
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের লস অ্যাঞ্জেলেসে গ্রিফিথ পার্কের সবুজ মাঠে তখন বনভোজনের আনন্দ। কেউ খাবার নিয়ে ব্যস্ত, কেউ আড্ডায়, কেউবা দীর্ঘদিনের বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলছেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে জড়ো হওয়া প্রবাসীদের এই মিলনমেলার মাঝেই উপস্থিত হলেন বাংলাদেশের প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। ৩৬ বছর পর লস অ্যাঞ্জেলেসে এসে প্রবাসীদের পাশে বসে দীর্ঘ সময় মতবিনিময় করলেন তিনি। শুনলেন তাঁদের নানা প্রত্যাশা ও সমস্যার কথা।
স্থানীয় সময় গত রোববার (৩০ আগস্ট) লস অ্যাঞ্জেলেসের গ্রিফিথ পার্কের মেরি গো রাউন্ড এলাকায় ক্যালিফোর্নিয়া বিএনপির উদ্যোগে দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপন ও বার্ষিক বনভোজনের আয়োজন করা হয়। ক্যালিফোর্নিয়া বিএনপির সভাপতি বদরুল আলম চৌধুরীর (শিপলু) সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক এম ওয়াহিদ রহমানের সঞ্চালনায় এতে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী। বিশেষ অতিথি ছিলেন সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান। বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী, সমর্থক ও প্রবাসী বাংলাদেশি এতে অংশ নেন।
বনভোজনের এক পর্যায়ে দলীয় আনুষ্ঠানিকতার বাইরে কমিউনিটির বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের সঙ্গে বসেন মন্ত্রী। ব্যবসায়ী, সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি ও সাধারণ প্রবাসীরা একে একে তাঁদের কথা বলেন। এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলা এই মতবিনিময়ে উঠে আসে দেশে বিনিয়োগের সমস্যা, রিক্রুটিং এজেন্সির ভূমিকা, বিমানবন্দরের সেবা, রেমিট্যান্স, ‘প্রবাসী কার্ড’ ও নিরাপদ অভিবাসনের মতো বিষয়।
প্রবাসীদের উদ্দেশে আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘আমি প্রবাসে থাকার কারণে প্রবাসীদের সমস্যা বুঝতে পারি।’ লস অ্যাঞ্জেলেসের প্রবাসীদের যেকোনো সমস্যা ই-মেইল অথবা ফোনে তাঁকে জানানোর আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া বিষয়গুলো রেকর্ডে রেখে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
নিরাপদ অভিবাসন ও প্রবাসী কার্ড
বাংলাদেশ থেকে বৈধ ও দক্ষ অভিবাসন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, সাগরপথে বা অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়া কমাতে হবে। অবৈধ পথে বিদেশে লোক পাঠানোর সঙ্গে জড়িত চক্রকে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ চলছে। পাশাপাশি আগামী এক মাস কয়েকটি জেলায় ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচার চালানো হবে।
বিদেশে কর্মী পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনভিত্তিক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর বৈধতা, বিদেশে কর্মীর চাহিদা এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য ব্যবস্থাপনায় আরও স্বচ্ছতা আনা হবে।
মন্ত্রী আরও জানান, সরকারের ১৮০ দিনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে। এ ছাড়া প্রবাসে কোনো বাংলাদেশি মারা গেলে তাঁর মরদেহ দেশে ফেরানোর পাশাপাশি পরিবারকে আর্থিক এবং সন্তানদের লেখাপড়ায় সহায়তার আশ্বাস দেন তিনি। বিদেশফেরত কর্মীদের আগের পেশা অনুযায়ী আর্থিক ও লজিস্টিক সহায়তা দিয়ে পুনরেকত্রীকরণের বিষয়েও সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন মন্ত্রী।
বিনিয়োগে আগ্রহ ও প্রবাসীদের দাবি
মতবিনিময় সভায় প্রবাসীরা দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও হয়রানি কমানোর দাবি জানান। এক প্রবাসী বলেন, ‘আমরা দেশকে কিছু দিতে চাই।’
প্রবাসীরা জানান, তাঁরা শুধু রেমিট্যান্স প্রেরক হিসেবে থাকতে চান না। বিদেশে অর্জিত অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও পুঁজি কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে ব্যবসা করতে চান এবং কর্মসংস্থান তৈরির মাধ্যমে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে চান।
দেশে আসা-যাওয়ার সময় বিমানবন্দরে ‘কুইক সার্ভিস’ এবং ফ্লাইট বিলম্বের ক্ষেত্রে আরামদায়ক ভিআইপি লাউঞ্জ সুবিধা চালুর দাবি জানান প্রবাসীরা। এ ছাড়া হজযাত্রীদের জন্য হজ ক্যাম্পের সুযোগ-সুবিধা এবং মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে ‘সিন্ডিকেট’ ইস্যুসহ রিক্রুটিং এজেন্সির কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দাবিও উঠে আসে আলোচনায়।
অনুষ্ঠানে কমিউনিটির প্রতিনিধিরা জানান, লস অ্যাঞ্জেলেসে এর আগে অনেক মন্ত্রী এলেও এবার একজন মন্ত্রী আনুষ্ঠানিকতার বাইরে এসে কমিউনিটির নেতাদের পাশে বসে দীর্ঘ সময় কথা শুনেছেন, যা অত্যন্ত ইতিবাচক।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মোহাম্মদ বাসিত, সৈয়দ নাসির জেবুল, মোহাম্মদ আব্দুল মুনিম, মোয়াজ্জেম আহমেদ রাসেল, মইনুল হক, মুশফিকুর চৌধুরী, বদরুল আলম মাসুদ, আবদুল বাসেত, লোকমান হোসেন, মাহতাব আহমেদ, শিপার চৌধুরী, নাসির খান, আফজাল হোসাইন সিকদার, চপল আনসারি, মনিরুল ইসলাম, আবদুল হাকিম, সাইফুর আনসারি, হাসানাত খন্দকার, নিয়াজ মোহাইমিন, মাহবুবুর রহমান শাহীন, খন্দকার আলম, কানচন চৌধুরী, লিটু আহমেদ, মার্শাল হক, ইলিয়াস মিয়া, ইলিয়াস সিকদার, মোহাম্মদ হান্নান, খান মুহাম্মদ আলী, আবুল হাশেম, মাহবুবুর রহমান, মোর্শেদ আলম প্রমুখ।