
তরুণ ও নবীন পেশাজীবীদের ক্যারিয়ার গঠনে বইয়ের শিক্ষার চেয়ে বেশি প্রয়োজন বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া সঠিক দিকনির্দেশনা। সেই প্রয়োজনীয়তা থেকেই লিগ্যাসি তৈরির পথে থাকা সফল তরুণদের স্বপ্ন, শেখার অভিজ্ঞতা আর ভুল থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প নিয়ে প্রথম আলো ডটকম ও প্রাইম ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে বিশেষ পডকাস্ট শো ‘লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন-২’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ রিদওয়ানুল হকের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানটির তৃতীয় পর্বে অতিথি হিসেবে অংশ নেন গ্রামীণফোনের চিফ মার্কেটিং অফিসার ফারহা নাজ জামান। আলোচনার বিষয় ছিল ‘ব্র্যান্ড থেকে বিলিয়ন সংযোগে: মার্কেটিং ও ডিজিটাল বাংলাদেশে নারী নেতৃত্ব’।
‘একজন সফল মার্কেটিয়ার হয়ে উঠতে হলে ভালো যোগাযোগদক্ষতা থাকতে হবে। খুব স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারতে হবে। মানুষ ও সংস্কৃতি বুঝতে হবে। বুঝতে হবে ব্র্যান্ড একটি জীবন্ত সত্তা, তাই এর মেসেজিংয়ে ধারাবাহিকতা হতে হবে। আর নতুন আইডিয়া ভাবা ও এক্সপেরিমেন্ট করার মানসিকতা রাখতে হবে।’ পডকাস্ট শোতে অংশ নিয়ে কথাগুলো বলেন ফারহা নাজ জামান। পডকাস্ট শোর ধারণ করা পর্বটি প্রচারিত হয় গত শনিবার প্রথম আলোর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোয়।
ফারহা নাজ জামান পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটে। পডকাস্টের শুরুতেই সঞ্চালক জানতে চান, এই একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড কীভাবে তাঁর ক্যারিয়ারে আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে?
উত্তরে ফারহা নাজ জামান বলেন, ‘পড়াশোনা সব জায়গাতেই হয়। তবে আইবিএ লাইফস্টাইলে অনেক পরিবর্তন আনে, যা পরবর্তী সময়ে আমার ক্যারিয়ারে অনেক সাহায্য করেছে। আইবিএতে চাপ একটু বেশি থাকে। যেমন একাধিক পরীক্ষার, রিপোর্ট জমা দেওয়ার কঠোর ডেডলাইন, পিপল ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদি। আমাদের পেশাগত জীবনটিও কিন্তু ঠিক এমন। ব্যক্তিগত জীবনে যা-ই হয়ে যাক না কেন, কাজ করে যেতেই হবে। এটিই আমার ক্যারিয়ার গঠনে বইয়ের চেয়ে বেশি সাহায্য করেছে।’
ফারহা নাজ জামান তাঁর ক্যারিয়ারে এফএমসিজি ও সার্ভিস ইন্ডাস্ট্রি বা টেলিকম—দুই খাতেই কাজ করেছেন। অভিজ্ঞতা ঠিক কেমন?
ফারহা নাজ জামান বলেন, এফএমসিজিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা সহজ এবং এখানে অনেক কিছুই আগে থেকেই অনুমান করা যায়। কিন্তু টেলিকম বা সার্ভিস ইন্ডাস্ট্রিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা যায় না। এখানে চাহিদা এফএমসিজির চেয়ে দ্রুত পরিবর্তন হয়, তাই সে অনুযায়ী কাজ করতে হয়।
প্রসঙ্গক্রমে সঞ্চালক জানতে চান, ‘এফএমসিজিতে আমরা প্রোডাক্ট দেখতে পাই। কিন্তু সার্ভিস দেখা যায় না। একজন মার্কেটিয়ার হিসেবে সার্ভিসকে কীভাবে গ্রাহকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলেন?’
জবাবে ফারহা নাজ জামান বলেন, সার্ভিস অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভরশীল। বস্তুগত পণ্যের ক্ষেত্রে যেমন প্যাকেটের রং বদলে দিয়েও গ্রাহককে প্রভাবিত করা যায়, টেলিকমে তা হয় না। এখানে গ্রাহক যখন ফোনে কথা বলছেন, তখন যদি তাঁর অভিজ্ঞতা ভালো হয়, তবেই তাঁর বিশ্বাস অর্জন করা যায়।
এ প্রসঙ্গে ফারহা নাজ জামান আরও বলেন, ‘টেলিকম ইন্ডাস্ট্রিতে বিশ্বাস অর্জনের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আবেগ। ধরুন, কেউ দেশের বাইরে আছেন, আবার কেউ এমন কোনো স্থানে রয়েছেন যেখানে যোগাযোগ খুব কঠিন। তাঁদের জন্য আমাদের বিশেষ অফার থাকে, তাঁদের জন্য আমরা ক্যাম্পেইন করি। এখানে আবেগ জড়িয়ে থাকে। আর আমরা বিজ্ঞাপনের চেয়ে বেশি বাস্তব গল্প তুলে ধরার চেষ্টা করি। এগুলোই গ্রাহকের আস্থা বাড়াতে কাজ করে।’
এরপর সঞ্চালক জানতে চান, একজন বিজনেস গ্রাজুয়েটের কোথায় ক্যারিয়ার শুরু করা উচিত? এজেন্সি নাকি সরাসরি ব্র্যান্ডে?
ফারহা নাজ জামান বলেন, ‘প্রথমে ভাবতে হবে, আপনি কোথায় থাকতে চান। যদি সৃজনশীল কাজে থাকতে চান, তাহলে শুরুতে এজেন্সিতে কাজ করা ভালো। কারণ, এতে সৃজনশীল বিষয়গুলো শেখা যায়।’ তাঁর মতে, যাঁরা মার্কেটিয়ার হতে চান, তাঁদের শুরুতে কাস্টমার ফেসিং বা সরাসরি গ্রাহকের সঙ্গে কাজ করা এমন কোনো জায়গা বেছে নেওয়া উচিত। এতে দেশের মানুষ ও সংস্কৃতি বোঝা যায় এবং তাঁদের সঙ্গে সংযোগ গড়ে ওঠে, যা মার্কেটিয়ারের জন্য খুব জরুরি।
সঞ্চালক জানতে চাইলে ফারহা নাজ জামান বলেন, ‘আমরা যখন ১০ বছর আগে মাইজিপি অ্যাপ চালু করি, তখন মানুষের চাহিদাগুলো খুবই সাধারণ ছিল। তখন মানুষ শুধু ব্যালান্স দেখার জন্য অ্যাপ ব্যবহার করত। তবে এখন এটা একটা লাইফস্টাইল প্ল্যাটফর্ম। আমরা চাই, আমাদের গ্রাহকেরা যেন এখান থেকেই তাঁদের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সব কাজ করতে পারেন।’ তিনি বলেন, এখন মাইজিপিতে যাঁরা বিনোদন চান, তাঁদের জন্য বিনোদনের ব্যবস্থা রয়েছে, গেমের ব্যবস্থা রয়েছে। গ্রাহকদের সঙ্গে শুধু লেনদেন নয়, বরং একটি সম্পর্ক তৈরি করাই আমাদের লক্ষ্য।’
টেলিকম সেক্টরে মানুষের ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ফারহা নাজ জামান বলেন, ক্ষমতায়নের সংজ্ঞা আসলে এখন ভিন্ন। এখন মানুষ চাইলে নিজের ক্ষমতায়ন নিজেই করতে পারে। বর্তমানে মুঠোফোন ও ইন্টারনেট দিয়েই তা সম্ভব।
ফারহা নাজ জামান আরও বলেন, ‘আমরা বাইরে থেকে কারও ক্ষমতায়ন করতে চাই না। বরং এমন একটি পরিবেশ বা সমাধান দিতে চাই, যাতে মানুষ নিজেই নিজেদের ক্ষমতায়িত করতে পারে। কারণ, টেলিকম সেবা যখন একজন মানুষের হাতে পৌঁছায়, তখন তিনি নিজেই নিজের সমাধান খুঁজে নিতে পারেন।’
এরপর সঞ্চালক জানতে চান, ‘বর্তমান প্রজন্মের চাহিদা নিয়ে কি আপনাদের বিশেষ কোনো পরিকল্পনা আছে?’
ফারহা নাজ জামান বলেন, ‘এখন জেন-জি ও আলফা প্রজন্ম অনেক বেশি সচেতন। তাদের চাহিদা ভিন্ন। তারা সততা পছন্দ করে। এই প্রজন্ম কোনো কাজকে ছোট ভাবে না। যেমন এখনকার তরুণেরা পড়াশোনা শেষ করার আগেই ফ্রিল্যান্সিং বা ইনফ্লুয়েন্সার হয়ে আয় করতে চান। তাই আমরা তাঁদের জন্য ফ্রিল্যান্সিং ফ্যাক্টরির মতো বেশ কিছু সুবিধা নিয়ে কাজ করছি।’
নারী হিসেবে করপোরেট জগতে টিকে থাকার চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে ফারহা নাজ জামান বলেন, ‘দুর্ভাগ্যবশত আমাদের সমাজে একজন নারীকে পুরুষের সমান প্রমাণ করতে অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয়। অনেক সময় পুরুষের ভিড়ে নারীরা কিছুটা অস্বস্তিতেও পড়েন। আমার পরামর্শ হলো, চ্যালেঞ্জ থাকবেই, কিন্তু আপনি যদি ওটা নিয়ে সারাক্ষণ ভাবেন, তাহলে পিছিয়ে পড়বেন। ফেস ইট অ্যান্ড ফিক্স ইট।’
এরপর সঞ্চালক জানতে চান, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আপনার অবস্থান কী?’
উত্তরে ফারহা নাজ জামান বলেন, ‘আমি নিজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করি আইডিয়া জেনারেট করার জন্য। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা সব সময় মানুষেরই হওয়া উচিত। মানুষের আবেগ ও কৌশলগত পরিপক্বতা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।’
আলোচনার শেষ পর্যায়ে অতিথির কাছে ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালান্স নিয়ে জানতে চান সঞ্চালক।
ফারহা নাজ জামান বলেন, এখন আসলে ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালান্স বলে কিছু নেই, বরং এটি এখন কাজের সঙ্গে জীবনের সমন্বয়। কোনো দিন কাজ আগে থাকবে, কোনো দিন পরিবার। কিন্তু মানসিক ও শারীরিক সুস্থতাকে প্রাধান্য দিয়ে নিজের মতো সমন্বয় করে নিতে হবে।