সংশোধিত ফৌজদারি কার্যবিধি ও নাগরিক-পুলিশ সম্পর্ক নিয়ে কর্মশালা করেছে অধিকারভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক সপ্রান (সকল প্রাণের নিরাপত্তা)। কর্মশালার শিরোনাম ছিল ‘সংস্কার বাস্তবে কতটা কার্যকর? সংশোধিত ফৌজদারি কার্যবিধির আওতায় নাগরিক-পুলিশের যোগাযোগ ও আইনি সুরক্ষা পর্যালোচনা’। ফৌজদারি কার্যবিধি সম্পর্কে নাগরিকদের সচেতনতা বাড়ানো এবং সংশোধিত আইনের বাস্তব প্রয়োগ ও আইনি সুরক্ষা নিয়ে এই কর্মশালায় আলোচনা হয়েছে।
শনিবার রাজধানীর বাংলামোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে এ কর্মশালা হয়। ব্রিটিশ শাসনামলে ফৌজদারি কার্যবিধি প্রণয়নের পর বিভিন্ন সময়ে এতে সংশোধনী আনা হয়েছে। সর্বশেষ সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গত বছর ফৌজদারি কার্যবিধিতে অধ্যাদেশের মাধ্যমে পরিবর্তন আনা হয়। বর্তমান সংসদে সেই সংশোধনীগুলোর আইনি স্বীকৃতিও দেওয়া হয়েছে।
সপ্রানের কর্মশালার শুরুতে অংশগ্রহণকারীদের বাস্তব পরিস্থিতি ও মামলাভিত্তিক কয়েকটি ‘কেস স্টাডি’ দেওয়া হয়। তাঁরা দলগতভাবে সেগুলো বিশ্লেষণ করেন এবং নিজেদের পর্যবেক্ষণ ও প্রস্তাব বক্তা ও অন্য অংশগ্রহণকারীদের সামনে তুলে ধরেন। এর মাধ্যমে ফৌজদারি কার্যবিধির বিভিন্ন বিধান বাস্তব পরিস্থিতিতে কীভাবে প্রযোজ্য হতে পারে, সে বিষয়ে অংশগ্রহণকারীরা ব্যবহারিক ধারণা পেয়েছেন বলে সপ্রানের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
কর্মশালার দ্বিতীয় পর্বে আইনের ইতিহাস–গবেষক ও লেখক রাশেদ রাহম ঔপনিবেশিক সময় থেকে বর্তমান পর্যন্ত বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যবিধিতে সংঘটিত উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ও আইনের কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে সংশোধনী আনা হলেও ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার মূল কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন আসেনি। ঔপনিবেশিক কাঠামো ও বিচারপ্রক্রিয়ার ভিত্তি এখনো বহাল রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া এই কাঠামোর সঙ্গে বর্তমান সংবিধান ও আইনের সম্পর্ক কীভাবে গড়ে উঠেছে, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি। পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আইনি সুরক্ষা ও বিধান লঙ্ঘন করলে তার পরিণতি কী হবে, বিদ্যমান কাঠামোর সেই সীমাবদ্ধতার দিকে আলোকপাত করেন রাশেদ রাহম। কেবল ঘটনা নথিবদ্ধ না করে মূল সমস্যার সমাধান এবং কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কাজী জাহেদ ইকবাল বাংলাদেশের আইনগত কাঠামোর ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার এবং সমাজের সঙ্গে আইনের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনগত কাঠামো ইউরোপীয় আইনব্যবস্থার আদলে গড়ে উঠেছে এবং ঔপনিবেশিক শাসনের মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিটি সমাজের নিজস্ব ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের সঙ্গে তার আইনব্যবস্থার সম্পর্ক রয়েছে, পাশাপাশি আইনগত কাঠামোর সঙ্গে সমাজের অর্থনৈতিক সম্পর্কও যুক্ত। সময়ের সঙ্গে সমাজের প্রয়োজন বদলালেও আইনগত কাঠামোতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন অনেক সময় একই গতিতে ঘটে না।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম পুলিশ বাহিনীর ক্ষমতা, সীমাবদ্ধতা ও স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিয়ে কর্মশালায় কথা বলেন। পুলিশ কোন কোন ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করতে পারে এবং কোথায় তাদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ, তা বোঝার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। বাংলাদেশ এখনো কেন একটি স্বাধীন পুলিশ কমিশনের দিকে এগোতে পারেনি, সে প্রশ্ন রাখার পাশাপাশি ‘নিরাপদ হেফাজত’ বা ‘সেফ কাস্টোডি’ ধারণা নিয়েও আলোচনা করেন সাবেক এই আইজিপি।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক কমিশনার ও গুম-সংক্রান্ত কমিশনের সাবেক সদস্য নূর খান (লিটন) মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গুমের ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা অনেক সময় মানবাধিকারকর্মীদের কাছে ফোন করে জানতে চান, তাঁদের স্বজন বেঁচে আছেন কি না। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই নিশ্চিত কোনো উত্তর দেওয়ার সুযোগ থাকে না। দীর্ঘদিন স্বজনের সন্ধান না পাওয়ার ফলে পরিবারগুলোর ওপর ব্যাপক মানসিক ও মানবিক চাপ তৈরি হয়। অনেক সময় ভুক্তভোগী নিজেও জানেন না কেন তাঁকে তুলে নেওয়া হচ্ছে।
সাম্প্রতিক প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গে নূর খান বলেন, তাঁর বিবেচনায় স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নকে (এসআরবি) র্যাবের তুলনায় আরও বিস্তৃত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, তদন্ত ও হেফাজতের মতো বিষয় আগে পুলিশের কাঠামোর অধীন ছিল। এগুলো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিভক্ত হওয়ায় পুরো ব্যবস্থা আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এর ফলে মানবাধিকারকর্মীদের কাজের পরিসর আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন নির্দেশনা ও গাইডলাইন এবং সেগুলো আইনের অংশ হিসেবে কতটা অনুসরণ করা হচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনা করেন সর্বোচ্চ আদালতের আইনজীবী প্রিয়া আহসান চৌধুরী। ফৌজদারি কার্যবিধির সাম্প্রতিক পরিবর্তনগুলো তুলে ধরে সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগের চিত্র পর্যালোচনা করেন তিনি।
কর্মশালার পরবর্তী পর্বে বক্তারা অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। ফৌজদারি কার্যবিধি, পুলিশি কার্যক্রম, গ্রেপ্তার, হেফাজত, আইনি সুরক্ষা ও সংস্কারের বাস্তবায়ন নিয়ে সেখানে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সপ্রানের গবেষণা পরিচালক মো. জারিফ রহমানের সমাপনী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে কর্মশালা শেষ হয়।