প্রথম আলোর ২৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত কর্মী সম্মেলনে জাতীয় সংগীতের সময় দাঁড়িয়ে সম্মান জানান প্রথম আলোর কর্মী ও অতিথিরা। সকালে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে। ৪ নভেম্বর
প্রথম আলোর ২৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত কর্মী সম্মেলনে জাতীয় সংগীতের সময় দাঁড়িয়ে সম্মান জানান প্রথম আলোর কর্মী ও অতিথিরা। সকালে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে। ৪ নভেম্বর

প্রথম আলোর বর্ষপূর্তি

নতুন বাস্তবতার উপযোগী হয়ে ওঠার অঙ্গীকার

দক্ষতা বৃদ্ধি ও সৃজনশীলতার সঙ্গে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার সংকল্প নিয়ে ২৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্‌যাপন করলেন প্রথম আলোর কর্মীরা। বুধবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে আয়োজিত কর্মী সম্মেলনে প্রথম আলোর ঢাকা ও সারা দেশের সর্বস্তরের কর্মীরা সময়ের চাহিদার সঙ্গে নিজেদের দ্রুত খাপ খাইয়ে নতুন বাস্তবতার উপযোগী হয়ে ওঠা ও সত্যানুসন্ধানে অটল থাকার ওপর জোর দিয়েছেন।

সকাল নয়টায় প্রথম আলোর কর্মীরা কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আসতে থাকেন। পুরুষদের গায়ে ছিল প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর টি-শার্ট আর নারী কর্মীরা পরেছিলেন শাড়ি। ‘অটল ২৮’ প্রতিপাদ্যের এ আয়োজনের আবহে সৃষ্টি হয়েছিল এক আলাদা ঐকতান। দীর্ঘ ২৮ বছরের পথচলায় অনেকে আর সঙ্গে নেই, আবার নতুন মুখ এসেছে অনেক। নতুন-পুরোনোতে মেলামেশা, প্রীতিসম্ভাষণ, কুশলবিনিময় আর ছবি তোলার মধ্য দিয়ে অন্তরঙ্গ কেটেছে সারা দিন।

অনুষ্ঠানের সূচনা হয়েছিল ১০টায় জাতীয় সংগীত পরিবেশনা দিয়ে। প্রথম আলোর লক্ষ্য তারুণ্যের শক্তি ও উদ্যমের ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যতের পথে অগ্রসর হওয়া। ৩০ বছরের কম বয়সী ৩০ কর্মী জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন হেড অব কালচারাল প্রোগ্রাম কবির বকুলের পরিচালনায়। ট্রান্সকম গ্রুপের প্রয়াত চেয়ারম্যান লতিফুর রহমানের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে অনুষ্ঠানের সঞ্চালক সহযোগী সম্পাদক সুমনা শারমীন বললেন, বর্ষপূর্তির অনুষ্ঠানগুলোতে প্রতিবছর তিনি অংশ নিয়ে সবাইকে অনুপ্রাণিত করতেন। সব বাধা অতিক্রম করে বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রেখে সত্য প্রকাশে অবিচল থাকার উৎসাহ দিতেন। প্রথম আলো সেই পথেই চলেছে। মব সন্ত্রাস, অগ্নিসংযোগ করেও প্রথম আলোকে সত্যানুসন্ধানের পথ থেকে বিচ্যুত করা যায়নি। এ নিয়েই এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর তথ্যচিত্র দেখার আমন্ত্রণ জানালেন তিনি।

‘প্রথম আলো যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, তা শুধু পূরণই করেনি, তার চেয়েও বেশি করেছে’
ম তামিম, উপাচার্য, আইইউবি

তথ্যচিত্র প্রদর্শনীর পর প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হক বলেন, ‘স্বপ্ন ও স্মৃতি দিয়ে গড়া আমাদের এ দেশের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে প্রথম আলো দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা করে যাবে। প্রথম আলো অতীতে কোনো অপশক্তির সঙ্গে আপস করেনি, জঙ্গিদের খুশি করতে পারেনি, সবার সঙ্গে সহমত প্রকাশ করতে পারেনি। সে কারণে ২৮তম বর্ষপূর্তির দিন প্রথম আলো বলছে, ‘স্যরি’। এই আপসহীন ভূমিকা অব্যাহত থাকবে, অটল থাকবে প্রথম আলো।

প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছে প্রথম আলো

প্রতিবছর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মী সম্মেলনে প্রথম আলোর কর্মী ছাড়াও বেশ কিছু লেখক, পাঠক, মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী আসেন আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে। এবার এসেছিলেন ম তামিম, আরিফ দৌলা, রুবানা হক ও মোশাররফ করিম। তাঁদের মঞ্চে আহ্বান করলেন সঞ্চালক কথা শোনার জন্য।

ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) উপাচার্য ম তামিম বলেন, ১৯৯৫ সালে বিদেশে উচ্চতর শিক্ষা শেষে দেশে ফেরার পর যখন প্রথম আলোতে তাঁর একটি সচিত্র সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছিল, তখন সেটি ছিল তাঁর জন্য একটি স্মরণীয় ঘটনা। কারণ, দেশের শ্রেষ্ঠ পত্রিকায় তাঁর সাক্ষাৎকার তাঁকে খুবই অভিভূত করেছিল। তিনি বলেন, প্রথম আলো যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, তা শুধু পূরণই করেনি, তার চেয়েও বেশি করেছে। সাংবাদিকতা করতে গিয়ে সরকারি ও বিরোধী—উভয় পক্ষের রোষানলে পড়েছে প্রথম আলো। এ থেকে প্রমাণিত হয় প্রথম আলো সঠিক পথেই রয়েছে। তিনি বলেন, গত বছরের ডিসেম্বরে হামলার ঘটনার পরও প্রথম আলো ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা অব্যাহত রেখেছে, এটা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।

প্রথম আলো বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার পাশাপাশি সমাজকল্যাণকর অনেক রকমের কাজ করে’
আরিফ দৌলা, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এসিআই লিমিটেড
মঞ্চে বাঁ থেকে আরিফ দৌলা, ম তামিম, রুবানা হক ও মোশাররফ করিম।

এসিআই লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফ দৌলা বলেন, প্রথম আলো বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার পাশাপাশি সমাজকল্যাণকর অনেক রকমের কাজ করে, অনেক উদ্যোগ নিয়ে থাকে। এর মধ্যে বিশেষ করে গণিত নিয়ে সারা দেশে বেসরকারি পর্যায়ে প্রথম আলোর যে কার্যক্রম, তা তাঁকে বিস্মিত করেছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের সমাজে দ্রুত পরিবর্তন আসছে। তথ্যপ্রযুক্তির ক্রমবিকাশের বর্তমান পর্যায়ে এআই এসেছে। নতুন প্রজন্ম এসব প্রযুক্তিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। প্রথম আলোকে সময়ের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এসব পরিবর্তন ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করতে হবে।’

পোশাকশিল্প প্রতিষ্ঠান মোহাম্মদী গ্রুপের চেয়ারপারসন এবং এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের সাবেক উপাচার্য রুবানা হক বলেন, ‘প্রথম আলো সত্যের আলো জ্বালিয়েছে। সেই আলোয় আমরা আমাদের চারপাশটা দেখতে পাই। ভবিষ্যতেও প্রথম আলো ন্যায্যতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাবে। তাদের বর্তমান অবস্থান ধরে রাখবে।’ পাঠক কী পড়তে চায়, সে বিষয়টি সম্পর্কে মনোযোগী হতে তিনি পরামর্শ দেন।

বাধা আসবে, অতীতেও এসেছে। কিন্তু আমরা দমে যাব না। সত্যের প্রতি আমাদের অঙ্গীকারই হলো আমাদের প্রধান শক্তি। পাঠকের আস্থা আমাদের পুঁজি।
মতিউর রহমান, প্রথম আলো সম্পাদক

অভিনয়শিল্পী মোশাররফ করিম বলেন, ‘বহু দিন থেকেই প্রথম আলোর সঙ্গে আছি। প্রথম আলোর অনেক আয়োজনে যুক্ত থেকেছি। আজও আছি। সহজ কথায় বলতে গেলে প্রথম আলো আমাকে ভালোবাসে। আমিও প্রথম আলোকে ভালোবাসি।’ অভিনেতা হিসেবে জনপ্রিয় হলেও মোশাররফ করিম কবিতার চর্চাও করেন। সঞ্চালকের অনুরোধে তিনি তাঁর ‘আড়িয়ালখাঁর জলস্রোত’ কবিতাটি আবৃত্তি করে শোনান।

প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান অতিথিদের ফুল দিয়ে অভিনন্দন জানান।

ভবিষ্যতের প্রথম আলো

মঞ্চে বাঁ থেকে সাজ্জাদ শরিফ, শওকত হোসেন, জাবেদ সুলতান ও মোমেনুর রশিদ সিদ্দিকী

ছাপা পত্রিকা থেকে অনলাইন, ডিজিটাল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—এরপর সামনের লক্ষ্য কী। এ নিয়ে একটি সীমিত পরিসরের আলোচনায় ভবিষ্যতের রূপরেখা তুলে ধরা হলো এই পর্বে। সঞ্চালক ছিলেন প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ। তিনি বললেন, ‘১৯৯৮ সালের ৪ নভেম্বর যখন আমরা প্রথম আলো নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলাম, তখন এত কিছু ভাবিনি। এখন ভাবতে হচ্ছে, ২০৩০-এ পাঠক ঘুম থেকে উঠে কীভাবে খবর দেখবেন? তিনি কি ছাপা পত্রিকা পড়বেন? অনলাইনে সার্চ করবেন? না অন্য কোনো কিছু? মানুষের অভ্যাস পরিবর্তন হচ্ছে। টিকে থাকতে হলে আমাদেরও সেভাবে বদলে ফেলতে হবে। উপযুক্ত প্রস্তুতি নিতে হবে।’ তিনি বলেন, ইতিমধ্যে প্রথম আলো তেমন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অ্যাপ নতুন করে সাজানো হয়েছে। ‘শর্টস’, ‘ক্লিপস’, ‘গেমস’ নামে তিনটি নতুন ফিচার যুক্ত করা হয়েছে। আরও নতুন নতুন ফিচার আসবে। এ ক্ষেত্রে বার্তাকক্ষের ভূমিকা কেমন হবে?

‘প্রথম আলো আমাকে ভালোবাসে। আমিও প্রথম আলোকে ভালোবাসি’
মোশাররফ করিম, অভিনয়শিল্পী

এ প্রশ্নে হেড অব অনলাইন শওকত হোসেন বলেন, ‘এত দিন ধরে আমাদের ছাপা পত্রিকাকেন্দ্রিক একটি অভ্যস্ততা আছে। সেখান থেকে মানসিকভাবে আমাদের সরে আসতে হবে। ডিজিটালই প্রথম—এই মনোভাব থাকতে হবে। এর পাশাপাশি রিপোর্টের বিষয়বস্তু, লেখা ও উপস্থাপনার ধরন—সবই ডিজিটাল মাধ্যমের উপযোগী করে তুলতে হবে। এসব নিয়ে অনেক কাজ চলছে।’

হেড অব ডিজিটাল বিজনেস জাবেদ সুলতান বলেন, আগামী দিনে ডিজিটাল মাধ্যমে আয় বৃদ্ধির বড় সম্ভাবনা রয়েছে। রিপোর্ট ছাড়া আরও অনেক ক্ষেত্র আছে, সেখান থেকে আয় বৃদ্ধি করতে হবে।

প্রথম আলোর ২৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত কর্মী সম্মেলনে পুরস্কৃত সেরা কর্মীদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মীরা।

হেড অব রিসার্চ স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড বিজনেস ডেভেলপমেন্ট মোমেনুর রশিদ সিদ্দিকী বলেন, আগামী দিনে প্রথম আলোর ডিজিটালের গুরুত্ব নানা দিক থেকেই বাড়বে। তবে এখন পর্যন্ত ছাপা পত্রিকাই সামাজিক প্রভাব, জনসাধারণের আস্থা ও আয়ের প্রধান উৎস। সে কারণে ছাপা পত্রিকার গুরুত্ব এখনো আছে।

উপসংহারে সাজ্জাদ শরিফ বলেন, ‘আমাদের পিছিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। নতুন কিছু করার স্বপ্ন নিয়ে নতুন পথ ধরে আমাদের ভবিষ্যতের দিকে যাত্রা করতে হবে।’

সত্যর প্রতি অঙ্গীকারই আমাদের শক্তি

প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান

শেষ আলোচক হিসেবে মঞ্চে আসেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে প্রথম আলোকে একটি এআই-নির্ভর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে হবে। আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে প্রথম আলো এখন আরও বেশি ভবিষ্যৎমুখী কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সব বিভাগ নিজেদের তেমন করেই গড়ে তুলতে সচেষ্ট রয়েছে।

সম্পাদক বলেন, ‘ছাপা পত্রিকার প্রচারসংখ্যা বাড়ানো এখনো আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এটিই একমাত্র লক্ষ্য নয়। আমাদের সাংবাদিকতার গুণমান বাড়াতে হবে। স্বাধীনভাবে সাংবাদিকতা করা ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য নিজের আয় থেকে চলতে পারার কোনো বিকল্প নেই। আগামী দিনের সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এসব বিষয় আমাদের গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে।’

মতিউর রহমান বলেন, ‘আমরা আরও অনেক বহুমুখী কাজ করব। আমাদের প্রত্যেক বিভাগের কর্মীকে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মতো উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে হবে। টিকে থাকতে হলে এটা সবাইকে করতে হবে। বাধা আসবে, অতীতেও এসেছে। কিন্তু আমরা দমে যাব না। সত্যের প্রতি আমাদের অঙ্গীকারই হলো আমাদের প্রধান শক্তি। পাঠকের আস্থা আমাদের পুঁজি। এই শক্তি নিয়েই ভবিষ্যতের পথে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।’

পুরস্কার ও গানে গানে সমাপনী

কর্মী সম্মেলনের শেষে ‘বেঙ্গল সিম্ফনি’ ব্যান্ডের পরিবেশনায় সংগীতশিল্পী ইমন চৌধুরী, এরফান মৃধা শিবলু ও আলেয়া বেগম।

আলোচনার পালা শেষ হলে ছিল পুরস্কার বিতরণী। প্রথম আলোর কর্মীদের কুইজ প্রতিযোগিতা, লেখা প্রতিযোগিতা ও সেরা কর্মীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয় এই পর্বে।

অনুষ্ঠান শেষ হয় হয় বেঙ্গল সিম্ফনির মনমাতানো গানে গানে। শিল্পীরা তুমুল যন্ত্রবাদন ও ‘বারো মাসে বারো ফুল’, ‘ঘুমাইলা ঘুমাইলা বন্ধু’, ‘তোমায় আমি পাইতে পারি বাজি’, ‘আটটা বাজে’, ‘সাদা সাদা কালা কালা’ গেয়ে কর্মীদের মাতিয়ে রাখেন।

গানের পরে মধ্যাহ্নভোজের মধ্য দিয়ে শেষ হয় বর্ষপূর্তির আনন্দঘন এই আয়োজন।