নির্বাচন ২০২৬: ফ্যাক্ট চেক

নির্বাচন ঘিরে লকডাউন ঘোষণার খবরটি ভুয়া

কোভিড মহামারির সময়ের লকডাউনের ভিডিও টিকটকে নতুন করে প্রচার করে দাবি করা হচ্ছে যে নির্বাচন ঘিরে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ভোট গ্রহণ হবে আগামী বৃহস্পতিবার। এর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি খবর ছড়িয়েছে যে নির্বাচনের জন্য সারা দেশে এক সপ্তাহের লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। তবে যাচাই করে দেখা গেছে, এ খবর ভিত্তিহীন।

লকডাউনের এই খবর টিকটকে বেশি ছড়িয়েছে। একাধিক টেলিভিশন চ্যানেলের প্রতিবেদন প্রকাশ করে দাবি করা হচ্ছে, ‘সরকারের বিশেষ ঘোষণা নির্বাচনের জন্য’, ক্যাপশনে লেখা ‘নির্বাচনের জন্য নিষেধাজ্ঞার বিশেষ ঘোষণা’। একটি টিকটক অ্যাকাউন্ট থেকে দাবি করা হয়েছে, ‘আগামীকাল ভোর ছয়টা থেকে পুরো এক সপ্তাহ লকডাউন’। আরেকটি থেকে দাবি করা হয়েছে, ‘আগামীকাল থেকে এক সপ্তাহের জন্য লকডাউন’ ক্যাপশনে লেখা, ‘সরকারের বিশেষ ঘোষণা নির্বাচন চলাকালীনের মধ্যে লকডাউন এর ঘোষণা।’

ভিডিওগুলো যাচাই করে দেখা যায়, ২০২১ সালে কোভিড মহামারির সময় সারা দেশে এক সপ্তাহের জন্য লকডাউন ঘোষণার যে খবর টেলিভিশনে প্রচার করা হয়েছিল, সেই ভিডিওগুলো সম্পাদনার মাধ্যমে নতুনভাবে লকডাউনের খবর প্রচার করা হচ্ছে। বর্তমান জাতীয় নির্বাচন ঘিরে লকডাউনের কোনো ঘোষণা সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে বলে কোনো খবর সংবাদমাধ্যমে আসেনি। নির্বাচন উপলক্ষে বুধ ও বৃহস্পতিবার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার। এই ঘোষণার সঙ্গে লকাডাউনের কোনো সম্পর্ক নেই।

মোটরসাইকেল চলাচলে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ভুয়া খবর

নির্বাচন ঘিরে ‘আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোটরসাইকেল চলাচলে নিষেধ’ দাবি করে ১৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়েছে। এই খবরও ভিত্তিহীন।

ভিডিওটিতে সেনাসদস্যের আদলে পোশাক পরা এক ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, ‘আগামী ১০ তারিখ থেকে নির্বাচনের জন্য ৩০ তারিখ পর্যন্ত সকল ধরনের মোটরসাইকেল চলাচলে নিষেধ। সবাই সাবধানে চলাফেরা করবেন। আমরা মাঠে আছি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। নির্দেশ মানুন, নিরাপদে থাকুন।’ এই ভিডিওটি ৩৪ লাখের বেশিবার দেখা হয়েছে।

যাচাই করে দেখা যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে ভিডিওটি তৈরি করা হয়েছে। আর ফেব্রুয়ারি মাস ৩০ দিনের হয় না। এত দিন ধরে নিষেধাজ্ঞা আরোপের কোনো খবর কোনো সংবাদমাধ্যমে পাওয়া যায়নি।

তবে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ১০ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা পর্যন্ত মোট ৭২ ঘণ্টা মোটরসাইকেল চলাচলে নিষেধাজ্ঞার সরকারি একটি প্রজ্ঞাপন পাওয়া গেছে।

‘সেনাবাহিনীকে গুলি করার নির্দেশ’ দেওয়ার ভুয়া বক্তব্য

নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে কেউ বিশৃঙ্খলা করলে প্রধান উপদেষ্টা সেনাবাহিনীকে গুলি করার নির্দেশ দিয়েছেন, এমন দাবি করে একটি ফটোকার্ড ফেসবুকে ছড়িয়েছে। যাচাইয়ে দেখা যায়, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ভোটকেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা মোকাবিলায় সেনাবাহিনীকে গুলি করার কোনো নির্দেশ দেননি। প্রকৃতপক্ষে একটি স্যাটায়ার পেজের ব্যঙ্গাত্মক পোস্টকে আসল খবর হিসেবে চালানো হচ্ছে। কোনো সংবাদমাধ্যমে এ ধরনের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

ফেসবুকে আসা পোস্টের সূত্র ধরে ‘Janina Tv’ নামের একটি ফেসবুক পেজে ৬ ফেব্রুয়ারি মূল ফটোকার্ডটির সন্ধান মেলে। তবে ওই পোস্টে এ বিষয়ে কোনো সূত্র উল্লেখ করা হয়নি। ‘Janina Tv’ ফেসবুক পেজটির ‘বায়ো’তে লেখা আছে, ‘আমাদের পোস্টগুলো শুধু বিনোদনের অংশ। কোনো পোস্ট সিরিয়াসলি নেবেন না।’

রুমিন ফারহানা সরে দাঁড়াননি

ব্রাহ্মণবাড়িয়া–২ আসনের স্বস্তন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন দাবি করে একটি ভিডিও ছড়িয়েছে। তবে যাচাই করে এর সত্যতা পাওয়া যায়নি।

ভাইরাল ভিডিওটির সূত্র অনুসন্ধানে যুগান্তরের প্রকাশিত একটি সংবাদ প্রতিবেদন পাওয়া যায়, যেখানে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন ওই আসনের জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রার্থী জিয়াউল হক মৃধা। মূল প্রতিবেদনের অংশ কেটে পটভূমি বিকৃত করে নতুন ভিডিওটি তৈরি করা হয়েছে।

রুমিন ফারহানা ভোটের মাঠ ছেড়েছেন, এমন কোনো খবর পাওয়া যায়নি। বরং তাঁর প্রচার চালানোর খবরই সংবাদমাধ্যমে রয়েছে।

মুফতি আবদুল মালেকের নামে ভুয়া ফটোকার্ড

জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আবদুল মালেককে উদ্ধৃত করে ‘আওয়ামী লীগের পরে বিএনপি সবচেয়ে বেশি ইসলামবিদ্বেষী দল’ এমন বক্তব্যসংবলিত একটি ফটোকার্ড ছড়িয়েছে ফেসবুকে। ‘দ্য ডেইলি ডাকসু’ পেজে ব্যবহার করা ফটোকার্ডের নকশার আদলে এই কার্ড তৈরি করা হয়েছে। যাচাইয়ে দেখা যায়, দ্য ডেইলি ডাকসু পেজ থেকে এমন কোনো ফটোকার্ড প্রকাশ করা হয়নি। মুফতি আবদুল মালেকের এ ধরনের কোনো বক্তব্যও কোথাও পাওয়া যায়নি।

শফিকুর রহমানের নামে ভুয়া ফটোকার্ড

জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের একটি বক্তব্য ধরে একটি ফটোকার্ড ছড়িয়েছে ফেসবুকে। সেখানে তাঁকে উদ্ধৃত করে লেখা হয়েছে, ‘আমরা চাঁদাবাজি করি না। আমরা হাদিয়া বায়তুল মাল ইয়ানত কালেকশন করি। আমরা ব্যাংক দখল করে দল চালাই। আমাদের বগলের নিচে নাবিল গ্রুপ ও ইসলামি ব্যাংক।’

প্রথম আলোর লোগো বসিয়ে এই কার্ড তৈরি করা হয়েছে। তবে প্রথম আলোর ফেসবুক পেজে এমন কোনো ফটোকার্ড পাওয়া যায়নি। এমন কোনো সংবাদও প্রথম আলো কিংবা কোনো সংবাদমাধ্যমে আসেনি। যাচাই করে দেখা যায়, প্রথম আলোর ফেসবুক পেজে আগে প্রকাশিত ভিন্ন একটি ফটোকার্ড সম্পাদনা করে ভুয়া ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে।

নাহিদের বক্তব্যের ভুয়া ভিডিও

একটি ভিডিও প্রচার করে দাবি করা হয়েছে, ‘জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কঠোর হুঁশিয়ারি! তিনি প্রকাশ্যে বলেছেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের ভোটের মাধ্যমে বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক রহমানকে শেখ হাসিনার মতো দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হবে।’

অনুসন্ধান চালিয়ে নাহিদ ইসলামের এমন কোনো বক্তব্য কোথাও পাওয়া যায়নি। ভিডিওটি সম্প্রতি নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হওয়া হামলার প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলামের বক্তব্য নিয়ে। সেখানে তিনি বলেছিলেন, মির্জা আব্বাসের নির্দেশে তারেক রহমানের সম্মতিতে এই হামলা হয়েছে। ভিডিওতে নাহিদ ইসলামকে বলতে শোনা যায়, এ ঘটনায় প্রশাসন ও বিএনপি দলীয়ভাবে এটার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়, তা তাঁরা দেখতে চান। নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, ‘বাকি জবাব রাজপথে দিব, ১২ ফেব্রুয়ারি ইলেকশনে দিব।’ ওই ভিডিওর ওপর লেখা যুক্ত করে দাবি করা হচ্ছে যে তিনি তারেক রহমানকে দেশছাড়া করার হুমকি দিয়েছেন।

মাওলানা মামুনুল হকের মিছিলের ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি

ঢাকা-১৩ আসনে ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য সমর্থিত প্রার্থী মাওলানা মামুনুল হকের নির্বাচনী গণমিছিল বা সমাবেশের দৃশ্য দাবি করে একটি ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। ছবিটিতে ৬৩ হাজারের বেশি প্রতিক্রিয়া পড়েছে, ৩ হাজার ২০০ কমেন্টস পড়েছে এবং প্রায় ১০ হাজার শেয়ার হয়েছে। তবে যাচাই করে দেখা যায়, ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ৯৮.৬ শতাংশ।