গৃহপরিচারিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রত্যেককেই অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে যাচাই-বাছাই ও খোঁজখবর নেওয়া উচিত বলে একটি হত্যা মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেছেন আদালত। মঙ্গলবার ঢাকার সপ্তম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ তাওহীদা আক্তার এ পর্যবেক্ষণ দেন।
প্রায় ছয় বছর আগে রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকায় এক শিল্পপতির শাশুড়ি ও তাঁর গৃহকর্মীকে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় করা মামলার রায়ে বিচারক এই পর্যবেক্ষণ দেন। রায়ে আরেক গৃহকর্মী সুরভী আক্তার নাহিদকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। খালাস দেওয়া হয় ওই বাসার কর্মী বাচ্চু মিয়াকে।
রায় ঘোষণার সময় দুই আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। বেলা দেড়টা থেকে তিনটা পর্যন্ত বিচারক মামলার অভিযোগপত্র, সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যালোচনা সংক্ষিপ্তভাবে পড়ে শোনান। বেলা ৩টা ১৭ মিনিটে রায় ঘোষণা করেন।
এ সময় খালাসের রায় শুনে বাচ্চু মিয়া কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, ‘দোষী না হয়েও দীর্ঘ সাত বছর (প্রায় ছয় বছর) ধরে কারাগারে ছিলাম। আজ আমি ন্যায়বিচার পেয়েছি।’
তবে রায়ের পর মামলার বাদী ও ভুক্তভোগী আফরোজা বেগমের মেয়ে দিলরুবা সুলতানা বলেন, ‘আমরা ন্যায়বিচার পাইনি। বাচ্চু মিয়া এ মেয়েকে এনেছে। এ ঘটনায় সে জড়িত আছে।’
২০১৯ সালের ১ নভেম্বর রাতে শিল্পপতি কাজী মনির উদ্দিন তারিমের শাশুড়ি আফরোজা বেগম (৬৫) এবং তাঁর গৃহকর্মী দিতির (১৮) রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। তাঁরা ধানমন্ডির ‘লোবেলিয়া হাউজ’ নামের একটি ভবনের পঞ্চম তলায় থাকতেন। ওই বাসায় দুজনকেই গলা কেটে হত্যা করা হয়।
আফরোজা বেগম যে ফ্ল্যাটে থাকতেন, তাঁর উল্টো দিকে ছয়তলার একটি ফ্ল্যাটে স্বামী-সন্তান নিয়ে থাকেন তাঁর মেয়ে দিলরুবা সুলতানা। তিনি ঘটনার দুই দিন পর মামলা করেন।
২০২২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্ত শেষে দুজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা মজিবুর রহমান। তাঁরা হলেন আফরোজা বেগমের বাসার কর্মী বাচ্চু মিয়া এবং গৃহকর্মী সুরভী আক্তার নাহিদ। ওই বছরের ১১ অক্টোবর দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু হয়। বিচার চলাকালে আদালত ৩২ সাক্ষীর মধ্যে ২৩ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করেন।
হত্যার জন্য শারীরিক শক্তির প্রয়োজন ছিল না
রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, আসামি সুরভী ৭ নভেম্বর ২০১৯ সালে আদালতে দায় স্বীকারমূলক জবানবন্দিতে ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের যে শারীরিক অবস্থার কথা বর্ণনা করেছেন, তাতে হত্যা সংঘটনের জন্য একজন সুরভীকে অধিক বলবান হওয়ার কোনো আবশ্যকতা নেই। দিতিকে ঘর মোছাকালে পেছন থেকে ধারালো চাকু দিয়ে গলা কেটে দেন ঘাতক এবং পড়ে গেলে তাঁকে পেটে আঘাত করেন। পরবর্তী সময়ে সুরভী রক্ত পরিষ্কার করে আফরোজা বেগমের কাছে যান। তিনি শুয়ে শুয়ে মুঠোফোন দেখার সময় ধারালো ছুরি দিয়ে গলা কেটে দেন ঘাতক এবং পেটে আঘাত করা হয়।
বিচারক বলেন, ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের শারীরিক দুর্বল অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ঘাতক সুরভীর বলবান হওয়ার প্রয়োজন ছিল না। আসামি সুরভী ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের মৃত্যু নিশ্চিত করার নিমিত্তে অত্যন্ত নির্মম ও পাশবিকভাবে তাঁদের হত্যা করেন। আফরোজাকে হত্যার সময় তাঁর ডান হাতের কনিষ্ঠ আঙুল ও বাঁ হাতের তর্জনী জখম হয়।
আর্থিক অনিশ্চয়তা থেকে হত্যাকাণ্ড
রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণ আসামি সুরভীর জবানবন্দি, তাঁর দেখানো জায়গা থেকে সোনা উদ্ধার এবং বিক্রি করা মুঠোফোন উদ্ধার (যা তিনি একজন রিকশাচালকের কাছে বিক্রি করেন) থেকে জানা গেছে।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, সুরভী ঘটনার তিন বছর আগে তাঁর বোনের বাসায় থেকে গার্মেন্টসে চাকরি করতেন। সেখানে মাসে তাঁর বেতন ছিল আট হাজার টাকা। গার্মেন্টসের চাকরি তাঁর ভালো লাগত না। ২০১৯ সালের মাঝামাঝিতে সুরভী বেতন উঠিয়ে আর কাজে যাননি। অপর একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ২৫ অক্টোবর তাঁর বাবা তাঁকে মারধর করেন। অভিমানে সুরভী বাসা থেকে বেরিয়ে যান।
পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, পরে ঘুরতে ঘুরতে বাচ্চুর সঙ্গে পরিচয় হয় সুরভীর। বাচ্চু তাঁকে ওই বাসায় কাজ দেন। সুরভী বাসা থেকে বেরিয়ে গিয়ে আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়েন মর্মে আদালতের কাছে প্রতীয়মান হয়। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য বাসায় ঢুকে খুন করে ভুক্তভোগীর (আফরোজা) পরিহিত সোনার হার, হাতের চুড়ি ও মুঠোফোন নিয়ে পালিয়ে যান। এটি ছিল অত্যন্ত বর্বর, ঘৃণিত ও রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড। ফলে গৃহপরিচারিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রত্যেককেই অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে যাচাই-বাছাই ও খোঁজখবর নিয়ে রাখা উচিত।