খেলনা বিক্রেতা রাজীব মিয়া। গতকাল আগারগাঁওয়ে
খেলনা বিক্রেতা রাজীব মিয়া। গতকাল আগারগাঁওয়ে

রাস্তার ধারের এই বিক্রেতাদের দিন কাটছে কীভাবে

‘বাচ্চাগো পড়ানোর টেকা পামু কই? বাসাভাড়া আর খাওনের টাকাই তো অয় না। মানুষের সহায়তা নিয়ে কোনোরকমে চলতে অয়। স্বামী বাইচা থাকলে হয়তো রাস্তায় আইতে অইত না।’

কথাগুলো বলার সময় চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ ফুটে উঠছিল ৩৮ বছর বয়সি পারভীন আক্তারের। সামনে সাজানো শিশুদের চুড়ি, মাথার ক্লিপ, ব্যান্ড, সেফটিপিন, মেহেদি, টুথব্রাশ, গলার মালা, তামার আংটি, খোঁপার কাঁটাসহ ছোটখাটো নানা পণ্য। এসব পণ্য বিক্রির আশায় গত শুক্রবার সকাল থেকে রাজধানীর শিশুমেলার ডিএনসিসি ওয়ান্ডারল্যান্ড পার্কের সামনে ফুটপাতে বসে আছেন এই নারী। সেখানেই কথা হয় তাঁর সঙ্গে।

বিকেল চারটা পর্যন্ত পারভীন দুপুরের খাবার খাননি। সকাল ১০টায় আদাবর থানার সুনিবিড় এলাকার বাসা থেকে হেঁটে শিশুমেলায় এসেছিলেন তিনি। এতক্ষণে বিক্রি হয়েছে মাত্র ৮০ টাকার পণ্য। সেই টাকা দিয়ে খাবার কিনলে হাতে আর কিছুই থাকবে না। তাই না খেয়েই বসে ছিলেন।

পারভীন বলেন, ‘বাসাত্তে খাইয়া আইছি। আবার যাইয়া খাব। খাওনের টেকা জোটে নাই।’

আড়াই বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান পারভীনের স্বামী। আগে স্বামীর আয়েই সংসার চলত। তাঁর মৃত্যুর পর সংসারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে পারভীনের কাঁধে।

এখন শ্যামলীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অফিসে রান্নার কাজ করেন তিনি। মাসে পান ১০ হাজার টাকা বেতন। অথচ বাসাভাড়াই দিতে হয় সাড়ে ৭ হাজার টাকা। বাকি টাকায় তাঁর পক্ষে চারজনের সংসার চালানো প্রায় অসম্ভব। এ কারণেই তাঁকে প্রতিদিন সংগ্রাম করতে হচ্ছে।

‘আমার আপন ভাইবোনেরা কিছু সাহায্য করে। না হলে এই বাজারে চলমু কেমনে?’-প্রশ্ন করেন পারভীন।

পারভীনের দুই সন্তান। মেয়ের বয়স ১৮ বছর, ছেলের ১৪। একসময় দুজনই স্কুলে যেত। কিন্তু তাঁর স্বামীর মৃত্যুর পর সংসারের খরচ সামলাতে না পেরে তাদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়।

আক্ষেপ করে পারভীন বলেন, ‘তিনবেলা খাওন জোটাতেই দায়। পড়াশোনা করাব কেমনে।’

সংসারের আয় একটু বাড়বে—এই আশায় এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে সাত হাজার টাকা ধার করেছিলেন পারভীন। সেই টাকা দিয়ে পুরান ঢাকার চকবাজার থেকে চুড়ি, ক্লিপ, ব্যান্ড, সেফটিপিনসহ নানা পণ্য কিনে ফুটপাতে বিক্রি শুরু করেন। ভেবেছিলেন চাকরির পাশাপাশি এগুলো বিক্রি করে কিছু বাড়তি আয় হবে।

তবে ব্যবসার অভিজ্ঞতা না থাকায় বেশি দামে পণ্য কিনে ফেলেছিলেন তিনি। এখন সেগুলো কিনে আনা দামের চেয়েও কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।

পারভীন বলেন, ক্রেতারা আরও কম দাম বলেন। তাই তাঁর পণ্য বিক্রিও হচ্ছে না। গত দুই মাসে মাত্র ১ হাজার ৭০০ টাকার পণ্য বিক্রি করতে পেরেছেন। তিনি বলেন, ‘ধার কইরা টাকা আনছিলাম। এখন চালানই ওঠাইতে পারতাছি না।’

অভাবের সংসারে অন্তত ছেলেটাকে কোথাও কাজে দিতে চান। কিন্তু ভালো কোনো কাজের খোঁজ পাননি। অনেককেই এ বিষয়ে বলেছেন, কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেননি বলে জানিয়েছেন তিনি।

আত্মীয়স্বজন সাহায্য করলে কোনোভাবে মাস কেটে যায় পারভীনের। সহযোগিতা না মিললে সংসার চালানো আরও কঠিন হয়ে পড়ে। গ্রামে ফিরে যাওয়ারও সুযোগ নেই তাঁর। স্বামীর রেখে যাওয়া একমাত্র ঘরটি এখন শাশুড়ি ও ননদের দখলে। সেখানে গেলে তাঁরা ঝগড়া করেন, ঘরের মালিকানা নিজেদের বলে দাবি করেন।

পারভীন বলেন, ‘ঘর তাগো নামে লিখে দিতে কয়। আবার ওখানে গিয়া যে কোনো কাম কইরা খাওন জোটামু, সেই সুযোগও নাই। ঘর ছাড়া স্বামীর রেখে যাওয়া আর কিছুই নাই।’

‘চালান গেলে আর লাভ থাহে না’

পারভীন আক্তারের পাশেই শিশুমেলার ২ নম্বর ফটকের সামনে খেলনা বিক্রি করছিলেন ২৮ বছর বয়সী রাজীব মিয়া। সামনে সাজানো বেলুন, বাঁশি, চরকি, পুতুল, প্লাস্টিকের হাঁস-মুরগি, বল আর হাওয়াই মিঠাইসহ শিশুদের নানা ধরনের খেলনা।

ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার বাসিন্দা রাজীব ৯ বছর ধরে এই পেশায় আছেন। কিন্তু তাঁর ভাষ্য, এখন ব্যবসা আগের মতো নেই। পাইকারি বাজারে সব পণ্যের দাম বেড়েছে। অথচ ক্রেতারা বাড়তি দাম দিতে চান না।

রাজীব মিয়া বলেন, ‘সব মালের দাম বাড়ছে। মানুষ বাড়তি দাম দিতে চায় না। অনেকে শুধু জিগাইয়া যায়।’

মাসে গড়ে প্রায় দুই হাজার টাকার খেলনা বিক্রি করেন রাজীব। সেখান থেকে হাতে লাভ থাকে মাত্র ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা। কিন্তু বর্তমান বাজারে এই লাভ দিয়ে সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে না তাঁর। তিনি বলেন, ‘চালান গেলে আর লাভ থাহে না।’

স্ত্রী ও এক সন্তানকে নিয়ে মোহাম্মদপুরের বাবর রোডে এক কক্ষের আধাপাকা ঘরে থাকেন রাজীব। মাসে সাড়ে সাত হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়। সংসারের হিসাব মেলাতে গিয়ে তাঁদের খাবারের তালিকাও ছোট হয়ে এসেছে।

রাজীব বলেন, ‘বেশির ভাগ দিনে আলুভর্তা আর ডাল দিয়াই চলতে হয়। সবকিছুর যেই দাম, ভালো কিছু কিনতে গেলেই খরচ বেশি লাগে। অত টাকা পাব কই?’

গ্রামের বাড়িতে থাকা বাবা-মা ও ছোট বোনের কাছে প্রতি মাসে কিছু টাকা পাঠাতে হয় রাজীবকে। তাই দাম বেশি হওয়ায় মাছ-মাংস খুব একটা কেনা হয় না তাঁদের। তিনি বলেন, ‘মাছ-মোরগ কিনতে গেলেই টাকা শেষ অয়। পোলাও এখন বড় অইছে। তার পেছনেও খরচ লাগে। সব খরচ দিয়া কুলায় না।’

‘এত খরচে টেকা দায়’

গত শুক্রবার সকালে রাজধানীর ধানমন্ডির ১৫/এ নম্বর সড়কে দেখা হয় রাজীব হাওলাদারের সঙ্গে। রাস্তার পাশে একটি ভ্যানে বড় পাতিলে ভুনা খিচুড়ি বিক্রি করছিলেন তিনি। ডিমসহ এক প্লেট খিচুড়ির দাম ৫০ টাকা, ডিম ছাড়া ৩০ টাকা। সঙ্গে আলুভর্তা, লেবু আর পেঁয়াজভর্তা দেওয়া হয়। এখানে খেতে আসেন পথচারী, দারোয়ান, কেয়ারটেকার, রিকশাচালক, দিনমজুরসহ নিম্ন আয়ের অনেক মানুষ।

তবে ভ্যানটি রাজীবের নিজের নয়। অন্যের ভ্যানে দৈনিক ৬০০ টাকা মজুরিতে কাজ করেন। মাসে আয় প্রায় ১৮ হাজার টাকা। কিন্তু এই আয় দিয়ে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁকে।

রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের পাশে এক কক্ষের আধা পাকা ঘরে পরিবার নিয়ে থাকেন রাজীব। বাসাভাড়া পাঁচ হাজার টাকা। তাঁর দুই সন্তান। ১০ বছর বয়সী মেয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। আর ছেলের বয়স ৩ বছর। ঘরভাড়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিল আসে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা। মেয়ের পড়াশোনার খরচও আছে। বাকি টাকায় চারজনের খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটানো খুব কঠিন হয়ে পড়ে।

রাজীব হাওলাদার বলেন, ‘এই বাজারে ২০-৩০ হাজার টাহায়ও কিছু অয় না। রুমভাড়া আর মাইয়ার খরচে চলে যায় ৮ হাজার। বাকি ১০ হাজার টাহায় চারজন মানুষের খরচ মেটাই কেমনে কন?’

গ্রামের বাড়ি বরিশালের আগৈলঝাড়ায় থাকা বৃদ্ধ বাবা-মায়ের কাছেও প্রতি মাসে কিছু টাকা পাঠাতে হয় রাজীবকে। সব হিসাব মিটিয়ে নিজের কিংবা পরিবারের জন্য ভালো কিছু কেনার সামর্থ্য থাকে না তাঁর।

কষ্টের কথা বলতে গিয়ে রাজীব আরও বলেন, ‘ভালো কিছু কিনমু কোহানতে? বউরে দিলে বাচ্চাগো হয় না। বাচ্চাগো দিলে বউরে কিছু দেওয়ার পারি না। আমার কথা তো বাদই দিলাম।’

ঢাকার জীবনযাত্রার ব্যয় এত বেশি যে মাস শেষে হাতে কিছুই থাকে না। সন্তানদের জন্য ভালো কিছু কিনতে ইচ্ছা হলেও তাই প্রায়ই খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয় রাজীবকে।

রাজীব বলেন, ‘এক কেজি মাছ ভালো দেখে নিতে গেলেই ৫০০ টাকা লাগে। মাস শেষে খরচের টাকা মেলে না। বেশি খরচ করলে বাসাভাড়া দিতে পারি না।’

তাই প্রতি মাসই রাজীবের কাছে নতুন করে হিসাব মেলানোর লড়াই। দুই সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে অনেক ইচ্ছাই চেপে রাখতে হয় তাঁকে। শেষে দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বলেন, ‘এত খরচে টেকা দায়। হগল সময় মাইপা মাইপা চলন লাগে।’