
ঝালকাঠি শহরের ঐতিহ্যবাহী বারোচালা ভাঙার কাজ স্থগিত করেছে জেলা প্রশাসন। স্থাপনাটি ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনার মধ্যে আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এর আগে আজ সকালে শ্রমিকেরা স্থাপনাটির বিভিন্ন অংশ ভাঙতে শুরু করলে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতিবাদের মুখে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঝালকাঠি শহরের প্রতিষ্ঠাতা মহারাজ জয় নারায়ণ ঘোষালের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক বারোচালাটি দীর্ঘদিন ধরে শহরের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হিসেবে পরিচিত। এটি নাটমন্দির বা হিন্দু মন্দির স্থাপত্যের একটি বিশেষ অংশ। ভূকৈলাশ কালীবাড়ি মন্দিরের সামনে অবস্থিত এই উন্মুক্ত হলঘর একসময় নৃত্য, সংগীত, নাটকসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের কেন্দ্র ছিল। জমিদার জয় নারায়ণ ঘোষালের উপস্থিতিতে এখানে নানা আয়োজন অনুষ্ঠিত হতো।
ঐতিহাসিক এই বারোচালায় একসময় সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও পরিচালিত হতো। বিভিন্ন সময়ে এখানে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসসহ বহু রাজনৈতিক নেতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তি বক্তব্য দিয়েছেন। যাত্রাপালাসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেরও এটি ছিল অন্যতম কেন্দ্র।
সম্প্রতি পুরোনো স্থাপনাটি অপসারণ করে সেখানে বহুতল মার্কেট নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় কালীবাড়ি মন্দির কর্তৃপক্ষ। এর অংশ হিসেবে আজ সকালে ভাঙার কাজ শুরু হয়। খবর ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থাপনাটি সংরক্ষণের দাবি জানান।
পরিস্থিতি বিবেচনায় দুপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. কাওছার হোসেন, সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মেহেদী হাসান, ঝালকাঠি প্রেসক্লাবের সভাপতি মো. আককাস সিকদার, জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অলোক সাহা, কালীবাড়ি মন্দির কমিটির নেতাসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় সর্বসম্মতিক্রমে আপাতত বারোচালার সব ধরনের ভাঙার কাজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়। একই সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের লক্ষ্যে শিগগির ২৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কমিটিতে প্রশাসনের প্রতিনিধি, মন্দির কর্তৃপক্ষ, ইতিহাস-ঐতিহ্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, সুধীজন ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
কালীবাড়ি মন্দির পরিচালনা কমিটির উপদেষ্টা শুভ্রত দেবনাথ বলেন, বর্তমান স্থাপনাটি অনেক পুরোনো। মন্দিরের উন্নয়ন এবং পূজার সময় জায়গার সংকট নিরসনে সেখানে মার্কেট নির্মাণ ও পরিসর বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ঝালকাঠি প্রেসক্লাবের সভাপতি আককাস সিকদার বলেন, ‘এটি শুধু একটি স্থাপনা নয়, ঝালকাঠির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শত বছরের স্মৃতি বহনকারী এ ধরনের স্থাপনা ধ্বংস হয়ে গেলে তা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। আমরা চাই কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে বারোচালাটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিক।’
সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মেহেদী হাসান বলেন, পরবর্তী সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত বারোচালা ভাঙার কাজ স্থগিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।