
দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা প্রতিযোগীরা সারিবদ্ধভাবে নিবন্ধন করছেন। সবার চোখে–মুখে উচ্ছ্বাস আর শেফ হওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়।
রাজধানীর মহাখালী কমিউনিটি সেন্টার প্রাঙ্গণে শনিবার সকালে এমন দৃঢ় প্রত্যয়ী প্রতিযোগীদের দেখা গেল। এখানেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে স্মাইল ফুড প্রোডাক্টসের উদ্যোগে দেশের প্রথম ফিউশন কুকিং রিয়েলিটি শো ‘স্টার শিপ ফিউশন শেফ’–এর সিলেকশন রাউন্ড।
৪ নভেম্বর ২০২৫ থেকে চ্যানেল আই, চরকি এবং প্রথম আলোর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে প্রচার শুরু হয় ‘স্টার শিপ ফিউশন কিচেন: সিজন–২, পাওয়ার্ড বাই আমা। মোট ৩০ পর্বে নির্মিত অনুষ্ঠানটির শেষ পর্ব প্রচার হয় ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬।
আয়োজনটি শুধু নতুন নতুন ফিউশন রেসিপি প্রদর্শনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সুযোগ ছিল দর্শকদের অংশগ্রহণেরও। প্রতিটি পর্বে দেখানো রেসিপি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে দর্শকরা পাঠিয়েছিলেন তাঁদের নিজস্ব ফিউশন রেসিপি। সেখান থেকেই নির্বাচিত হয়েছেন সেরা ৬০ জন রন্ধনপ্রেমী। সারা দেশের রন্ধনপ্রতিভাদের মধ্য থেকে সেরা দশজনকে খুঁজে নিতেই অনুষ্ঠিত হয় ‘স্টার শিপ ফিউশন শেফ’ রিয়েলিটি শোর বহুল প্রতীক্ষিত ‘সিলেকশন রাউন্ড’।
নরসিংদীর মনোহরদী থেকে এসেছিলেন প্রতিযোগী এমএন সালেহ। তিনি কাজ করেন স্থানীয় একটি বেকারিতে। এমএন সালেহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার রান্না করতে ভালো লাগে। আজ যে ফিউশনটা করেছি, আমার বিশ্বাস সেটির মাধ্যমে সেরা দশে জায়গা করে নেব।’
সিলেকশন রাউন্ডে এমএন সালেহ তৈরি করেছেন দুটি ফিউশন রেসিপি। কন্টিনেন্টালের ফিউশন ‘স্পাইসি লেমনি পটেটো গিজার্ড’ এবং জাপানি সুশির ফিউশন ‘গার্ডলিপ সুশি উইথ স্ন্যাকহেড চিপস অ্যান্ড ইউগার্ট সস্’।
‘শ্রিম্প মোমো লেমনগ্রাস জল–বড়া ব্রথ’ রেসিপির ছবি জমা দিয়েই এমএন সালেহ জায়গা করে নিয়েছিলেন সেরা ৬০–এ।
আরেকজন প্রতিযোগী লাবণ্য জামান। ইডেন মহিলা কলেজে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর করছেন। তিনি সেরা ৬০–এ জায়গা করে নিয়েছেন ‘বেঙ্গল ইলিশ ব্লসম বাইটস’ রেসিপির মাধ্যমে। সিলেকশন রাউন্ডে লাবণ্য রেঁধেছেন ‘চিকেন স্টাফড টমেটো উইথ ঘি রোস্টেড ক্যারটে’র ফিউশন।
লাবণ্য জামান জানান, ছোটবেলা থেকেই রান্নার প্রতি প্রবল আগ্রহ তাঁর, অনুপ্রেরণাটা মায়ের কাছ থেকে। তিনি বলেন, ‘আম্মু সবসময়ই আমাকে সচরাচর সবাই যে ধরনের রান্নায় অভ্যস্ত তার বাইরে গিয়ে কিছু করতে বলেন। আমিও সে অনুযায়ী চেষ্টা করি। স্টার শিপ ফিউশন কিচেন অনুষ্ঠানটি দেখে ফিউশন রান্না সম্পর্কে ধারণা পাই। যা আমার এ আয়োজনের সেরা ৬০–এ জায়গা করে নেওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেছে।’
ভেন্যু যেন ‘লাইভ রান্নাঘর’
হাজারো প্রতিযোগীর পাঠানো রেসিপি থেকে কয়েক দফায় যাচাই-বাছাই শেষে আজ চূড়ান্ত লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছিলেন ৬০ জন প্রতিযোগী। মহাখালী কমিউনিটি সেন্টার পরিণত হয়েছিল একটি বিশাল ‘লাইভ রান্নাঘরে’, যেখানে একেকটি স্টেশনে একেকজন স্বপ্নবাজ রন্ধনশিল্পী লড়ছেন তাঁদের রান্নার জাদুকরি প্রতিভা নিয়ে।
সকালে নিবন্ধন করেই প্রতিযোগীরা বেরিয়ে যান কেনাকাটার উদ্দেশে। নির্দিষ্ট বাজেটের মধ্যেই তাঁদেরকে নিজ নিজ রেসিপি তৈরির কাঁচামাল কিনতে হয়েছে। রান্নার বাকি উপকরণ আগে থেকেই কিচেনে ছিল। প্রত্যেকে নিজের পছন্দমতো ফিউশন রেসিপি তৈরির জন্য সময় পান ৪০ মিনিট।
মোট ৫০ নম্বরের মধ্যে প্রতিযোগীদের ফিউশন রান্নার বিচার করা হয়। সেগুলোর মধ্যে ছিল—ইনোভেশন, ফুড টেস্ট, পরিবেশন এবং হাইজিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিচারকের দায়িত্বে ছিলেন দেশের খ্যাতনামা তিনজন শেফ—ওয়েস্টিন ঢাকা ও শেরাটন ঢাকার ক্লাস্টার এক্সিকিউটিভ শেফ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান নূর, লা মেরিডিয়ান ঢাকার শেফ রাফিয়া আহমেদ এবং কালিনারি এক্সপার্ট ও বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অ্যাসেসর কাকলী কলি।
এই আয়োজনটি দেশের ফিউশন রান্নার ভবিষ্যতকে এগিয়ে নিয়ে যাবে উল্লেখ করে মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান নূর প্রথম আলোকে বলেন, ‘ফিউশন করতে হলে আগে দেশীয় রান্নার কুইজিন, তারপর ফিউশনটা জানতে হবে। দুটোই একে অন্যের পরিপূরক। আশার দিক হলো, প্রতিযোগীরা শুধু রেসিপি মুখস্থ করে আসেননি, তাঁরা খাবারের রসায়নটা বুঝতে পেরেছেন। বিশেষ করে স্থানীয় মশলার সঙ্গে আন্তর্জাতিক রন্ধনশৈলীর যে ব্যবহার আমরা আজ দেখছি, তা বাংলাদেশের রন্ধনশিল্প ও ফিউশন রান্নার জন্য একটি বড় মাইলফলক।’
প্রতিযোগীদের তৈরি করা ফিউশন রান্না প্রসঙ্গে রাফিয়া আহমেদ বলেন, ‘অনেকেই দেশি স্বাদের সঙ্গে বিদেশী খাবারের ঠিকঠাক মেলবন্ধন ঘটাতে পারেন না। কিন্তু এখানকার প্রতিযোগীদের অধিকাংশই এক্ষেত্রে সফল। তাঁদের পরিবেশনা আর কার্যক্রম দেখে বোঝা গেছে, ফিউশন নিয়ে বেশ চর্চা করেছেন। আয়োজকদের ধন্যবাদ এমন একটি সুন্দর উদ্যোগ নেওয়ার জন্য।’
প্রতিযোগীদের রন্ধনশৈলী ও ফিউশনের স্বাদ প্রসঙ্গে কাকলী কলি বলেন, ‘আমি সব প্রতিযোগীর রান্না টেস্ট করেছি। প্রক্রিয়া, উপকরণ ও নামকরণ অনুযায়ী ফিউশনটাও ঠিকঠাক মনে হয়েছে।’
কারা পাবে ৪০ লাখ টাকা পুরস্কার
দিনব্যাপী রুদ্ধশ্বাস লড়াই শেষে বিচারকরা চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করেন সেরা ১০ জন প্রতিযোগীকে। তাঁরা হলেন প্রসেনজিৎ চন্দ্র মালো, সাদিক হাসান সামির, হাসান চিশতী, আতিকুল আলী মাহি, সৈয়দ রাহাত হোসেন, লুবাইনা আফ্রা ইসলাম, মোহাম্মদ আবিদ, হুমায়ূন কবির, মোহাম্মদ লিখন এবং তাসলিমা আহমেদ।
এই দশ জন অংশ নেবেন ‘স্টার শিপ ফিউশন শেফ’ প্রতিযোগিতায়। চূড়ান্ত লড়াই শেষে সেরা তিন বিজয়ী পাবেন মোট ৪০ লাখ টাকা পুরস্কার—চ্যাম্পিয়ন ২৫ লাখ, প্রথম রানার আপ ১০ লাখ এবং দ্বিতীয় রানার আপ ৫ লাখ টাকা।
মোট আট পর্বে নির্মিত হবে ‘স্টার শিপ ফিউশন শেফ’ প্রতিযোগিতা। প্রচারিত হবে চ্যানেল আই, চরকি এবং প্রথম আলোর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে।
ফিউশন কিচেন থেকে ফিউশন শেফ
দেশের সেরা ফিউশন শেফ খোঁজার এই যাত্রা শুরু হয়েছিল ‘স্টার শিপ ফিউশ কিচেন’ আয়োজন দিয়ে। যার সমাপ্তি ঘটবে ‘স্টার শিপ ফিউশন শেফ’ প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত লড়াইয়ের মাধ্যমে।
সামগ্রিক আয়োজন নিয়ে স্মাইল ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডের চিফ মার্কেটিং অফিসার শোয়েব মো. আসাদুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিচারকদের রায়ে যে দশজন সেরার তালিকায় স্থান করে নিয়েছে তাঁদেরকে অভিনন্দন। আমাদের উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের রন্ধনশৈলীকে গ্লোবাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে যাওয়া। ‘‘স্টার শিপ ফিউশন শেফ’’ প্রতিযোগিতা এই উদ্যোগকে বাস্তবে রূপ দেবে বলে আমাদের বিশ্বাস।’