আগামী শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই সব শিক্ষার্থীর হাতে বই পৌঁছানোর লক্ষ্য এনসিটিবির। গত দুই শিক্ষাবর্ষের দেরি কাটিয়ে এবার সময়মতো বই সরবরাহের আশা করছে সংস্থাটি।
আগামী শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনা মূল্যে বিতরণের জন্য প্রাথমিক স্তরের ৯৮ শতাংশের বেশি পাঠ্যবই ছাপার কাজ শেষ হয়েছে। মাধ্যমিক স্তরেও ৭১ শতাংশের বেশি বই ছাপা হয়েছে।
প্রাথমিক স্তরের বই ছাপা ও সরবরাহের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। মাধ্যমিক স্তরে তুলনামূলক পিছিয়ে আছে।
তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, এবার শিক্ষাবর্ষের শুরুতে পাঠ্যবই সরবরাহে কোনো সংকট হবে না।
এবার বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের সময়ই শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন শিক্ষাবর্ষের বই তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সে অনুযায়ী, নভেম্বরের মধ্যেই অধিকাংশ বই ছাপার কাজ শেষ করে মাঠপর্যায়ে পাঠানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে এনসিটিবি।
এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, আগামী শিক্ষাবর্ষে প্রাক্-প্রাথমিক থেকে নবম-দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য প্রায় ৩১ কোটি পাঠ্যবই ছাপা হচ্ছে। এর মধ্যে মাধ্যমিক স্তরের বই ২২ কোটির বেশি এবং প্রাথমিক স্তরের বই প্রায় ৮ কোটি ২১ লাখ ৬৭ হাজার। সব মিলিয়ে বই ছাপা ও সরবরাহে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা। তবে বই ছাপা ও সরবরাহের অগ্রগতিতে দুই স্তরের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।
এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, ৬ নভেম্বর পর্যন্ত প্রাথমিক স্তরের ৯৮ দশমিক ৩০ শতাংশ বই ছাপার কাজ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে বাঁধাই, কাটিং ও প্রাক্-সরবরাহ পরিদর্শন (পিডিআই) শেষে সরবরাহ করা হয়েছে ৯৭ দশমিক ৫৯ শতাংশ বই। অর্থাৎ প্রাথমিকের বই ছাপার পাশাপাশি সরবরাহের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। ৫ নভেম্বরের মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত সব পাঠ্যবই সরবরাহ শেষ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। অবশ্য চতুর্থ শ্রেণিতে চালু হতে যাওয়া নতুন দুটি বইয়ের ছাপা এখনো শুরু হয়নি।
অন্যদিকে ৫ নভেম্বর পর্যন্ত প্রথম দফায় দরপত্র হওয়া মাধ্যমিক স্তরের ২০ কোটি ৮৪ লাখের বেশি বইয়ের মধ্যে ৭১ শতাংশের বেশি ছাপা হয়েছে। এসব বইয়ের মধ্যে সরবরাহ করা হয়েছে ৬৫ শতাংশের বেশি। ফলে মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপা ও সরবরাহের কাজ শেষ করতে এখনো বড় একটি অংশ বাকি রয়েছে।
প্রাথমিক স্তরে আবার দরপত্র আহ্বান করা একটি মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানের কাজ কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানের কাছে বইয়ের সংখ্যা ১৪ লাখের বেশি। তবে সামগ্রিক অগ্রগতিতে এর প্রভাব পড়বে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এনসিটিবির একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, এবার প্রাথমিক স্তরের বই ছাপার কাজ পাওয়া মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় ৮২ শতাংশই মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপার কাজও পেয়েছে। প্রাথমিকের বই ছাপার কাজ শেষ হওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠান এখন মাধ্যমিকের বই ছাপায় বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এ ছাড়া প্রাথমিকের পাঠ্যবই চার রঙে ছাপা হলেও মাধ্যমিকের বই এক রঙে ছাপা হয়। ফলে মাধ্যমিকের বই ছাপার কাজও এখন দ্রুত শেষ করা সম্ভব হবে বলে তাঁরা আশা করছেন।
২০১০ সাল থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে নতুন পাঠ্যবই দেওয়া শুরু করে সরকার। তবে কোনো কোনো বছর শিক্ষাবর্ষের শুরুতে সব শিক্ষার্থীর হাতে সব বই পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পরপর দুই শিক্ষাবর্ষে নির্ধারিত সময়ে বই বিতরণ করা যায়নি। চলতি শিক্ষাবর্ষ শুরুর এক মাস সাত দিন পর, গত ৭ ফেব্রুয়ারি শতভাগ পাঠ্যবই সরবরাহ করতে পেরেছিল এনসিটিবি। এর আগের বছর সব বই সরবরাহ করতে প্রায় তিন মাস লেগেছিল। সময়মতো বই না পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও ব্যাহত হয়।
এবার সেই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি এড়াতে চায় এনসিটিবি। কর্মকর্তাদের লক্ষ্য, ৩০ নভেম্বরের মধ্যে বই ছাপার কাজ শেষ করে সেগুলো মাঠপর্যায়ে পাঠানো। তবে কিছু মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের চেয়ে কয়েক দিন পিছিয়ে পড়তে পারে। তাতে সামগ্রিক বই বিতরণে সমস্যা হবে না বলে মনে করেন এনসিটিবির কর্মকর্তারা।
আগামী শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে দুটি করে মোট চারটি নতুন বই যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। চতুর্থ শ্রেণির বই দুটি হলো ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ ও ‘খেলাধুলা’। ষষ্ঠ শ্রেণির বই দুটি হলো ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ ও ‘আনন্দময় শিক্ষা’। জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটি (এনসিসিসি) বইগুলো চূড়ান্ত করেছে। আগামীকাল রোববার এসব বই ছাপার কাজ পাওয়া মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে। এরপরেই ছাপার কাজ শুরু হবে।
এনসিটিবির কর্মকর্তারা জানান, নতুন চারটি বইয়ের সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। এসব বই ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে ছাপার কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে সাধারণ পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি নতুন বইগুলোও শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বাড়তি তৎপরতা নিতে হবে।
জানতে চাইলে এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের প্রথম আলোকে বলেন, এবার যথাসময়েই শিক্ষার্থীরা বিনা মূল্যের নতুন বই হাতে পাবে।