এসকেএফ অনকোলজির আয়োজনে ‘বিশ্বমানের ক্যানসার চিকিৎসা এখন বাংলাদেশে’ শীর্ষক অনলাইন আলোচনা গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হয়
এসকেএফ অনকোলজির আয়োজনে ‘বিশ্বমানের ক্যানসার চিকিৎসা এখন বাংলাদেশে’ শীর্ষক অনলাইন আলোচনা গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হয়

অনলাইন আলোচনা

মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসার কি পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য

দেশে মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসার বা হেড অ্যান্ড নেক ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। সচেতনতার অভাব এবং ওরাল হাইজিন বা মুখগহ্বরের পরিচ্ছন্নতা বজায় না রাখা এর অন্যতম কারণ। সংশ্লিষ্টদের মতে, সঠিক সময়ে এই রোগ ধরা পড়লে নিরাময়ের হার প্রায় শতভাগ। উন্নত প্রযুক্তির রেডিওথেরাপি এবং সঠিক রোগ নির্ণয় পদ্ধতির মাধ্যমে বর্তমানে মরণব্যাধি ক্যানসারকে সফলভাবে জয় করা সম্ভব।

এসকেএফ অনকোলজি আয়োজিত ‘বিশ্বমানের ক্যানসার চিকিৎসা এখন বাংলাদেশে’ শীর্ষক বিশেষ অনলাইন আলোচনায় এসব কথা বলেন ডা. আলী আসগর চৌধুরী। তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেডিওথেরাপি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। গত মঙ্গলবার আলোচনা অনুষ্ঠানটি সরাসরি প্রচারিত হয় প্রথম আলো এবং এসকেএফ অনকোলজির ফেসবুক পেজে। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন নাসিহা তাহসিন।

হেড-নেক ক্যানসার কী

ডা. আলী আসগর চৌধুরী জানান, মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসার মূলত একটি বিস্তৃত পরিভাষা। জিহ্বা, ঠোঁট, দাঁত, মাড়ি, মুখের মেঝে এবং স্বরযন্ত্র বা ল্যারিংসের আশপাশের সব অংশ মিলিয়েই হেড অ্যান্ড নেক ক্যানসার। চিকিৎসার সুবিধার্থে একে প্রায় ৮ থেকে ১০টি ভাগে ভাগ করা হয়।

ডা. আলী আসগর চৌধুরী আরও জানান, ‘আমাদের দেশে “স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা” ক্যানসারই হেড-নেক অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। দেশে মোট ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশই এই হেড অ্যান্ড নেক ক্যানসারের মধ্যে পড়ে, যা উদ্বেগজনক। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রোগী অনেক দেরিতে চিকিৎসকের কাছে যান। মুখে দীর্ঘদিনের ঘা, গিলতে সমস্যা, কথা বলতে কষ্ট—এসব লক্ষণ থাকা সত্ত্বেও অনেকে অবহেলা করেন।

এ ক্যনসারের লক্ষণ ও দ্রুত রোগ নির্ণয়ের গুরুত্ব

মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসারের লক্ষণগুলো সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতন থাকা জরুরি। ডা. আলী আসগর চৌধুরী বলেন, মুখে কোনো ঘা হওয়া, যা দুই-তিন সপ্তাহেও সারছে না, কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন, খাবার গিলতে কষ্ট হওয়া কিংবা মুখে লালচে বা সাদাটে ক্ষত দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। বর্তমানে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ ও ডেন্টাল সার্জনরা সেবা দিচ্ছেন। একটি সাধারণ এন্ডোস্কপি বা এফএনএসি পরীক্ষার মাধ্যমেই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই নির্ভুলভাবে ক্যানসার শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।

তামাক ও অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসই মূল ঝুঁকি

বর্তমানে আমাদের দেশে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ জন নতুন করে এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তবে যদি প্রাথমিক পর্যায়ে এই রোগ শনাক্ত করা যায়, তাহলে সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা অনেক বেশি। ডা. আলী আসগর চৌধুরী জানান, ধূমপানের পাশাপাশি আমাদের দেশে আরেকটি বড় সমস্যা হলো স্মোকলেস তামাকের ব্যবহার—যেমন পান, সুপারি, জর্দা বা খৈনি। অনেকেই মনে করেন এগুলো সাধারণ সিগারেটের মতো ক্ষতিকর নয়, কারণ এতে ধোঁয়া নেই। কিন্তু এগুলো সেবনও সমানভাবে বিপজ্জনক। এসব তামাকজাত দ্রব্যে থাকা ক্ষতিকর রাসায়নিক, বিশেষ করে নাইট্রোসামিন সরাসরি ক্যানসার সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে।

অনলাইন আলোচনায় মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসারের কারণ ও প্রতিকার নিয়ে পরামর্শ দেন অধ্যাপক ডা. আলী আসগর চৌধুরী

রেডিওথেরাপির আধুনিক প্রযুক্তি: আইএমআরটি

ক্যানসার চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি বর্তমানে অনেক উন্নত। ডা. আলী আসগর চৌধুরী জানান, বাংলাদেশে এখন আইএমআরটি, থ্রিডি-সিআরটি এবং আইজিআরটির মতো আধুনিক প্রযুক্তি রয়েছে। একে ‘প্রিসিশন রেডিওথেরাপি’ বলা হয়, যেখানে টিউমার ধ্বংস করার সময় আশপাশের সুস্থ কোষ বা অঙ্গ (যেমন স্পাইনাল কর্ড বা লালাগ্রন্থি) সুরক্ষিত থাকে। স্বরযন্ত্রের ক্যানসারে সঠিক রেডিওথেরাপি দিলে অস্ত্রোপচার ছাড়াই রোগীকে সুস্থ করা সম্ভব, যাতে তাঁর কথা বলার ক্ষমতা অটুট থাকে।

চিকিৎসাকালীন ও পরবর্তী ফলোআপ

রেডিওথেরাপি চলাকালীন রোগীদের পুষ্টি ও ওরাল হাইজিনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হয়। এ সময় নরম প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার এবং সফট ব্রাশ ব্যবহারের পরামর্শ দেন ডা. আলী আসগর চৌধুরী। চিকিৎসা শেষ হওয়ার অন্তত ছয় সপ্তাহ পর স্ক্যান করে এর ফলাফল যাচাই করতে হয়। ক্যানসার চিকিৎসা শেষ হওয়ার পর অনেকেই ভাবেন সবকিছু পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু আসলে এখানে নিয়মিত ফলোআপ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসারের ক্ষেত্রে চিকিৎসা শেষ হওয়ার পরও কিছু বিষয় ঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা দরকার।

রেডিয়েশন থেরাপির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে পুরোপুরি বোঝা যায় না। রেডিয়েশন চলাকালীন এবং শেষ হওয়ার পরেও কিছু সময় ধরে এর প্রভাব শরীরে কাজ করতে থাকে। এ কারণে সাধারণত রেডিয়েশন শেষ হওয়ার পর অন্তত ছয় সপ্তাহের আগে কোনো স্ক্যান বা পরীক্ষা করা ঠিক নয়। অনেক ক্ষেত্রে আট সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষা করার পরামর্শও দেওয়া হয়।

ডা. আলী আসগর চৌধুরী জানান, তাড়াতাড়ি পরীক্ষা করলে ফলস পজিটিভ বা ফলস নেগেটিভ রিপোর্ট আসতে পারে, যা রোগের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে বাধা দেয়। তাঁর মতে, চিকিৎসা শেষ হওয়ার পর ফলোআপ করার মূলত দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, ক্যানসারটি আবার ফিরে আসছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা এবং দ্বিতীয়ত, রেডিয়েশন বা অন্যান্য চিকিৎসার ফলে যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা জটিলতা হতে পারে, সেগুলো ঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণে আছে কি না, তা দেখা।

সাধারণভাবে প্রথম এক বছর রোগীকে খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রথম দুই বছরও ঘন ঘন ফলোআপ দরকার হয়। এরপর রোগের স্টেজ এবং অবস্থার ওপর নির্ভর করে ফলোআপের ব্যবধান ধীরে ধীরে বাড়ানো হয়। যদি ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়ে এবং সফলভাবে চিকিৎসা সম্পন্ন হয়, তাহলে পরবর্তী সময়ে ফলোআপের ব্যবধান কিছুটা বাড়ানো যেতে পারে।

তাই ক্যানসার ভালো হয়ে গেলেও নিয়মিত ফলোআপ বন্ধ করা উচিত নয়। সময়মতো চেকআপ করলে যেকোনো সমস্যা দ্রুত ধরা পড়ে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সবশেষে ডা. আলী আসগর চৌধুরী পরামর্শ দেন, অবহেলাই ক্যানসারের বড় শত্রু। মুখের কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। এ ছাড়া তামাকজাত দ্রব্য বর্জন এবং সচেতনতাই ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জয়ী হওয়ার অন্যতম প্রধান পথ।