মারাত্মক অসুস্থ, জীবন বিপন্ন—এমন রোগীর চিকিৎসায় আইসিইউ দরকার হয়। সরকারি প্রতিষ্ঠানে এ বিশেষায়িত সেবার খরচ তুলনামূলক কম।

মাথায় আঘাত পাওয়া মো. শাহীনকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রেখে চিকিৎসার প্রয়োজন ছিল। আঘাত এত গুরুতর ছিল যে হাসপাতালের সাধারণ শয্যায় রেখে তাঁর চিকিৎসা সম্ভব ছিল না। নিজের শহর ফেনীর সরকারি হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা হয়নি। পাশের জেলা চট্টগ্রামে সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা খালি ছিল না। তাঁকে ঢাকায় আনা হয়। চিকিৎসা না পেয়ে ফেনীতে ফেরত নেওয়ার পর গত বুধবার তিনি মারা যান।
শাহীনের জন্য আইসিইউ শয্যাসংকট বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথম আলোর প্রতিনিধিরা সংশ্লিষ্ট জেলার সিভিল সার্জনদের কাছ থেকে জেনেছেন, দেশের কমপক্ষে ২২ জেলায় সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ সেবা নেই।
মারাত্মক অসুস্থ বা জীবন বিপন্ন—এমন রোগীর চিকিৎসায় আইসিইউ শয্যার দরকার হয়। আইসিইউতে রোগীকে ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। রোগীর বিশেষ সহায়তার দরকার হয়। চিকিৎসায় বিশেষ যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম ব্যবহৃত হয়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পাশাপাশি আইসিইউর নার্সদের থাকে বিশেষ প্রশিক্ষণ। দেশে সরকারি প্রতিষ্ঠানে এই বিশেষায়িত সেবার খরচ তুলনামূলক কম। তাই মানুষের আগ্রহ থাকে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার।
বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর মতো আর্থিক অবস্থা শাহীনের ছিল না। শাহীন বিদ্যুতের মিস্ত্রি ছিলেন। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত শাহীনকে গত মঙ্গলবার চট্টগ্রাম থেকে আনা হয় রাজধানীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালে। মাথার আঘাতের চিকিৎসায় এই প্রতিষ্ঠানের সুনাম আছে। তবে সেদিন ওই প্রতিষ্ঠান থেকে বলা হয়েছিল, কোনো আইসিইউ শয্যা খালি নেই। আত্মীয়রা নিয়ে গেলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ফলাফল একই, আইসিইউ শয্যা খালি নেই। আত্মীয়দের সামর্থ্য ছিল না ব্যয়বহুল বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর। উপায়হীন আত্মীয়রা শাহীনকে ফেরত নিলেন ফেনীতে।
শাহীনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার রুগ্ণ চেহারা আবারও সামনে চলে এল। দেশে দুর্ঘটনা বাড়ছে, জটিল রোগে ভোগা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, আইসিইউ সেবার প্রয়োজনও বাড়ছে। কিন্তু মানুষ প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছে না। এই সেবা নিয়ে আছে নানা অভিযোগ।
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব ইহতেশামুল হক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘তিন বছর আগে শুরু হওয়া করোনা মহামারির মধ্যেই সরকারপ্রধানের নির্দেশনা ছিল প্রতিটি জেলায় আইসিইউ সেবা চালু করার। মন্ত্রণালয়ের উদাসীনতা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্লিপ্ততার কারণে জেলায় জেলায় এই সেবা চালু হয়নি। এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ নেই এমন জেলার মধ্যে রয়েছে রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, বরগুনা, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পঞ্চগড়, নাটোর, মাগুরা, ঝিনাইদহ, ভোলা, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, কুড়িগ্রাম, জামালপুর, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, শরীয়তপুর, নেত্রকোনা, চুয়াডাঙ্গা ও সুনামগঞ্জ। এ ছাড়া বাগেরহাট ও মাদারীপুর জেলায় সরঞ্জাম থাকলেও আইসিইউ চালু নেই।
মানুষের আইসিইউ সেবার দরকার হলে কী করেন প্রশ্নের জবাবে লালমনিরহাট জেলার সিভিল সার্জন প্রথম আলোর প্রতিনিধিকে বলেন, ‘আমরা জরুরি রোগী রংপুরে পাঠিয়ে দিই।’
রাজধানীর একাধিক বড় সরকারি হাসপাতালেও এই শয্যা নেই। জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্র (পঙ্গু হাসপাতাল) এক হাজার শয্যার। সারা দেশের গুরুতর আহত রোগী প্রতিদিন এই হাসপাতালে ভর্তি হয়। গতকাল ওই হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাসপাতালে কোনো আইসিইউ শয্যা নেই। জাতীয় নাক-কান-গলা হাসপাতালেও এ ধরনের কোনো শয্যা নেই।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমের (এমআইএস) হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সাল পর্যন্ত দেশের সরকারি বিশেষায়িত হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা ছিল ৫৪৮টি। জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে শয্যা ছিল ৩৪৮টি। অর্থাৎ মোট শয্যা ছিল ৮৯৬টি।
গত দুই বছরে সরকারি হাসপাতালে আরও আইসিইউ শয্যা যুক্ত হয়েছে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মঈনুল আহসান প্রথম আলোকে বলেন, ১০টি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০ শয্যার করে আইসিইউ চালু করা হয়েছে। একইভাবে ১৩টি জেলা হাসপাতালে ১০ শয্যা করে আইসিইউ চালু করা হয়েছে।
সারা দেশে সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা এখন ১ হাজার ১২৬টি। সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও সরকারি ও বেসরকারি ব্যক্তিরা বলছেন, বেসরকারি পর্যায়ে এমন শয্যা আছে আরও প্রায় এক হাজার।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) শেখ দাউদ আদনান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য ছিল সব জেলায় আইসিইউ চালু করব। মহামারির সময় আমরা সব জেলায় আইসিইউ চালু করেছিলাম। প্রায় ৪০০ জনকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলাম। তখনকার আইসিইউকে এখন কাজে লাগাতে কোনো অসুবিধা নেই।’
১০ শয্যার আইসিইউ শয্যা চালু করার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কিছু নির্দেশনা দিয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, সেবা চালু থাকবে সপ্তাহে সাত দিনের ২৪ ঘণ্টা। এতে থাকবে নয়টি অত্যাবশ্যকীয় সেবা ও চারটি ঐচ্ছিক বা বাড়তি সেবা।
১০ শয্যার আইসিইউ ইউনিটের জন্য সার্বক্ষণিক চিকিৎসক থাকবেন ১৩ জন ও বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসক থাকবেন ৭ জন। সার্বক্ষণিক নার্স থাকবেন ১৬ জন। অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী থাকবেন আরও ১৬ জন। কেন্দ্র চালাতে ছোট–বড় যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম লাগবে মোট ৬৩ ধরনের। আর ওষুধ লাগবে ৪৯ ধরনের।
আইসিইউ শয্যা আছে এমন প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে রোগীর লম্বা সারি দেখা যায়, মানুষ অপেক্ষায় থাকে কখন একটি শয্যা খালি হবে। যাঁরা সরকারি হাসপাতালে চেষ্টা করেও শয্যার ব্যবস্থা করতে পারেন না, তাঁরা যান বেসরকারি হাসপাতালে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেছেন, অনেক বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিক মালিক হাসপাতালের একটি অংশকে আইসিইউ হিসেবে ব্যবহার করেন। যথাযথ অনুমতি নিয়ে আইসিইউ সেবা দেন এমন মালিক কম।
রাজধানীর মহাখালীর একটি হাসপাতালের মালিক বলেছেন, তাঁরা প্রতিদিনের আইসিইউ শয্যা ভাড়া নেন ১৫ হাজার টাকা। চিকিৎসকের ফি, ওষুধের দাম এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যয় এর বাইরে। দিনে মোট কত ব্যয় হয় এমন প্রশ্নের উত্তরে ওই মালিক বলেন, ‘৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা।’
কোনো রোগীকে যদি দুই দিন, তিন দিন বা এক সপ্তাহ আইসিইউতে থাকতে হয়, তাহলে বহু টাকা পকেট থেকে বেরিয়ে যায়। বেসরকারি হাসপাতাল যত বড়, তার আইসিইউর খরচ তত বেশি। এই ব্যয় অনেকের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। অনেকে অর্ধেক পথে চিকিৎসা বন্ধ করেন, অনেকে চিকিৎসা নেওয়া থেকে বিরত থাকেন।
গত মঙ্গলবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা খালি না পেয়ে আত্মীয়রা শাহীনকে নিয়ে রাজধানীর ধানমন্ডির একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন হাসপাতালে যান। আত্মীয়রা ভেবেছিলেন ১০-১২ হাজার টাকায় ভর্তি করানো যাবে। ভর্তি করানো যায়নি। হাসপাতাল থেকে বলা হয়েছিল, চিকিৎসক ও চিকিৎসার খরচ বাবদ ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা লাগবে।
চিকিৎসা করানোর সাহস হয়নি। ওই রাতেই শাহীনকে নিয়ে ফেনী নিয়ে চলে যান আত্মীয়রা। গত বুধবার তিনি মারা যান।