স্টেপিং-স্টোন ইন্টারন্যাশনাল স্কুল বাংলাদেশের (এসআইএসবি) বার্ষিক অনুষ্ঠান শেষে ক্যামেরায় এসআইএসবি পরিবার
স্টেপিং-স্টোন ইন্টারন্যাশনাল স্কুল বাংলাদেশের (এসআইএসবি) বার্ষিক অনুষ্ঠান শেষে ক্যামেরায় এসআইএসবি পরিবার

স্টেপিং-স্টোন ইন্টারন্যাশনাল স্কুল বাংলাদেশ: শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করছে যে স্কুল

একটি শিশুর শিক্ষাজীবন শুধু পাঠ্যবই, পরীক্ষা কিংবা ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো একজন শিক্ষার্থীকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে সে নিজের চিন্তা প্রকাশ করতে পারে, নতুন কিছু শিখতে আগ্রহী হয় এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত হয়ে ওঠে। সেই ভাবনা থেকেই ঢাকার উত্তরায় গড়ে উঠেছে ‘স্টেপিং-স্টোন ইন্টারন্যাশনাল স্কুল বাংলাদেশ (এসআইএসবি)’। আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য সাশ্রয়ী ও মানবিক একটি শিক্ষাব্যবস্থা তৈরির লক্ষ্য নিয়ে ২০২০ সালে যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি।

অভিভাবকদের স্বপ্ন থেকে গড়া এসআইএসবি

এসআইএসবির প্রতিষ্ঠার গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘কোভিড-১৯’ মহামারির সময়ের অভিভাবকদের অভিজ্ঞতা। তখন অনলাইন ক্লাসের সময় টিউশন ফি নিয়ে অনেক পরিবারকে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। ফি দিতে না পারায় পরীক্ষা দিতে না দেওয়া, অনলাইন ক্লাস থেকে বাদ দেওয়া কিংবা ভর্তি বাতিলের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছিল। এর প্রেক্ষাপটে অভিভাবকেরা অনলাইন ক্লাস চলাকালীন ৫০ শতাংশ টিউশন ফি ওয়েভারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। পরে সেই অভিজ্ঞতা থেকেই অভিভাবকেরা একটি মানবিক ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। তাঁদের সেই উদ্যোগ ও স্বপ্নের ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠে এসআইএসবি।

প্রযুক্তিনির্ভর শ্রেণিকক্ষে পাঠদান

শিক্ষার্থীদের বয়স ও শিক্ষাস্তর অনুযায়ী এখানে রয়েছে প্রি-স্কুল, প্রাইমারি ও সিনিয়র সেকশন। আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতির অংশ হিসেবে ১৬টি শ্রেণিকক্ষে রয়েছে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর ও ডিসপ্লে বোর্ড। এর মাধ্যমে পাঠদানকে আরও অংশগ্রহণমূলক (ইন্টারঅ্যাকটিভ) করে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থীরা পাঠের বিষয়গুলো শুধু পড়ে নয়, বিভিন্ন দৃশ্য ও ডিজিটাল উপকরণের মাধ্যমেও বোঝার সুযোগ পাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য সাশ্রয়ী ও মানবিক একটি শিক্ষাব্যবস্থা তৈরির লক্ষ্য নিয়ে ২০২০ সালে যাত্রা শুরু করে স্টেপিং-স্টোন ইন্টারন্যাশনাল স্কুল বাংলাদেশ

বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা ও প্রতিভা বিকাশের যত সুযোগ

শ্রেণিকক্ষের পাঠের পাশাপাশি বাস্তবভিত্তিক শেখার সুযোগও রয়েছে। এসআইএসবিতে রয়েছে মোট চারটি ল্যাব—ফিজিকস, কেমিস্ট্রি, বায়োলজি ও কম্পিউটার। এসব ল্যাবে বিভিন্ন ব্যবহারিক কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পাঠ্য বিষয়ের সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতার সংযোগ তৈরি করছে।

শুধু পড়াশোনা নয়, শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও প্রতিভা বিকাশে রয়েছে ১৪টি ক্লাব। কারাতে, রোবোটিকস, স্পোর্টস, আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটস, ল্যাঙ্গুয়েজ, ম্যাথ, সায়েন্স, মিউজিক, ডিবেট, গিটার, প্রোগ্রামিং, দাবাসহ বিভিন্ন ক্লাবে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। পড়াশোনার বাইরে এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব ও দলগত কাজের দক্ষতা চর্চার ক্ষেত্রও তৈরি হচ্ছে।

স্কুলের সঙ্গে অভিভাবকদের সম্পৃক্ততা

এসআইএসবির সঙ্গে অভিভাবকদের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠানটির শুরু থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, তাঁদের উদ্যোগের মধ্য দিয়েই এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যাত্রা। তাই শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনে পরিবার ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়। স্কুল পরিচালনায় অভিভাবকদের অংশগ্রহণ ও মতামত প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

আন্তর্জাতিক শিক্ষার সঙ্গে সংযোগ

শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক পরিসরের সঙ্গে পরিচিত করার ক্ষেত্রেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নিসাই গ্লোবাল স্কুল ইউকে, আইডব্লিউপিজি কোরিয়া, স্প্রিক্স ইনক. জাপান এবং পিওর লার্নিং ইউকের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

এসআইএসবির বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশন করছে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা

আন্তর্জাতিক কারিকুলাম ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ

এসআইএসবিতে ব্রিটিশ কাউন্সিলের পার্টনার স্কুল হিসেবে কেমব্রিজ ও অক্সফোর্ডের কিউএ কারিকুলাম অনুসরণ করে পাঠদান করা হয়। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ইউরোপীয় ও আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপসহ সরাসরি ভর্তির সুযোগ রয়েছে।

শিক্ষক নিয়োগ

এসআইএসবিতে তিন ধাপের যোগ্যতাভিত্তিক প্রক্রিয়ায় শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। শিক্ষাগত যোগ্যতা, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা ও শিক্ষাদানের সক্ষমতা বিবেচনায় দেশের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মেধাবী গ্র্যাজুয়েটদের এসআইএসবিতে নিয়োগ দেওয়া হয়।

অর্জন ও স্বীকৃতি

ছয় বছরের পথচলায় বিভিন্ন অর্জনও এসেছে এসআইএসবির। ‘বাংলাদেশ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল প্যারেন্টস ফোরাম’–এর অনলাইন জরিপে ২০২৫ সালে ঢাকার সেরা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের তালিকায় সপ্তম এবং ২০২৬ সালে ‘সেরা ভ্যালু ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল’–এর তালিকায় সপ্তম স্থান অর্জন করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

এ ছাড়া আইডব্লিউপিজি ইন্টারন্যাশনাল আর্ট কম্পিটিশনে এসআইএসবির একজন শিক্ষার্থী বিশ্বব্যাপী দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে। এই স্কুলের শিক্ষার্থী ২০২৬ সালে জাপানে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল রোবোটিকস প্রোগ্রাম কনটেস্টে অংশগ্রহণ করে এবং তার দল ১১তম স্থান অর্জন করে।

ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি

সাশ্রয়ী ব্যয়ে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা, কার্যক্রমভিত্তিক শিক্ষাপদ্ধতি, দক্ষ শিক্ষক, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বিভিন্ন ধরনের বৃত্তির সুযোগ—সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বিস্তৃত শিক্ষার পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে এসআইএসবি।

স্টেপিং-স্টোন ইন্টারন্যাশনাল স্কুল বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান এ কে এম আশরাফুল হক বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের শুধু একাডেমিক শিক্ষায় দক্ষ করে তোলা নয়; বরং তাদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা ও গভীর দেশপ্রেমের বিকাশ ঘটানো। আমরা এমন একটি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তুলতে চাই, যারা বিশ্বমানের আধুনিক জ্ঞান ও দক্ষতায় সমৃদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন থাকবে।’

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য শিক্ষার সুযোগ

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে স্টেপিং-স্টোন ইন্টারন্যাশনাল স্কুল বাংলাদেশ (এসআইএসবি)। প্রতিষ্ঠানটিতে এসব শিশুর প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষার পাশাপাশি নানা সহায়ক ব্যবস্থার সুযোগ রাখা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, উপযুক্ত পরিবেশ, যত্ন ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরাও তাদের মেধা ও সক্ষমতার বিকাশ ঘটাতে পারে। সঠিক শিক্ষার সুযোগ পেলে এসব শিশু আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বেড়ে উঠবে এবং ভবিষ্যতে সমাজে নিজেদের সম্মানজনক অবস্থান তৈরি করতে পারবে। এসআইএসবির এই উদ্যোগকে তাঁরা অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।

স্কুলের মানবিক উদ্যোগ

স্টেপিং-স্টোন ইন্টারন্যাশনাল স্কুল বাংলাদেশ শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা গড়ে তুলতে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে। সামাজিক ক্লাবের উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে প্রতিবছর দুই ঈদে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মধ্যে উপহার এবং শীতকালে কম্বল ও শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়।

আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীদের শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে স্কুলে বিভিন্ন বৃত্তি ও আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে। এর মধ্যে ‘সিঙ্গেল মাদার’ ও ‘সিবলিং’ স্কলারশিপে ২৫–৩০ শতাংশ, আর্থিক সংকটে থাকা শিক্ষার্থীদের ‘হার্ডশিপ’ স্কলারশিপে ৫০ শতাংশ, মেধাভিত্তিক বৃত্তিতে ২৫ থেকে ৭৫ শতাংশ এবং অভিভাবকের মৃত্যু হলে পরিস্থিতি বিবেচনায় ১০০ শতাংশ পর্যন্তও বৃত্তি দেওয়া হয়।

একটি শিশুর সম্ভাবনা শুধু পরীক্ষার ফলাফলে সীমাবদ্ধ নয়। তার চিন্তা, মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা ও স্বপ্নও ভবিষ্যৎ গঠনের অংশ। সেই সম্ভাবনাকে ধাপে ধাপে বিকশিত করে আগামী দিনের জন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করাই এসআইএসবির অন্যতম লক্ষ্য।