রেবন্তর, অপরাজিতা, জৈন তীর্থংকর
রেবন্তর, অপরাজিতা, জৈন তীর্থংকর

রেবন্তর বিরল মূর্তি উদ্ধার করে জাদুঘরে দিল বিজিবি, এই মূর্তির বিশেষত্ব কী

রাজশাহীর সীমান্ত ও চরাঞ্চল থেকে উদ্ধার করা হয় সূর্যপুত্র রেবন্তর একটি বিরল মূর্তি। বেলে পাথরের তৈরি মূর্তিটি সপ্তম শতকের হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন প্রত্নতত্ত্ব গবেষকেরা। একই সঙ্গে উদ্ধার হওয়া আরও ২৫টি প্রত্ননিদর্শন এবং ১ হাজার ৮১৮টি ধাতব মুদ্রা জাতীয় জাদুঘরে হস্তান্তর করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) রাজশাহী ব্যাটালিয়ন (১ বিজিবি)।

বরেন্দ্র অববাহিকার বিস্তৃত চরাঞ্চল ও সীমান্ত এলাকা থেকে বিভিন্ন সময়ে উদ্ধার করা এসব প্রত্নসম্পদ সম্প্রতি জাতীয় জাদুঘরের ইতিহাস ও ধ্রুপদি শিল্পকলা বিভাগকে আনুষ্ঠানিকভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সাবেক উপপরিচালক ও প্রত্নতত্ত্ব–গবেষক মোশারফ হোসেন মূর্তিগুলোর ছবি দেখে প্রাথমিকভাবে কয়েকটির সময়কাল ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব নির্ধারণ করেছেন। তাঁর ধারণা, উদ্ধার হওয়া রেবন্তর মূর্তিটি সপ্তম শতকের এবং এটি অত্যন্ত বিরল প্রত্ননিদর্শন।

রেবন্তর

রেবন্তর বিরল মূর্তি কী

যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টি মিউজিয়াম অব আর্টের ‘রেবন্ত’–বিষয়ক কিউরেটরিয়াল নোট (সংগ্রহ-পরিচিতি) অনুসারে রেবন্ত বা রৈবত হিন্দুধর্মের একজন দেবতা। ধর্মীয় বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি সৌর দেবতা সূর্য ও তাঁর স্ত্রী সংজ্ঞার কনিষ্ঠ সন্তান। রেবন্তকে সাধারণত ঘোড়ায় চড়া শিকারির বেশে দেখানো হয়। তাঁর হাতে থাকে তির–ধনুক, কখনো তলোয়ারও দেখা যায়।

রেবন্তর ভাস্কর্যে তাঁর সঙ্গে অনুচরদেরও দেখা যায়; কোনো কোনো প্রতিকৃতিতে একজন অনুচর তাঁর মাথার ওপর রাজকীয় মর্যাদার প্রতীক ছাতা ধরে থাকে। মধ্যযুগীয় পূর্ব ভারত, বিশেষ করে বাংলা ও বিহারে রেবন্তর উপাসনা ও চিত্রায়ণের প্রচলন ছিল। এ অঞ্চলে ষষ্ঠ শতক থেকে রেবন্ত-সম্পর্কিত ভাস্কর্যের অস্তিত্বের প্রমাণও পাওয়া যায়।

গুরুত্বপূর্ণ আরও যা আছে

পুরো সংগ্রহের মধ্যে ঐতিহাসিক ও আইকনোগ্রাফিক দিক থেকে রেবন্তর সঙ্গে আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ মূর্তি রয়েছে, নবম-দশম শতকের জৈন তীর্থংকর ও ১১-১২ শতকের অপরাজিতামূর্তি।

নিদর্শনগুলোর ছবি দেখে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সাবেক উপপরিচালক ও প্রত্নতত্ত্ব–গবেষক মোশারফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, সংগ্রহের অন্যতম প্রধান ও দুর্লভ আকর্ষণ সূর্যপুত্র রেবন্তর ভাস্কর্যটি। প্রাথমিকভাবে ছবিতে দেখে যা মনে হয়েছে, এটি সপ্তম শতকের হতে পারে। এটি একটি অতি বিরল প্রত্নবস্তু। এত পুরোনো সংগ্রহ কমই আছে।

একই সঙ্গে গোদাগাড়ীর চরাঞ্চল থেকে উদ্ধার হওয়া ভাস্কর্যটিকে তিনি নবম-দশম শতকের ‘জৈন তীর্থংকর’ মূর্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যা প্রাচীন বরেন্দ্র অঞ্চলে জৈনধর্মের প্রচার ও চর্চার ক্ষেত্রে এটি এক অমূল্য ঐতিহাসিক প্রমাণ। পাশাপাশি ১১-১২ শতকের অপরাজিতামূর্তিটি তৎকালীন ধর্মীয় ও ভাস্কর্যরীতির এক অসাধারণ নিদর্শনের সাক্ষ্য দেয় বলে মনে করেন তিনি।

অপরাজিতা

চামরধারিণী থেকে বিষ্ণু

জাতীয় জাদুঘরের ইতিহাস ও ধ্রুপদি শিল্পকলা বিভাগ আরও কিছু মূর্তির রূপ ও কাল স্পষ্ট করেছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো শৈল্পিক ‘চামরধারিণী’ মূর্তি।

এ ছাড়া বেলে পাথরের মহাকালী রূপের দেবী ‘চামুণ্ডা’ ও তাণ্ডবরূপী ‘নটরাজ শিব’ ছাড়া সংগ্রহে থাকা বেশির ভাগ কষ্টিপাথরের বিষ্ণুমূর্তি মূলত ১১-১২ শতকের ভাস্কর্যশৈলীর প্রতিনিধিত্ব করছে বলে জানিয়েছে জাতীয় জাদুঘরের ইতিহাস ও ধ্রুপদি শিল্পকলা বিভাগ। অন্যদিকে সংগৃহীত পিতলের রাধামূর্তিটি প্রাচীন আমলের নয়; বরং এটি ১৯-২০ শতকের তুলনামূলক আধুনিক ও লোকশিল্প শৈলীর একটি নিদর্শন বলে জানিয়েছে তারা।

পদ্মার চরাঞ্চল থেকে পাওয়া ১ হাজার ৮১৮টি ধাতব মুদ্রা নিয়ে জাতীয় জাদুঘরের মুদ্রা তাত্ত্বিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, এগুলো ব্রিটিশ আমল, ঔপনিবেশিক ভারত, পাকিস্তান এবং স্বাধীন বাংলাদেশের বিভিন্ন সময়ের মুদ্রা। ঝুলিতে থাকা অন্যান্য নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে একটি আস্ত শিবলিঙ্গ, ঐতিহ্যবাহী শিল–পাটা ও ভাস্কর্যের সংগৃহীত কিছু প্রাচীন খণ্ডিত অংশ।

শাহবাগে আনার পেছনের দীর্ঘ দাপ্তরিক প্রক্রিয়া

বিজিবির রাজশাহী ব্যাটালিয়ন থেকে এত বিশাল ও অমূল্য নিদর্শন জাতীয় জাদুঘরের স্থায়ী হেফাজতে নিয়ে আসার পেছনে রয়েছে টানা দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম।

নথি অনুযায়ী, উদ্ধার করা এসব প্রত্নসম্পদ গ্রহণের জন্য বিজিবি রাজশাহী ব্যাটালিয়নের পক্ষ থেকে ২০২৫ সালের ২৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত টানা ৯টি চিঠি আদান-প্রদান করা হয়। ব্যাটালিয়নে উপযুক্ত ও সুরক্ষিত আধুনিক সংরক্ষণাগার না থাকায় অমূল্য জাতীয় সম্পদগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়। জাদুঘরের চার সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল রাজশাহী গিয়ে বিপুল এই প্রত্নসম্পদ আনুষ্ঠানিকভাবে বুঝে শাহবাগে নিয়ে আসে।

বরেন্দ্রর সমৃদ্ধ প্রত্ন–মানচিত্র

জাতীয় জাদুঘরে স্থান পাওয়া প্রত্নসম্পদগুলোর মূল উৎস রাজশাহী জেলা। প্রাথমিক অভিযানের তথ্য অনুযায়ী, এগুলো মূলত রাজশাহীর ছয়টি সীমান্ত এলাকা—গোদাগাড়ী, বাঘা, চারঘাট, কাটাখালী, বেলপুকুর ও দামকুড়া থেকে বিভিন্ন সময়ে উদ্ধার করা হয়েছিল।

গোদাগাড়ী উপজেলার সাতপুর আমবাগান থেকে উদ্ধার হওয়া কষ্টিপাথরের বিষ্ণুমূর্তি, বাঘার পাকুরিয়া থেকে পাওয়া ১৫৬ কেজি ওজনের বেলে পাথরের চামুণ্ডামূর্তি, চারঘাটের বিষ্ণুমূর্তি এবং কাটাখালীর পদ্মার চর থেকে পাওয়া মুদ্রার তোড়া—সব মিলিয়ে পুরো বরেন্দ্র অববাহিকার প্রাচীন সমৃদ্ধি ও ঐতিহাসিক অবস্থানকে স্পষ্ট করে তোলে।

জৈন তীর্থংকর

ইতিহাস পুনর্নির্মাণ

প্রত্নতত্ত্ব বিশেষজ্ঞদের মতে, হস্তান্তরিত প্রতিটি নিদর্শন বরেন্দ্র অঞ্চলের তৎকালীন শিল্পকলা, ধাতব প্রযুক্তি, ধর্মীয় বৈচিত্র্য এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থার নিখুঁত প্রমাণ। বিশেষ করে সপ্তম শতকের রেবন্ত, নবম-দশম শতকের জৈন তীর্থংকর এবং একাদশ-দ্বাদশ শতকের অপরাজিতা ও বিষ্ণুমূর্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনগুলোর উপস্থিতি প্রমাণ করে—প্রাচীনকাল থেকে বরেন্দ্র অঞ্চলে বৈচিত্র্যময় ধর্মীয় সংস্কৃতির এক চমৎকার সহাবস্থান ও ধারাবাহিক বিকাশ বিদ্যমান ছিল।

প্রদর্শনী ও সংরক্ষণের প্রস্তুতি

জাতীয় জাদুঘর সূত্রে জানা গেছে, হস্তান্তরিত নিদর্শনের রাসায়নিক পরিচর্যার জন্য জাদুঘরের সংরক্ষণ রসায়নাগার বিভাগ এবং সার্বিক তথ্য-উপাত্তবিষয়ক তথ্য ইতিহাস ও ধ্রুপদি শিল্পকলা বিভাগ তৈরি করছে। সংরক্ষণ ও তথ্যফলক তৈরির কাজ পুরোপুরি শেষ হলে বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করার পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে ইতিহাসপ্রেমী ও গবেষকদের জন্য এগুলো জাতীয় জাদুঘরের ‘ইতিহাস ও ধ্রুপদি শিল্পকলা গ্যালারি’তে গবেষণার উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।

জাতীয় জাদুঘরের ইতিহাস ও ধ্রুপদি শিল্পকলা বিভাগের কিপার মনিরুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘গ্যালারি–সংকটের কারণে আপাতত সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য তা উন্মুক্ত থাকছে না। ভবিষ্যতে গ্যালারির সক্ষমতা বাড়লে আমরা তা সবার জন্য উন্মুক্ত করব।’

সীমান্তে কঠোর অবস্থানে বিজিবি

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)

জাতীয় প্রত্নসম্পদসহ সব ধরনের চোরাচালানের বিরুদ্ধে বিজিবি অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলে জানিয়েছে বিজিবি সদরদপ্তর। প্রথম আলোকে পাঠানো এক বার্তায় বিজিবির সদর দপ্তর বলছে, ‘সীমান্তে গোয়েন্দা নজরদারি, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিয়মিত ও বিশেষ টহল, তথ্যভিত্তিক অভিযান এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রত্নসম্পদ উদ্ধার থেকে শুরু করে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে নিরাপদে হস্তান্তর পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে বিজিবি সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করে। ২৬টি অমূল্য প্রত্নসম্পদ উদ্ধার ও জাতীয় জাদুঘরে হস্তান্তর তারই বাস্তব প্রমাণ।’

বিজিবি সদর দপ্তরের পরিচালক (অপারেশন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহবুব মুর্শেদ রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রত্নসম্পদ কোনো সাধারণ পণ্য নয়; জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়ের অংশ। এসব সম্পদ পাচারের যেকোনো অপচেষ্টা দেশের স্বার্থ ও প্রচলিত আইনের পরিপন্থী। এ ধরনের অপরাধে জড়িত ব্যক্তি ও চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে বিজিবি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী জনগণসহ সচেতন নাগরিকদের প্রতি আহ্বান—সন্দেহজনক কোনো তৎপরতার তথ্য দিয়ে বিজিবিকে সহযোগিতা করুন। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশের প্রতিটি অমূল্য প্রত্নসম্পদ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।’