পডকাস্ট শো ‘লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন-২’-এর দশম পর্বে অতিথি হিসেবে অংশ নেন অন্তিক অ্যানিমেটেড স্টুডিওর প্রতিষ্ঠাতা অন্তিক মাহমুদ (বাঁয়ে)
পডকাস্ট শো ‘লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন-২’-এর দশম পর্বে অতিথি হিসেবে অংশ নেন অন্তিক অ্যানিমেটেড স্টুডিওর প্রতিষ্ঠাতা অন্তিক মাহমুদ (বাঁয়ে)

লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন-২

আর্ট মূলত মানুষের গল্প বলার একটি শক্তিশালী ভাষা: অন্তিক মাহমুদ

তরুণ ও নবীন পেশাজীবীদের ক্যারিয়ার গঠনে বইয়ের শিক্ষার চেয়ে বেশি প্রয়োজন বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া সঠিক দিকনির্দেশনা। সেই প্রয়োজনীয়তা থেকেই লিগ্যাসি তৈরির পথে থাকা সফল তরুণদের স্বপ্ন, শেখার অভিজ্ঞতা আর ভুল থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প নিয়ে প্রথম আলো ডটকম ও প্রাইম ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে বিশেষ পডকাস্ট শো ‘লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন-২’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ রিদওয়ানুল হকের সঞ্চালনায় দশম পর্বে অতিথি হিসেবে অংশ নেন অন্তিক অ্যানিমেটেড স্টুডিওর প্রতিষ্ঠাতা অন্তিক মাহমুদ। আলোচনার বিষয় ছিল ‘শূন্য থেকে স্বপ্নপূরণ: অ্যানিমেশন, কার্টুন, সৃজনশীল সাহস এবং একটি স্টুডিও নির্মাণ।’

‘আমাদের অ্যানিমেশন ইন্ডাস্ট্রিকে শক্তিশালী করে তুলতে প্রথমত আমাদের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে হবে, যাতে একজন শিল্পী শুধু বেঁচে থাকার চিন্তায় আটকে না থাকে। দ্বিতীয়ত, প্রচুর ওয়ার্কশপ প্রয়োজন। আমরা হয়তো হুট করে বড় ইউনিভার্সিটি গড়ে তুলতে পারব না, কিন্তু ছোট ছোট ওয়ার্কশপের মাধ্যমে দক্ষ অ্যানিমেটর তৈরি করতে পারি।’

পডকাস্ট শোতে অংশ নিয়ে কথাগুলো বলেন অন্তিক মাহমুদ। পর্বটি প্রচারিত হয় গত শনিবার প্রথম আলোর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে।

পডকাস্টের শুরুতেই সঞ্চালক জানতে চান, ‘আপনার জন্ম বরিশালে, কিন্তু বড় হয়েছেন জাপানের নাগাসাকিতে। দেশে ফিরলেন ঠিক কবে?’

অন্তিক মাহমুদ বলেন, ‘আনুমানিক ১০ বছর বয়সে দেশে ফিরেছি। ফলে আমার শৈশবের যে কোর ভ্যালুগুলো, সেগুলো অনেকটাই জাপানের সংস্কৃতি থেকে এসেছে। এখনো কথা বলার সময় বা দাঁড়িয়ে থাকার সময় আমার কিছু অঙ্গভঙ্গি আছে, যেটা পুরোপুরি জাপানের অভ্যাস। বাংলাদেশে অনেকে এটাকে অদ্ভুত মনে করলেও আমি এটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। এ ছাড়া আমার যে ক্রিয়েটিভ সাইড—আমার মা বলেন, সেটা তাঁর থেকে পেয়েছি। কিন্তু আমি মনে করি, এটা আমি জাপান থেকেই পেয়েছি।’

‘কখন বুঝলেন, আপনি কার্টুন বা অ্যানিমেশনের দিকে ক্যারিয়ার গড়বেন?’ জবাবে অন্তিক মাহমুদ বলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত অনেক পরে এসেছে। ছোটবেলায় আমি কখনো নিজেকে “কার্টুনিস্ট” বা “আর্টিস্ট” হিসেবে ভাবিনি। সব সময় নিজেকে একজন গল্পকার বা স্টোরিটেলার হিসেবে ভাবতাম। তাই আমি গল্প বলার জন্য যে মাধ্যমই পেয়েছি, সেটা ব্যবহার করতে চেয়েছি। আমি গান বানিয়েছি, কমিকস করেছি, গল্পের বই লিখেছি—সবই করেছি গল্প বলার জন্য। কার্টুন সেই মাধ্যমগুলোর একটি, যেটা আমার কাছে গল্প বলার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত মনে হয়েছে।’

প্রসঙ্গক্রমে সঞ্চালক জানতে চান, ‘গল্প বলার জন্য কার্টুনকেই কেন আপনার কাছে সবচেয়ে উপযুক্ত মনে হয়েছে?’ জবাবে অন্তিক মাহমুদ বলেন, ‘আমি ছোটবেলা থেকে আঁকাআঁকি করতাম। খুব ভালো আঁকতাম, বিষয়টি এমন নয়। অদ্ভুত সব জিনিস আঁকতাম, যেমন গরু সাইকেল চালাচ্ছে, মুরগি বক্তৃতা দিচ্ছে। কার্টুন মাধ্যমটি আমার কাছে সহজ মনে হয়েছে। কারণ, এখানে কোনো কঠিন দৃশ্য দেখাতে ভিএফএক্স লাগে না, শুধু আঁকলেই হয়।’

‘ক্রিয়েটিভিটির সঙ্গে টেকনোলজির সম্পর্ক আপনি কীভাবে দেখেন?’ সঞ্চালকের এমন প্রশ্নের উত্তরে অন্তিক মাহমুদ বলেন, ‘টেকনোলজি ছাড়া এখন টিকে থাকা অসম্ভব। হাতে আঁকা কাজের দাম বেশি হতে পারে, কিন্তু কাস্টমার ডিমান্ড পূরণ করতে এবং “মাস প্রোডাকশন” করতে টেকনোলজি বা ডিজিটাল মাধ্যম লাগবেই। টেকনোলজিকে অবহেলা করলে পিছিয়ে পড়তে হবে।’

সঞ্চালক জানতে চান, ‘আপনি বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় একটি অ্যানিমেশন স্টুডিও তৈরি করেছেন। এই স্টুডিও বিজনেসকে সাসটেইনেবল করতে বড় বড় ব্র্যান্ডকে কীভাবে যুক্ত করলেন?’ অন্তিক মাহমুদ বলেন, ‘শুরুর দিকে আমি শুধু নিজের জন্য কাজ করতাম। আমার প্রথম স্পনসরশিপ ছিল একটি ফোন-কেস কোম্পানি থেকে, খুবই ছোট একটি কাজ। আমি তাদের বলেছিলাম, কম বাজেটে হলেও আমাকে একটা ভালো ভিডিও বানানোর সুযোগ দিন। এরপর আমি বিভিন্ন মিউজিক ব্যান্ড এবং আর্টিস্টদের জন্য ডেমো কাজ বা ফ্রিতে কাজ করে দিয়েছি। যখন কাজের পোর্টফোলিও বা ডেটাবেজ বড় হয়েছে, তখন বড় ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে কাজ করা সহজ হয়ে গেছে। এভাবেই ধীরে ধীরে ক্লায়েন্ট বাড়তে থাকে।’

বড় কমার্শিয়াল কাজগুলোর ক্ষেত্রে সৃজনশীলতার জায়গায় কোনো আপস বা কম্প্রোমাইজ করতে হয় কি না—এমন প্রশ্নের উত্তরে অন্তিক মাহমুদ বলেন, ‘আমি একটা মাঝামাঝি অবস্থানে থাকি। ক্লায়েন্টের আবদার একটি নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত শুনি, কিন্তু যেখানে মনে হয় আমার সৃজনশীলতা নষ্ট হচ্ছে, সেখানে আমি “না” করে দিই। টাকা ও আর্ট—এই দুইয়ের কোনো চরমপন্থায় যাওয়া উচিত নয়।’

এরপর সঞ্চালক জানতে চান, ‘আপনি যখন পেশা হিসেবে এটাকে নিলেন, আপনার পরিবার কি সমর্থন করেছিল?’ অন্তিক মাহমুদ বলেন, ‘আমার বাবা-মা এখনো আমাকে পড়াশোনা করতে বলেন। আগে তাঁদের ভিলেন মনে হতো, কিন্তু এখন বুঝি—তাঁরা আমার আর্থিক নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেই এসব বলতেন। এখন যদি আমার নিজের সন্তান থাকত, আমিও একই চিন্তাই করতাম।’

বাংলাদেশের স্টোরিটেলিং মার্কেট নিয়ে অন্তিক মাহমুদ বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রচুর চমৎকার গল্প ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, কিন্তু আমাদের মার্কেট একদমই “স্টোরি ড্রিভেন” নয়। সবকিছু এখন খুব বাণিজ্যিক হয়ে গেছে। বিনিয়োগকারীরা চান নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা গল্প। প্রথম কয়েকবার দর্শক এসব দেখলেও বারবার একই ধরনের কাজ হলে তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। তাই গল্পের দিক থেকে আমাদের বাজারের অবস্থা বেশ নাজুক বললেই চলে।’

প্রসঙ্গক্রমে সঞ্চালক জানতে চান, আর্ট বা অ্যানিমেশন কি সমাজে বড় কোনো পরিবর্তন আনতে পারে? অন্তিক মাহমুদ বলেন, ‘অবশ্যই। যেকোনো আর্ট ফর্ম দিয়েই সমাজে বড় পরিবর্তন বা রেভোল্যুশন আনা সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকা শহরের জুলাই আন্দোলনের সময় বিভিন্ন গান বা আর্ট যেভাবে মানুষকে আবেগপ্রবণ করেছে তা অতুলনীয়। অ্যানিমেশনের ক্ষেত্রে “ওয়ান পিস”-এর মতো সিরিজ আমাদের শেখায় কখনো হাল না ছাড়তে এবং নিজের স্বপ্নের জন্য লড়তে। আর্ট মূলত মানুষের গল্প বলার একটি শক্তিশালী ভাষা, যা অবচেতন মনে মানুষের চিন্তাচেতনায় পরিবর্তন করে দেয়।’

‘আগামী পাঁচ বছর পর নিজেকে এবং এই ইন্ডাস্ট্রিকে কোথায় দেখতে চান?’ জানতে চাইলে অন্তিক মাহমুদ বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমি এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছাতে চাই, যেখানে আমার কাজের পূর্ণ স্বাধীনতা বজায় থাকবে। যখন মাথায় কোনো আইডিয়া আসবে, কোনো আর্থিক চাপের কথা না ভেবে তখনই আমি তা নিয়ে কাজ করতে পারব। আর ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে আমার স্বপ্ন হলো আমার একটি বিশাল কোম্পানি থাকবে, যেখানে শত শত দক্ষ অ্যানিমেটর কাজ করবে। আমি শুধু সৃজনশীল নির্দেশনা দেব এবং তারা বিশ্বমানের অ্যানিমেশন তৈরি করবে। এ ছাড়া আমি চাই, এ রকম আরও অনেকগুলো অ্যানিমেশন কোম্পানি গড়ে উঠুক।’

আলোচনার শেষ পর্যায়ে সঞ্চালক জানতে চান, ‘বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে আমাদের ইতিহাস বা আর্ট কীভাবে কাজ করতে পারে?’ উত্তরে অন্তিক মাহমুদ বলেন, ‘বাংলাদেশের সব থেকে বড় আর্ট ফর্ম হলো মিউজিক। আমাদের প্রতিটি জেলায় আলাদা ধরনের মিউজিক আছে। গল্পের ক্ষেত্রে আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। কারণ, আমরা আমাদের পুরোনো গল্পগুলো নিয়ে অনেক বেশি সংবেদনশীল। একটু এদিক-সেদিক হলেই বিতর্ক তৈরি হয়। আমার মনে হয়, পুরোনো গল্প থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে একদম ভিন্ন এবং নতুন স্টোরি বিল্ডআপ করা উচিত। এ ছাড়া আমাদের পুরোনো ঐতিহ্যগুলোকে এখন ডিজিটাল ফরম্যাটে সংরক্ষণ করা উচিত।’