
শুধু রিউমর স্ক্যানারই ৬৮টি ভুয়া তথ্য শনাক্ত করে। এর মধ্যে ১৩টি ছিল ভিডিও। সংবাদমাধ্যমের ভুয়া ফটোকার্ড ছিল ৩০টি।
উৎসবের আমেজে হয়ে গেল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ভোটগ্রহণ। ভোটের মাঠে তেমন অস্থিরতা ছিল না, তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক আগের মতোই অস্থির ছিল নানা অপতথ্যে।
আজ বৃহস্পতিবার ভোট চলার মধ্যে দিনভর অর্ধশতাধিক ভুয়া তথ্য শনাক্ত করেছে দেশের ফ্যাক্টচেকিং প্ল্যাটফর্মগুলো। তার মধ্যে সংবাদমাধ্যমের লোগো নকল করে ফটোকার্ডে ভুয়া তথ্য ছিল বেশি।
রিউমর স্ক্যানার মোট ৬৮টি ভুয়া তথ্য শনাক্ত করে। এর মধ্যে ১৩টি ছিল ভিডিও। দুটি ছিল এআই ও ডিপফেক ভিডিও। সংবাদমাধ্যমের ভুয়া ফটোকার্ড ছিল ৩০টি। বাকিগুলো ছিল ভুয়া তথ্যসংবলিত পোস্ট।
অপতথ্যগুলোর মধ্যে ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তা নিশ্চিতে নির্বাচনের আগের মহড়া নিয়ে ছিল ৪টি, জাল ভোট ও ব্যালট বাক্সকেন্দ্রিক ৩টি, প্রার্থীদের নিয়ে ১২টি, সেনাবাহিনী নিয়ে ৩টি। ব্যক্তি হিসেবে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিয়ে সর্বোচ্চ ১১টি ভুল তথ্য শনাক্ত করে রিউমর স্ক্যানার।
ডিসমিসল্যাব শনাক্ত করে ২৬টি ভুল তথ্য। এর মধ্যে ভিডিও ছিল ৬টি, ফটোকার্ড ১০টি, এআই ও ডিপফেক ভিডিও ২টি। জাল ভোট ও ব্যালট বাক্স নিয়ে ৩টি এবং প্রার্থীদের নিয়ে ৩টি ভুল তথ্য শনাক্ত করে প্ল্যাটফর্মটি।
দ্য ডিসেন্ট শনাক্ত করে ২১টি ভুল তথ্য। এর মধ্যে ফটোকার্ড ৩টি, প্রার্থীদের নিয়ে ৩টি, ভিডিওভিত্তিক ভুল তথ্য ৭টি, মহড়া ১টি, এআই ২টি এবং ভুয়া দাবি ছিল ৫টি।
ফ্যাক্ট ওয়াচ শনাক্ত করে ১০টি ভুল তথ্য। এর মধ্যে ফটোকার্ড ৩টি, ভিডিও ২টি। বাংলা ফ্যাক্ট শনাক্ত করে ১৯টি ভুল তথ্য। এর মধ্যে ফটোকার্ড ৫টি, ভিডিও ৫টি।
একই ঘটনা নিয়ে একাধিক ফ্যাক্টচেকিং প্ল্যাটফর্ম কাজ করেছে বলে অপতথ্যের সংখ্যাটি কমপক্ষে ৬৮টি হবে।
ভোট গ্রহণের আগের দিনও বুধবার ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠানগুলো অর্ধশতাধিক ভুয়া তথ্য শনাক্ত করেছিল।
রিউমর স্ক্যানার গত ১১ ডিসেম্বর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৫৪৫টি অপতথ্য শনাক্ত করে। আর ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচন-সংক্রান্ত ৭৫৭টি অপতথ্য শনাক্ত করে তারা; অর্থাৎ গুজবের বেশির ভাগই ছড়িয়েছে তফসিল ঘোষণার পর।
তারেক রহমান, সেনাপ্রধানকে জড়িয়ে গুজব
‘দুই এক জায়গায় আমার কর্মীরা ব্যালট বাক্স চিন্তাই করলেও সুস্থ নির্বাচন হচ্ছে (বানান অবিকৃত)’—তারেক রহমান এমন মন্তব্য করেছেন দাবি করে একটি ফটোকার্ড ছড়ানো হয় একটি সংবাদমাধ্যমের নামে। তবে ওই সংবাদমাধ্যমের ফেসবুক পেজে এমন কোনো কার্ড পাওয়া যায়নি। তিনি এমন মন্তব্য করেছেন বলে কোনো সংবাদমাধ্যমে খবরও পাওয়া যায়নি।
‘ব্যালট বাক্স চিন্তাইকালে পৌর ছাত্রদল নেতা আটক, তারেক রহমানের নির্দেশ’—শিরোনামে সংবাদমাধ্যমের লোগোযুক্ত একটি ফটোকার্ড ছড়ানো হয়। তবে যাচাই করে দেখা যায়, সেই সংবাদমাধ্যমের একটি ফটোকার্ড শনাক্ত করে ভুয়া তথ্যের কার্ডটি তৈরি করা হয়।
‘নির্বাচন স্থগিত করে সেনাপ্রধান জাতির উদ্দেশ্যে জরুরি ঘোষণা দিচ্ছেন’—এমন দাবি করে পোস্ট দেওয়া হয়। তবে তারও কোনো সত্যতা মেলেনি। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান আজ নিজে ভোট দিয়ে সবাইকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
‘দিনাজপুর-১ বুথফেরত জরিপ ৩৪ শতাংশ ভোট পড়েছে ধানের শীষে, ৬০ শতাংশ ভোট দাঁড়িপাল্লায়’ শিরোনামে একটি সংবাদমাধ্যমের নামে একটি ফটোকার্ড ছড়ায়। কিন্তু অনুসন্ধানে এমন কোনো ফটোকার্ডও পাওয়া যায়নি ওই সংবাদমাধ্যমের ফেসবুক পেজে।
শরীয়তপুরে ৭ লাখ টাকাসহ বিএনপি সমর্থিত এক পোলিং এজেন্টকে আটক করা হয়েছে বলে একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়ায়। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, প্রচারিত দাবিটি সঠিক নয়।
হবিগঞ্জ-২ আসনের বিএনপি প্রার্থীকে নিয়ে ‘হাইকমান্ডের নির্দেশে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন শেখ সুজাত মিয়া’—শিরোনামে ফেস দ্য পিপলের একটি ফটোকার্ড প্রচার করা হয়। অনুসন্ধানে এমন তথ্যের সত্যতা পাওয়া যায়নি।
কুমিল্লার মুরাদনগরে ভোটকেন্দ্রের বিশৃঙ্খলা দেখে হাসনাত আবদুল্লাহ উত্তেজিত—দাবিতে একটি ভিডিও ছড়ানো হলেও যাচাই করে দেখা যায়, এটি ২০২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গায়েবানা জানাজার সময়কার ঘটনা।
ঢাকা-৮ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ভোটারের গলা চেপে ধরেছেন, এমন দাবিতে একটি ভিডিও ছড়ানো হলেও দেখা যায়, ভিডিওর ব্যক্তিটি অন্য একজন।
‘জয়নুল আবেদীন ফারুক নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন’—শিরোনামে একটি টিভি চ্যানেলের ফটোকার্ডের নকশা নকল করে করে একটি ফটোকার্ড ছড়ানো হয়।
‘বিএনপির হামলায় হান্নান মাসুদের ছোট ভাই নিহত’ এই দাবিও যাচাই করে ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়। প্রচারিত ছবির ব্যক্তি ইয়াসিন আরাফাত শান্ত; আর তিনিও নিহত নন, আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন।
নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট গণনার একটি ভিডিও ‘ভোট ডাকাতি’ দাবিতে প্রচার করা হয়। অথচ ভিডিওতে ব্যালটে নৌকা প্রতীক দেখা যায়, যা এবারের নির্বাচনেই নেই।
একটি সংবাদমাধ্যমের ফটোকার্ড নকল করে বিএনপির প্রার্থী শামা ওবায়েদ এবং আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য মুজিবর রহমান চৌধুরীর (নিক্সন চৌধুরী) চারটি ভুয়া ফটোকার্ড শনাক্ত হয় ফ্যাক্টচেকে।
শেরপুরে ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের ঘটনা দাবি করে ছড়ানো ভিডিওটি আসলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে সেনাবাহিনীর নির্বাচনী মহড়ার দৃশ্য বলে যাচাই করে দেখা যায়। জাল ভোট নিয়ে কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলার ঘটনা দাবি করে ছড়ানো আরেকটি ভিডিও ছিল খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনী মহড়ার।
‘সিরাজগঞ্জে জাল ভোট দিতে গিয়ে বিএনপি নেতা সেনাবাহিনীর হাতে আটক’ দাবি করে ছড়ানো ভিডিওটি ২০২৪ সালের লক্ষ্মীপুরে ছিনতাইকারী আটকের ঘটনা।