধীনতার পর তা উপহার দেওয়া হয় বাংলাদেশ সরকারকে। সেই স্মৃতিচিহ্ন ধরে রাখতে না পারার জন্য হতাশা আছে প্রবাসীদের। সেইসঙ্গে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও কোনো উদ্যোগ না থাকায় ক্ষোভ রয়েছে তাঁদের মনে। তাঁদের অনুযোগ, প্রবাসীদের অর্থে কেনা এ বাড়ি বিক্রিসহ কোনো ক্ষেত্রেই প্রবাসীদের মতামত নেয়নি হাইকমিশন।

‘ইস্ট পাকিস্তান হাউস’ থেকে ‘বাংলাদেশ হাউস’

উত্তর লন্ডনের ইজলিংটনের হাইবেরি হিলের ৯১ নম্বর বাড়িটির সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ পাকিস্তান আমলে।

প্রবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৬৪ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানি শিক্ষার্থী ও প্রবাসীদের অনুদানে যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষা নিতে আসা শিক্ষার্থীদের আবাসনের জন্য কেনা হয় বাড়িটি। নাম দেওয়া হয় ‘ইস্ট পাকিস্তান হাউস’। ভবনটি কেনার জন্য ব্যাংকের ঋণ ১৯৭১ সালের মধ্যেই পরিশোধ করা হয়েছিল।

ফারুক আহমদের লেখা ‘বিলাতে বাংলার রাজনীতি’ বইয়ে এই বাড়ির কথা উঠে আসে। তিনি ১৯৭৮ সাল থেকে লন্ডনে বসবাস করছেন।

ফারুক আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশ হাউসের ইতিহাস লেখার জন্য তিনি যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি কমিউনিটির তখনকার নেতাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় এই বাড়িটি হয়ে ওঠে রাজনৈতিক সংগঠন ও সংহতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনের এক জীবন্ত সাক্ষী হয়ে ওঠা ভবনটির কথা এখনো স্মরণ করেন প্রবীণ অনেকে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাড়িটির নাম বদলে রাখা হয় ‘বাংলাদেশ হাউস’, ভিনদেশে নতুন রাষ্ট্রের জন্মের প্রতীক হয়ে ওঠে বাড়িটি।

উত্তর লন্ডনের ইজলিংটনের হাইবেরি হিলের ৯১ নম্বর বাড়িটির ছবি, এটি তখন বাংলাদেশ হাউস ছিল

নতুন সরকারকে উপহার

১৯৭২ সালে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বাংলাদেশিদের পক্ষ থেকে ভবনটি বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে উপহার দেওয়া হয়।

‘বিলাতে বাংলার রাজনীতি’ বইয়ে ফারুক আহমদ লিখেছেন, ১৯৭২ সালের ১৯ আগস্ট বাঙালি কমিউনিটির পক্ষ থেকে হাউসটি লন্ডনে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রদূত সৈয়দ মুহাম্মদ সুলতানের কাছে হস্তান্তর করেন ‘বাংলাদেশ হাউস’ এর অন্যতম ট্রাস্টি হরমুজ আলী।

তবে শর্ত ছিল, ভবনটি বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য উন্মুক্ত থাকবে এবং প্রবাসীদের যৌথ ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে টিকিয়ে রাখা হবে।

সরকার বাড়িটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেয় লন্ডনের বাংলাদেশ হাইকমিশনকে। কিন্তু যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভবনটি ধীরে ধীরে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।

ফারুক আহমদ তাঁর বইয়ে লিখেছেন, কাউন্সিলের পক্ষ থেকে বহুবার সংস্কারের তাগাদা দিলেও তা করা হয়নি। ১৯৯২ সালে ইজলিংটন কাউন্সিল ভবনটিকে ব্যবহার ও বসবাসের সম্পূর্ণ অনুপযোগী বলে ঘোষণা করে।

অভিযোগ রয়েছে, হাইকমিশন ভবনটি সংস্কার না করে এবং সংস্কারের বিষয়ে প্রবাসীদের না জানিয়ে ১৯৯৯ সালের ২২ সেপ্টেম্বর বাড়িটি ৪ লাখ ৮৫ হাজার পাউন্ডে বিক্রি করে দেয়। বাংলাদেশি মুদ্রায় বর্তমান বিনিময় হারে তা ৭ কোটি ৯২ লাখ টাকার সমান।

এই বিক্রিতে হাতছাড়া হয় বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম স্মারক ভবনটি। প্রবাসীদের অনুযোগ, অর্থমূল্যের চেয়ে ভবনটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং প্রবাসীদের স্মৃতির মূল্য ছিল অনেক বেশি।

ভবনটি বিক্রি করার সময় লন্ডনে বাংলাদেশের হাইকমিশনার ছিলেন এ এইচ মাহমুদ আলী, যিনি পরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছিলেন।

কোবার্ন রোডে আরেকটি অপূর্ণ অধ্যায়

বাংলাদেশ হাউস বিক্রির সময়ই কথা ছিল, আরেকটি ভবন কিনে ব্রিটিশ বাংলাদেশের একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। সে অনুযায়ী ২০০০ সালে পূর্ব লন্ডনের মাইলএন্ডে ৪৪ কোবার্ন রোডে আরেকটি ভবন কেনা হয়। কিন্তু তিন বছর পর এই বাড়িটিও বিক্রি করে দেওয়া হয়।

ফারুক আহমদ তাঁর বইয়ে লিখেছেন, কোবার্ন রোডের বাড়িটি ৩ লাখ ৪০ হাজার ব্রিটিশ পাউন্ড দিয়ে কেনা হয়েছিল। ২০০৪ সালের ২৩ জুলাই ৪ লাখ ২০ হাজার পাউন্ডে বাড়িটি বিক্রি করে দেওয়া হয়।

বাড়ি বিক্রি এবং সেই অর্থ ব্যাংকে জমা রাখা নিয়ে কোনো ধরনের আলোচনা না করায় তখন ক্ষোভ উঠেছিল। তৎকালীন হাইকমিশন জানায়, অর্থ লন্ডনের সোনালী ব্যাংকে রাখা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে নতুন সম্পত্তি কিনে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হবে।

কোবার্ন রোডের বাড়িটি বিক্রির সময় যুক্তরাজ্যে হাইকমিশনারের দায়িত্বে ছিলেন এ এইচ মোফাজ্জল করিম।

পূর্ব লন্ডনের মাইলএন্ডে ৪৪ কোবর্ন রোডের এই বাড়ি কেনা হয়েছিল। কিন্তু ২০০৪ সালে এটিও বিক্রি করে দেওয়া হয়

হারানো ‘বাংলাদেশ হাউস’ এর দাম কত হতো

স্থানীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিশ্লেষকদের মতে, হাইবেরি হিলের ৯১ নম্বর বাড়িটি সংরক্ষিত থাকলে আজ তার বাজারমূল্য দাঁড়াত প্রায় ৪ মিলিয়ন তথা ৪০ লাখ পাউন্ড। বাংলাদেশি মুদ্রায় ৬৫ কোটি টাকার বেশি। একইভাবে কোবার্ন রোডের ভবনটির দামও এখন প্রায় ১০ লাখ পাউন্ড।

কমিউনিটি নেতারা মনে করেন, হাইকমিশনের ব্যাংক হিসাবে জমা করা ৪ লাখ ২০ হাজার পাউন্ড যদি গত ২০ বছরে গড়ে ৩–৫ শতাংশ সুদে বিনিয়োগ করা হতো, তবে তহবিলের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ত। অথচ এই অর্থের সুদ, বিনিয়োগ আয় কিংবা বার্ষিক হিসাব নিয়ে হাইকমিশনের পক্ষ থেকে কোনো প্রকাশ্য আর্থিক বিবরণ দেওয়া হয়নি।

আশ্বাসে ২ যুগ পার

বাড়ি বিক্রির পর গত দুই দশকে অন্তত সাতজন রাষ্ট্রদূত বদলেছে। তাঁরা সবাই আশ্বাস দিয়ে গেলেও বাংলাদেশ কালচারাল সেন্টার এখনো হয়নি।

হাইকমিশনারদের মধ্যে রয়েছেন এ এইচ মাহমুদ আলী, মোফাজ্জল করিম, এম সাঈদুর রহমান, সাফি উদ্দিন উদ্দিন, মোহাম্মদ মিজারুল কায়েস, ড. নাজমুল কাউনাইন ও সাইদা মুনা তাসনিম।

হাইবেরি হিলের ৯১ নম্বর বাড়িটি সংরক্ষিত থাকলে আজ তার বাজারমূল্য দাঁড়াত প্রায় ৪ মিলিয়ন তথা ৪০ লাখ পাউন্ড। বাংলাদেশি মুদ্রায় ৬৫ কোটি টাকার বেশি। একইভাবে কোবার্ন রোডের ভবনটির দামও এখন প্রায় ১০ লাখ পাউন্ড।

২০২০ সালের ১৩ জানুয়ারি লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি নবাব উদ্দিন ‘বাংলাদেশ হাউস’ বিক্রির অর্থ ও প্রস্তাবিত সাংস্কৃতিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার হালনাগাদ তথ্য জানতে চেয়ে হাইকমিশনে ই–মেইল করেছিলেন।

তৎকালীন হাইকমিশনার সাইদা মুনা তাসনিম লিখিত উত্তরে জানান, অর্থ ব্যাংক হিসাবে অক্ষত রয়েছে এবং যুক্তরাজ্যে একটি ‘বাংলাদেশ কালচারাল সেন্টার’ প্রতিষ্ঠার বিষয়টি হাইকমিশনের বিবেচনায় আছে।

এরপরও নতুন সম্পত্তি কেনা বা সাংস্কৃতিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। সাইদা মুনা তাসনিমও ২০২৪ সালে লন্ডন হাইকমিশন থেকে বিদায় নেন।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের কষ্টার্জিত অর্থে কেনা একটি ভবন, যা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও কমিউনিটির ঐক্যের প্রতীক ছিল, সেটির বিক্রয়লব্ধ অর্থ এত দিনেও কার্যকর উদ্যোগে ব্যবহার না হওয়া দায়িত্বশীলতার ঘাটতিরই প্রমাণ।
নবাব উদ্দিন, সাবেক সভাপতি, লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবে

কমিউনিটির ক্ষোভ

লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি নবাব উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, লন্ডনের ঐতিহাসিক বাংলাদেশ হাউস বিক্রির চার লাখ ২০ হাজার পাউন্ড দুই দশক ধরে অলস পড়ে থাকার ঘটনা অত্যন্ত হতাশাজনক।

তাঁর মতে, প্রবাসী বাংলাদেশিদের কষ্টার্জিত অর্থে কেনা একটি ভবন, যা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও কমিউনিটির ঐক্যের প্রতীক ছিল, সেটির বিক্রয়লব্ধ অর্থ এত দিনেও কার্যকর উদ্যোগে ব্যবহার না হওয়া দায়িত্বশীলতার ঘাটতিরই প্রমাণ।

‘শুধু অর্থ ব্যাংকে আছে বললেই দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রয়োজন স্বচ্ছ হিসাব, সুস্পষ্ট পরিকল্পনা এবং সময়সীমাবদ্ধ বাস্তবায়ন,’ বলেন নবাব উদ্দিন।

লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশন ভবন

হাইকমিশনের বক্তব্য

বাংলাদেশ হাউস বিক্রির মোট কত অর্থ বর্তমানে হাইকমিশনের ব্যাংক হিসাবে আছে এবং গত ২২ বছরে সেই অর্থের পরিমাণ বেড়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রথম আলো জানতে চেয়েছিল হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার আকবর হোসেনের কাছে।

তিনি গত ৩ মার্চ ই–মেইলে পাঠানো উত্তরে বলেন, ‘ভবন বিক্রির অর্থ হাইকমিশনের অ্যাকাউন্টে গচ্ছিত আছে। এ বিষয়টি সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর অবগত রয়েছে। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

তবে ঠিক কত টাকা বর্তমানে ব্যাংকে আছে, সেই অঙ্ক জানাননি তিনি।