
মঙ্গলবার দিল্লি যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক বুধবার। দেখা হবে অজিত দোভাল, পীযূষ গোয়েল ও হারদীপ সিং পুরির সঙ্গে।
ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা। তাঁকে ঢাকায় পাঠিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ‘অন্তর্বর্তী সরকারের পর্ব’ থেকে উত্তরণের ইঙ্গিত দিয়েছিল দিল্লি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের দিল্লি সফরটি হতে যাচ্ছে টেকসই রাজনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্র তৈরির গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এই সফরের মধ্য দিয়ে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে দিল্লির অবস্থান বুঝতে চাইবে ঢাকা। তেমনি দীর্ঘ মেয়াদে সম্পর্কের বিষয়ে বাংলাদেশের ভাবনা সম্পর্কে ভারতকে বার্তা দেওয়া হবে।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের সূত্র অনুযায়ী, আগামীকাল ৭ এপ্রিল মঙ্গলবার থেকে ৯ এপ্রিল বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দিল্লি সফরে ভারতের অবস্থান বাংলাদেশ জানতে ও বুঝতে চাইবে। পাশাপাশি শুধু বর্তমান সরকারের মেয়াদকালেই নয়, দীর্ঘ মেয়াদে পারস্পরিক মর্যাদা ও আস্থার ভিত্তিতে সম্পর্কটা এগিয়ে নিতে দুই দেশ যেন সচেষ্ট থাকে, সেই বার্তাও দেবে বাংলাদেশ।
মূলত ১১ ও ১২ এপ্রিল মরিশাসের রাজধানী পোর্ট লুইসে অনুষ্ঠেয় ইন্ডিয়ান ওশান কনফারেন্সে যোগ দেওয়ার আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ভারতের রাজধানীতে যাবেন। দিল্লিতে তাঁর সফরসঙ্গী হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর এই প্রথম বাংলাদেশের কোনো মন্ত্রী দিল্লি সফর করবেন। ভারতের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন মরিশাসে দুই দিনের ইন্ডিয়ান ওশান কনফারেন্সের আয়োজন করেছে।
ইন্ডিয়ান ওশান কনফারেন্সে যোগ দেওয়ার আগে ভারতে যাচ্ছি। দিল্লি সফরের সময় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করসহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিনিধির সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে। এসব আলোচনায় দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা হবে। আমরা পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মর্যাদা ও স্বার্থের ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে একটি স্বাভাবিক সম্পর্ক চাই।পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান
দুই দেশের কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ৭ এপ্রিল বিকেলে দিল্লির উদ্দেশে ঢাকা ছাড়বেন; আর ৯ এপ্রিল দুপুরে তিনি পোর্ট লুইসের উদ্দেশে দিল্লি ছাড়বেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ৭ এপ্রিল সন্ধ্যায় দিল্লিতে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে আলোচনা করবেন। পরদিন অর্থাৎ ৮ এপ্রিল তিনি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করবেন। ওই বৈঠকে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি তিনি সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল ও পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসবিষয়ক মন্ত্রী হারদীপ সিং পুরির সঙ্গে।
জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইন্ডিয়ান ওশান কনফারেন্সে যোগ দেওয়ার আগে ভারতে যাচ্ছি। দিল্লি সফরের সময় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করসহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিনিধির সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে। এসব আলোচনায় দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা হবে। আমরা পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মর্যাদা ও স্বার্থের ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে একটি স্বাভাবিক সম্পর্ক চাই।’
বাংলাদেশের কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আসন্ন সফরটি হবে টেকসই রাজনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্র তৈরির সফর। এই সফরের ধারাবাহিকতায় শীর্ষ নেতৃত্ব পর্যায়ে নিয়মিত যোগাযোগসহ সহযোগিতার অন্যান্য বিষয় এগোবে। বিশেষ করে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের পর দুই প্রতিবেশীর সম্পর্কের বিবর্তনের পথরেখাটা কেমন হতে পারে, তা আসবে দিল্লির আলোচনায়। তাই এবারের আলোচনায় ইস্যুর অগ্রাধিকারের চেয়ে সম্পর্ক নিয়ে দুই পক্ষের রাজনৈতিক অবস্থান বিনিময়ের বিষয়টি প্রাধান্য পেতে পারে। বিশেষ করে ২০২৪–এর জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটেছে, দেরিতে হলেও ভারত সেটি অনুধাবন করেছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কের যে সমীকরণ ছিল, সেখানে ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই। বর্তমান বাস্তবতা মেনে নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের বিষয়টিকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করার প্রেক্ষাপট থেকে দেখতে হবে।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক সূত্রগুলো আভাস দিয়েছে, দিল্লির সঙ্গে একটি ভালো সম্পর্ক চায় ঢাকা, যেটা হবে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়। কারও চাপিয়ে দেওয়া নয়, এই বার্তাই দেওয়া হবে এই সফরে। বাংলাদেশে গণ–অভ্যুত্থানের পরবর্তী তিক্ততার অধ্যায় পেরিয়ে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার সুযোগটা কোথায় কোথায় রয়েছে, সেটিও আলোচনায় আসতে পারে।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, সম্পর্ক এগিয়ে নিতে ভারতকেও কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে, যা সরাসরি জনগণের জীবনে প্রভাব ফেলে। যেমন নির্বাচনের পর বাংলাদেশের মিশনগুলোতে ভারতীয়দের জন্য ভিসা পুরোদমে চালু হয়েছে; কিন্তু বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য সব শ্রেণির ভিসা এখনো চালু করেনি ভারত। ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত ভারতের আকাশপথ ব্যবহার করে তৃতীয় দেশে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি, স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশের ছয়টি পণ্য ভারতে রপ্তানি এবং বাংলাদেশের ৯ ধরনের পাটজাত পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল। ওই বিধিনিষেধ এখনো প্রত্যাহার করা হয়নি। সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হলে ভারতের সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এই ইস্যুগুলোর সুরাহা জরুরি।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক সূত্রগুলো আভাস দিয়েছে, দিল্লির সঙ্গে একটি ভালো সম্পর্ক চায় ঢাকা, যেটা হবে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়। কারও চাপিয়ে দেওয়া নয়, এই বার্তাই দেওয়া হবে এই সফরে। বাংলাদেশে গণ–অভ্যুত্থানের পরবর্তী তিক্ততার অধ্যায় পেরিয়ে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার সুযোগটা কোথায় কোথায় রয়েছে, সেটিও আলোচনায় আসতে পারে।
জানা গেছে, দুই দেশের আলোচনায় সব ধরনের ভারতীয় ভিসা পুরোদমে চালু, বাণিজ্যের পথ সুগম, জ্বালানি সহযোগিতা, গঙ্গা, তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনে সহযোগিতা ও সীমান্তে শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি বজায় রাখার মতো বিষয়গুলো আসতে পারে।
ভারতীয় গণমাধ্যম দ্য প্রিন্টের এক বিশ্লেষণে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফরকে ‘ঢাকার সম্পর্ক পুনর্গঠনের’ উদ্যোগ বলে মন্তব্য করা হয়েছে। নিবন্ধটিতে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ক্ষমতায় আসার পর ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। দিল্লিও যদি ইতিবাচকভাবে এগিয়ে আসে, তাহলে সম্পর্ক উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে।
দ্য প্রিন্টের ওই বিশ্লেষণে মন্তব্য করা হয়েছে, অতীতের প্রেক্ষাপট থেকে বিএনপিকে মূল্যায়নের পরিবর্তে বিএনপিকে নতুনরূপে দেখার কথা বলা হয়েছে ওই নিবন্ধে। শুধু নেতৃত্বই বদলায়নি, দিল্লির প্রতি দলটির দৃষ্টিভঙ্গিও এখন আরও সংবেদনশীল ও ইতিবাচক। অতীতের তুলনায় ভারত এবার প্রথমবারের মতো এমন একটি বিএনপিকে পাচ্ছে, যারা দিল্লির সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।