প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

আইন–অধিকার

পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার

বাংলাদেশে অনেক নারী পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয় এবং এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়। অনেক নারী বিষয়টিকে ব্যক্তিগত ব্যাপার হিসেবে ধরে নিয়ে চুপচাপ সহ্য করে যান। আবার পারিবারিক সহিংসতার ক্ষেত্রে যে আইনি প্রতিকার আছে, অনেকে সে সম্পর্কে জানেন না। খুব কমসংখ্যক নারী নিরুপায় হয়ে এ ক্ষেত্রে আইনের আশ্রয় নিয়ে থাকেন। নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনায় আইনি প্রতিকারের জন্য বাংলাদেশে ২০১০ সালে পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন পাস হয়।

পারিবারিক সহিংসতা বলতে কী বোঝায়?

পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০–এর ৩ ধারা অনুযায়ী, পারিবারিক সহিংসতা বলতে পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে, এমন কোনো ব্যক্তির দ্বারা পরিবারের অপর কোনো নারী বা শিশু সদস্যের ওপর শারীরিক, মানসিক, যৌন নির্যাতন এবং আর্থিক ক্ষতিকে বোঝায়। এ আইন শুধু স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে নির্যাতনসংক্রান্ত নয়। বরং পরিবারের যেকোনো সদস্যের বিরুদ্ধে নির্যাতনের ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে।

প্রতীকী ছবি

লক্ষ করলে দেখা যায়, ভুক্তভোগীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে শারীরিক নির্যাতনের ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীনে মামলা করে থাকেন। মানসিক ও আর্থিক ক্ষতির জন্য যে মামলা হতে পারে, তা অনেকেরই অজানা। তবে পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইনটি মানসিক ও আর্থিক ক্ষতির জন্য মামলা করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। এ আইনে মানসিক নির্যাতন হচ্ছে, এমন কোনো কথা বলা, যার মাধ্যমে অপর ব্যক্তি অপমানিত বা ভীত হয় এবং যার মাধ্যমে অপর ব্যক্তির স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয় ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা লোপ পায়। এ ছাড়া পুরুষতান্ত্রিক আচরণের মাধ্যমে ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা, পরিবার ও বাইরের মানুষের সামনে অপমান করা, সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা—এগুলোও মানসিক নির্যাতনের অন্তর্ভুক্ত। আবার আর্থিক ক্ষতি বলতে জোর করে অর্থ প্রদানে বাধ্য করা ও আর্থিক স্বাধীনতায় বাধা প্রদানকে বোঝানো হয়েছে। নিত্যদিনের পণ্য ব্যবহার করা থেকে বঞ্চিত করা, প্রয়োজনীয় খরচের জন্য অর্থ প্রদান না করা এগুলোও আর্থিক ক্ষতির অন্তর্ভুক্ত। বর্তমানে আর্থিক চাপ প্রয়োগের জন্য যৌতুকের মামলা করতে দেখা যায়। তবে উল্লিখিত আইনের অধীনে যৌতুক ছাড়াও অন্যান্য আর্থিক ক্ষতির জন্য মামলা করা যায়।

পারিবারিক সহিংসতা আইনের অধীনে কারা সুরক্ষা পাবে?

যেকোনো বয়সের নারী ও ১৮ বছরের কম বয়সের যেকোনো শিশু উল্লিখিত আইনের সুবিধা ভোগ করতে পারবে। অর্থাৎ, দেশের সব নারী ও শিশুর জন্য আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে। আমাদের দেশে এমন উদাহরণ দেখা যায় যে উচ্চ ডিগ্রিধারী নারী থেকে শুরু করে স্বশিক্ষিত নারীর অনেকেই জীবনে কোনো না কোনোভাবে পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। অবাক হওয়ার বিষয় হচ্ছে, নারীর জন্য এ ধরনের পরিস্থিতি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তার পরিবারের সদস্যরা তৈরি করে থাকে।

মামলার ক্ষেত্রে কীভাবে ও কার কাছে আবেদন করতে হবে?

সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আইনজীবীর মাধ্যমে বা সরাসরি আদালতে আবেদন করতে পারবেন। আবার পুলিশ ও প্রয়োগকারী কর্মকর্তার (মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা) মাধ্যমেও মামলা করতে পারেন। পুলিশ ও প্রয়োগকারী কর্মকর্তা এ ক্ষেত্রে সব ধরনের সহযোগিতা করতে বাধ্য থাকবেন।

সুরক্ষা আদেশের বিধান

মামলার বিচারকাজ চলাকালে স্বাভাবিকভাবেই সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির সুরক্ষার বিষয়টি সেখানে আসে। আদালতের কাছে যদি প্রতীয়মান হয় যে বিচার চলাকালে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা তার সাহায্যকারী প্রতিপক্ষ কর্তৃক নির্যাতনের শিকার হওয়ার আশঙ্কা আছে, তাহলে সে ক্ষেত্রে আদালত মামলাকারীর পক্ষে সুরক্ষা আদেশ দিতে পারেন। মামলাকারী চাইলে স্বেচ্ছায় সুরক্ষা আদেশের জন্য প্রার্থনা করে আদালতে আবেদনও করতে পারেন। প্রতিপক্ষ এ আদেশের শর্ত ভঙ্গ করলে তাকে ছয় মাসের কারাদণ্ডসহ ১০ হাজার টাকা জরিমানা ভোগ করতে হবে। তা ছাড়া এই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটলে ২ বছরের কারাদণ্ডসহ ১ লাখ টাকা জরিমানার বিধান আছে।

ক্ষতিপূরণের আদেশ

পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরক্ষা ও সুরক্ষা) আইনের ১৬ ধারায় ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি চাইলে আদালতে ক্ষতিপূরণের আবেদন করতে পারেন। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শুনানির মাধ্যমে আদালত ক্ষতিপূরণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে যেসব বিষয় বিবেচনা করা হবে, সেগুলো হলো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আঘাত, শারীরিক-মানসিক ভোগান্তি, ক্ষতির প্রকৃতি ও পরিমাণ, ক্ষতির জন্য চিকিৎসা খরচ, ক্ষতির প্রভাব, ক্ষতির কারণে বর্তমান ও ভবিষ্যতে উপার্জনের ওপর প্রভাব, নির্যাতনের ফলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির ধ্বংসকৃত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মূল্য, সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি যে রকম জীবনযাপনে অভ্যস্ত, সে রকম জীবনযাপনের ব্যবস্থা ও ভরণপোষণ। তা ছাড়া আদালত কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে আলাদা বাসা ভাড়া করে দেওয়ার জন্য প্রতিপক্ষকে আদেশ দিতে পারেন বা প্রতিপক্ষকে তার বাসা থেকে সাময়িকভাবে উচ্ছেদের আদেশও দিতে পারেন।

নিষেধাজ্ঞার আদেশ

আইনে বলা আছে, সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ও বিবাদীর বাসস্থান যদি একই হয়, তবে আদালত সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে সেই গৃহে অবস্থানের আদেশ দিতে পারেন। তবে একদিকে মামলা দায়ের, আবার অন্যদিকে বিবাদীর সঙ্গে একত্রে বসবাস করার বিষয়টি বেশ সাংঘর্ষিক। সেই জন্য আদালত পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিবাদীর বিরুদ্ধে কিছু নিষেধাজ্ঞার আদেশ প্রদান করতে পারেন। যেমন ভুক্তভোগী যে রাস্তায় চলাচল করেন, সেখানে না যাওয়া, মুঠোফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি। অর্থাৎ, ভুক্তভোগীর জীবন বিপন্ন হতে পারে, এমন কোনো কাজ করা থেকে বিবাদীকে বিরত রাখার লক্ষ্যে আদালত নিষেধাজ্ঞার আদেশ দিতে পারেন।

মিথ্যা মামলা

পারিবারিক নির্যাতনের জন্য যে শাস্তির বিধান রয়েছে, তা অনেক সময় প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়। আদালতের কাছে যদি প্রমাণিত হয় যে দায়ের করা মামলাটি মিথ্যা, তাহলে সে ক্ষেত্রে সাজা হচ্ছে অনধিক ১ বছর কারাদণ্ড অথবা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড।

শেষ কথা

আমাদের দেশে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনার কথা প্রায়ই শোনা। ইউনিসেফের (জাতিসংঘ শিশু তহবিল) একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নারীরা অপরিচিত মানুষের হামলাকে ভয় পায় না, বরং ভয় পায় কাছের মানুষের প্রতিদিনের সহিংসতাকে। তাই যত দ্রুত সম্ভব আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে পারিবারিক নির্যাতন বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। দেশের প্রতিটি নারী ও শিশুর জন্য নিজ গৃহ যাতে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে গড়ে ওঠে, সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।

নাজিয়া আমিন আইনজীবী