অলংকরণ : মাসুক হেলাল
অলংকরণ : মাসুক হেলাল

পাঠকের লেখা–৯৫

বাড়ি থেকে পালিয়ে লজিং মাস্টার

প্রিয় পাঠক, প্রথম আলোয় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে আপনাদের লেখা। আপনিও পাঠান। গল্প-কবিতা নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা। আপনার নিজের জীবনের বা চোখে দেখা সত্যিকারের গল্প; আনন্দ বা সফলতায় ভরা কিংবা মানবিক, ইতিবাচক বা অভাবনীয় সব ঘটনা। শব্দসংখ্যা সর্বোচ্চ ৬০০। দেশে থাকুন কি বিদেশে; নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বরসহ পাঠিয়ে দিন এই ঠিকানায়: readers@prothomalo.com

১৯৯৫ সালের এপ্রিল মাসের এক সকালবেলা। তখন পড়ি ক্লাস নাইনে। পুকুর থেকে গোসল করে এলাম। স্কুলে যাব।

মা-বাবা কী বিষয়ে যেন তর্ক করলেন। ঘরের পরিস্থিতি কিছুটা অস্বাভাবিক মনে হলো। খুব মন খারাপ হলো। টেবিলের ওপর বইয়ের পাশে ছোট একটা কৌটায় মায়ের নাকফুল, আরও কী কী যেন ছিল।

হঠাৎ মনে হলো, আমি আর এই বাড়িতে থাকব না। পালাব।

কৌটার ভেতরে থাকা স্বর্ণ নিলাম। পরনে ছিল একটা পুরোনো প্রিন্টের লুঙ্গি। গায়ে পোলো শার্ট। বসুরহাট এসে স্বর্ণগুলো ৩২৫ টাকায় বিক্রি করে দিলাম। প্রথমে বসুরহাট বিউটি সিনেমা হল রোডের তৃপ্তি হোটেলে গরুর মাংস আর তন্দুর রুটি খেলাম তৃপ্তিভরে।

অতঃপর টিকিট কেটে চট্টগ্রামগামী বাসে উঠলাম। এই প্রথম আমার একা চট্টগ্রাম যাওয়া। কোথায় যাব, কী করব জানি না।

মিরসরাই পার হওয়ার পর দুই নারী যাত্রী ওঠায় আমাকে সামনের সিট থেকে পেছনের সিটে যেতে বলা হলো।

একদম পেছনে যাওয়ার আগেই এক যাত্রী আমাকে তাঁর পাশে বসার আহ্বান জানালেন। বসতেই তিনি বললেন, ‘তুমি তো বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছ।’ উত্তরে বললাম, হ্যাঁ। তিনি এবার বললেন, ‘আমাদের বাড়িতে কাজ করবে?’ রাজি হয়ে গেলাম।

পথে ভদ্রলোক আমাকে অনেক কথা বললেন চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায়। কিছু বুঝলাম, কিছু বুঝলাম না।

চট্টগ্রামের কদমতলীতে আসার পর তিনি আমাকে একটা চিরকুট দিয়ে আনোয়ারাগামী একটা বাসে তুলে দিলেন। হেলপারকে বলে দিলেন আমাকে কোথায় নামাতে হবে।

আনোয়ারার নির্দিষ্ট জায়গায় নেমে ভয়ে আমি হিম হয়ে গেলাম। মাটির ঘর, পাহাড়ি এলাকা, বালুময় রাস্তাঘাট।

একটা দোকানে ঢুকে বানরুটি আর চায়ের অর্ডার দিলাম। খাওয়ার পর দোকানদারকে চিরকুটটা দিলে তিনি ঠিকানাটা চিনলেন। আরেকজন লোকের সঙ্গে আমাকে ঠিকানা অনুযায়ী যেতে বললেন।

ঠিকানা মোতাবেক ওই বাড়িতে গিয়ে চিরকুটটা দিলে গৃহকর্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন খেয়েছি কি না। উত্তরে বললাম, না। তিনি আমাকে হাত-মুখ ধুয়ে আসতে বললেন। খাবার দিলেন আতপ চালের ভাত আর এক বাটি ঝোল। ঝোলের ভেতরে ছিল দুই টুকরা আলু আর দুই টুকরা শুঁটকি। আমি ঝোলকে ডাল ভেবেছিলাম। মনে করেছিলাম নতুন করে তরকারি দেবে।

খেয়েদেয়ে একটু ঘুমাতেই সন্ধ্যা হয়ে এল। জানলাম জায়গাটার নাম হন্দিপপাড়া।

রাত নামতেই দেখলাম গৃহকর্তার বাড়িতে অনেকে কথা বলছেন। শুধু এটুকু বুঝলাম যে গৃহকর্তা বলছেন, ‘তুই আঁরার গুরা পোয়া।’

তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আমার বাবা কী করেন। বললাম দিনমজুর। অথচ আমার বাবা একজন শিক্ষক। আরও জিজ্ঞেস করলেন, আমার ভাই–বোন কয়জন। বললাম, সাতজন। আফসোস করে বললেন, ‘থাকো আমাদের বাড়িতে।’

পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে নাশতা করে আমার প্রথম কাজ ছিল মাঠ থেকে গরুর জন্য ঘাস আনা।

সকাল আটটায় বের হয়ে দুপুর ১২টায় ফিরলাম। গরু না খেতে পেরে ডাক দিতে লাগল।

রাতের বেলা যখন আমি পড়ার আগ্রহ দেখালাম, তখন তাঁরা বুঝলেন আমাকে দিয়ে রাখালের কাজ করানো যাবে না।

এক সপ্তাহ তাঁদের বাড়িতে থাকার পর তাঁরা উদ্যোগী হয়ে পাশের আমিন উল্যা পাড়ায় আমার লজিং ঠিক করে দিলেন।

আমার যে ছাত্র ছিল, সে আমার সমবয়সী। কিন্তু পড়ত মাত্র পঞ্চম শ্রেণিতে। ওই বাড়ির আরও দুজনকে পড়াতে হতো।

একদিন ছাত্রকে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে উত্তম-মধ্যম দিলাম। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় খুব গালি দিল। কিন্তু আমার শিক্ষার্থীদের মা ছিলেন একজন সহজ–সরল, অমায়িক নারী। তিনি আমাকে পুত্রজ্ঞান করতেন।

যে পরিবারে লজিং মাস্টার ছিলাম, ওই বাড়ির প্রতিনিধি হয়ে বিয়েশাদি, সুন্নতে খতনাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমাকে পাঠানো হতো। একটু বাড়ি থেকে বের হলেই অনেকে চা খাওয়াতে চাইত।

সমবয়সীরা মাঝে মাঝে গালি দিয়ে বলত ‘বইঙ্গা’ আর মুরব্বিরা বলতেন ‘উড়ো মাস্টুরিয়া’।

দেখতে দেখতে কোরবানির ঈদ এসে গেল। গৃহকর্তাকে জানালাম, বাড়ি যেতে চাই। তিনি উত্তরে বললেন, ‘ঈদের আগে আমরা কাউকে যেতে দিই না। এতে আমাদের অমঙ্গল হয়।’

আমি কোরবানির ঈদ করলাম তাঁদের সঙ্গেই।

ঈদের পরদিন রওনা দিলাম নোয়াখালীর কবীরহাটের শ্রীনদ্দী গ্রামে আমাদের বাড়ির উদ্দেশে।

আমার গৃহকর্তা বললেন, ‘খারে চলে আইসস। তোর লায় আঁরার পেট পুড়িব।’ (তাড়াতাড়ি চলে এসো। তোমার জন্য আমাদের পরান পুড়বে)

আমি বললাম, আমাকে চার দেয়ালে বন্দী করে রাখলেও আমি ফিরে আসব।

২.

দেড় মাস পর এক দুপুরে বাড়ি ফিরে এলাম। ঘরে যেন কান্নার রোল উঠল। মা-বাবা, দাদা-দাদি সবাই আমাকে বুকে জড়িয়ে খুব কান্না করেছিল।

শুনলাম আমার খোঁজে ঝাড়ফুঁক, রেডিওতে ঘোষণা—কোনো কিছু বাদ দেওয়া হয়নি।

বাবা স্কুলে ক্লাস নিতে পারতেন না। ক্লাসে গেলেই কান্না করতেন। মা কান্না করতে করতে চোখে রোগ বাধিয়ে ফেলেছিলেন।

এরপর পার হয়ে গেছে জীবনের অনেকটা বছর। নোয়াখালী ও ঢাকায় পড়াশোনা শেষ করে ক্যারিয়ার গড়েছি ব্যাংকে।

আমি আর যাইনি সেই লজিং বাড়িতে, মোহছেন আউলিয়ার মাজারের কাছে, আনোয়ারার আমিন উল্যা পাড়ায়।

তবু মনে পড়ে তাঁদের। আজও মনে পড়ে।

জ. ই রুবেল, অগ্রণী ব্যাংক, রামপুরা টিভি শাখা, ঢাকা