সারা হোসেন
সারা হোসেন

অভিমত: সারা হোসেন

পল্লবীতে শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা: তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার নিবিড় পর্যবেক্ষণ দরকার

পল্লবীতে শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় দ্রুত তদন্ত এবং বিচারের দাবি উঠেছে। শুধু এই শিশু নয়, অল্প বয়সী অনেক মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের খুন করা হয়েছে—এ রকম অনেক প্রতিবেদন গত কয়েক সপ্তাহে বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসেছে। এক বছর আগেও আমরা দেখেছিলাম, মাগুরায় এক শিশুকে ধর্ষণের পর খুনের ঘটনায় সারা দেশে তোলপাড় হলো।

নারী-শিশু নির্যাতন, বিশেষ করে কন্যাশিশুদের নির্যাতনের ঘটনাগুলো প্রতিরোধ করার জন্য যথেষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছিল না। ভয়াবহ যেসব ঘটনা ঘটে যাচ্ছিল, সেগুলো যথার্থ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত বা বিচার করা হচ্ছিল না। এ রকম অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সংশোধনী আনা হয়, যাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত এবং বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করা যায়। ২০২৫ সালে আনা এই সংশোধনীতে নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশু এবং সাক্ষীদের সুরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ধারা রাখা হয়। এই আইনের সংশোধনী বর্তমান নির্বাচিত সরকার অনুমোদন করেছে।

আমাদের সামনে বড় পরীক্ষা হচ্ছে, নতুন আইনটি সঠিকভাবে প্রয়োগ হবে কি না এবং এ ধরনের মামলাগুলোকে যে ধরনের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত, সেটা দেওয়া হবে কি না। আমরা শুনে আশ্বস্ত হচ্ছি, আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দুজনেই বলেছেন, এমনকি প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, এ ঘটনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তাঁরা দেখবেন; কিন্তু আমরা দেখতে চাই, যেকোনো ঘটনার ক্ষেত্রে আইন যাতে নিজের গতিতে চলে এবং যথার্থভাবে চলে। সমস্যা হচ্ছে, যতক্ষণ না পর্যন্ত একটা ঘটনাকে চাঞ্চল্যকর হিসেবে দেখা হচ্ছে বা মনে করা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা কোনো ধরনের রেসপন্স (প্রতিক্রিয়া বা দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া) দেখি না। এটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকেও না, আমাদের বিচারব্যবস্থার কাছ থেকেও না।

ধর্ষণের যেকোনো মামলা রুজু হওয়ার পর তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ হওয়া দরকার। আরেকটা কথা—আইনে সংশোধনী আসার পর মামলার সঙ্গে যুক্ত পুলিশ, বিচারক, আইনজীবী ও চিকিৎসকদের বিশেষ কোনো প্রশিক্ষণ হয়নি। এই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা শুরু করা যেতে পারে।

যে কারণে কন্যাশিশুরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, সেই অনিরাপত্তা দূর করা আমাদের প্রধান কাজ হওয়া উচিত। ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর অবশ্যই তদন্ত ও বিচার সঠিকভাবে হওয়া উচিত। কিন্তু তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে এবং আমরা যাতে নিরাপত্তা বোধ করতে পারি, আমাদের মেয়েরা যাতে ভয়াবহ ঘটনার শিকার না হয়।

নারীদের প্রতি যে ধরনের বিদ্বেষ ছড়ানো হয়, মেয়েদের ক্ষেত্রে যে ধরনের বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত দেশে বিরাজমান, সেখানে আমাদের হাত দিতে হবে। আরেকটি কথা না বললেই নয়, এবার আমরা দেখছি অনেকেই আওয়াজ তুলছেন ফাঁসি দিতেই হবে, ফাঁসি ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। এমন কথাও শোনা যাচ্ছে যে ঢাকা বার (আইনজীবী সমিতি) থেকে নাকি প্রতিজ্ঞা করা হয়েছে—কোনো আইনজীবী অভিযুক্ত ব্যক্তির পক্ষে দাঁড়াবেন না। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে আমরা চাইছি, যেভাবেই হোক আইনের শাসন গড়ে তুলতে। সেখানে শুধু ফাঁসি বা সাজার কথা বললেই হবে না, আমাদের সেই কঠিন পথেও হাঁটতে হবে, যাতে শুধু দ্রুত বিচার নয়, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারি।

এমন বিচার আমরা দেখতে চাই, যা নিয়ে কেউ কোনো দিন কোনো প্রশ্ন তুলতে পারবে না এবং যেখানে আমরা কারও প্রতি অবিচারও করতে যাব না। আইনজীবী না পাওয়ার বিষয়টি আসলেই খুব ভয়াবহ একটা ব্যাপার। আমাদের বিচারব্যবস্থার মূল শর্তই হচ্ছে, প্রত্যেক নাগরিকের ‘লিগ্যাল ডিফেন্স’ (আইনি প্রতিরক্ষা) পাওয়ার অধিকার রয়েছে। এটা আমাদের সংবিধানেরও বক্তব্য, আমাদের আইনেও একই বক্তব্য আছে। এখানে কাউকে তার আইনগত ও সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। সব সময় মনে রাখা দরকার, বিচার যাতে আমরা ন্যায়ভাবে করি, অন্যায়ভাবে যাতে না করি।

  • সারা হোসেন, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী