সংলাপে বক্তারা বলেন, সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থ ও সময় সাশ্রয় হয়। এ ক্ষেত্রে পদ্মা সেতু আমাদের জন্য বড় নজির।

উন্নয়নের পূর্বশর্ত হচ্ছে অবকাঠামো। উন্নত দেশ হতে গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে শুধু অবকাঠামো খাতে ৩২০ বিলিয়ন বা ৩২ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। আর এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বলছে, বছরে জিডিপির ৭ দশমিক ৫ শতাংশ বিনিয়োগ দরকার হবে। এই অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রে পিপিপি বা সরকারি-বেসরকারি খাতের অংশীদারি হতে পারে সবচেয়ে ভালো মাধ্যম। কিন্তু পিপিপির পর্ষদে বেসরকারি খাতের অংশীদারি নেই।
একই সঙ্গে প্রকল্প প্রণয়নের সময় তার ব্যয়, যৌক্তিকতা ও প্রভাব সম্পর্কে ভালোভাবে প্রাক-মূল্যায়ন জরুরি বলে মনে করেন বক্তারা। গতকাল বুধবার রাজধানীর লেকশোর হোটেলে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশন যৌথভাবে আয়োজিত বক্তারা এসব কথা বলেন।
‘সরকারি অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন’ শীর্ষক সংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সংসদ সদস্য এনামুল হক। প্যানেল আলোচক ছিলেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি রিজওয়ান রহমান, পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ।
সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পে দুর্নীতি হচ্ছে বলে উল্লেখ করেছেন সরকারদলীয় সংসদ সদস্য উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদ। তিনি বলেন, ‘এগুলোকে চুরি বলব না, তবে আমাদের প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনেকেই দুর্নীতির আশ্রয় নিচ্ছেন।’ তবে দুর্নীতির বিষয় রেখেঢেকে রাখার প্রয়োজন নেই বলেই তিনি মনে করেন।
প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদ। তিনি বলেন, অনেক প্রকল্পের পরিচালক নতুন গাড়ি কিনছেন, যদিও তিনি এমনিতে গাড়ি পান। এমনকি প্রকল্প এলাকায় তাঁকে প্রতিদিন যেতেও হয় না। ফলে যেখানে তেলের খরচ নিলেই যথেষ্ট, সেখানে নতুন গাড়ি কেনা হচ্ছে। এসব বন্ধের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান প্রকল্পের অসংগতি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন। বলেন, ‘প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হচ্ছেন প্রকল্প পরিচালক। কিন্তু দেখা যায় পঞ্চগড়ের কোনো প্রকল্পের পরিচালক ঢাকায় থাকছেন, এটা জাতীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাজের এলাকায় কেউ থাকতে চাচ্ছে না। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীকে পাওয়া যায় না; তাঁদের নাটাই ঢাকায়, কিন্তু সুতা কাটা যাচ্ছে না।’
পরিকল্পনামন্ত্রী আরও বলেন, ‘প্রশাসনের অনেক বিধি অপ্রয়োজনীয়। ব্রিটিশ, পাকিস্তানি ও সামরিক শাসকেরা এসব করেছেন, যার এখন বাস্তবতা নেই। কিন্তু অনেক দুষ্ট আমলা এসব বিধান চাতুরীর সঙ্গে কাজে লাগাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ আছে এসব বদলানোর, তা সত্ত্বেও এসব পরিবর্তন করা যাচ্ছে না, নানা প্রতিবন্ধকতা এসে হাজির হয়। তবে আইনকে আইন দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে হবে। আমরা সে চেষ্টা করে যাচ্ছি।’
অবকাঠামোকে দেশের প্রাণ বলে উল্লেখ করেন পরিকল্পনামন্ত্রী। তিনি বলেন, তবে অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে পরিবেশবান্ধব হতে হবে।
২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হতে গেলে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ৩৬ শতাংশে উন্নীত করতে হবে বলে উল্লেখ করেন মাসরুর রিয়াজ। অথচ গত সাত বছর ধরে তা ২২-২৩ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। সে জন্য বিদেশি বিনিয়োগ ৬ গুণ বাড়াতে হবে। রপ্তানি বাড়াতে হবে ৯ গুণ। আর এসবের জন্য দরকার অবকাঠামো।
বিনিয়োগের এই খরা কাটাতে পিপিপি বা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি আরও বৃদ্ধির পরামর্শ দেন রিজওয়ান রহমান। বড় অবকাঠামোতে এর বিকল্প নেই। কিন্তু তিনি বলেন, পিপিপির পর্ষদে সরকারের অংশীদারি থাকলেও বেসরকারি খাতের অংশীদারি নেই।
প্রকল্প প্রণয়নের সময় প্রাক্-সম্ভাব্যতা যাচাই বা কস্ট-বেনিফিট অ্যানালাইসিস বা ব্যয় সুবিধার বিশ্লেষণ হচ্ছে না বলে আক্ষেপ করেন সংসদ সদস্য এনামুল হক। বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় মানুষের যাপিত জীবনের পরিবর্তনের বিষয়টি আমলে নেওয়া হচ্ছে না। উদাহরণ হিসেবে তিনি নিজ সংসদীয় এলাকা রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার উদাহরণ দেন। তিনি নির্বাচিত হওয়ার আগে সেখানে পাকা সড়ক ছিল ৫০ কিলোমিটার, এখন তা ৪০০ কিলোমিটারে উন্নীত হয়েছে। এরপরও সেখানে সড়ক নির্মাণ হচ্ছে। যদিও এক সময় এত সড়ক হয়তো কাজে আসবে না; কারণ, সবাই যেভাবে শহরের দিকে চলে আসছে, তাতে এক সময় ওখানে অত মানুষই থাকবে না।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। তিনিও প্রকল্প প্রণয়নের আগে যথাযথভাবে সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কথা বলেন। বলেন, প্রকল্প প্রণয়নের আগে দেখতে হবে তার যৌক্তিকতা কী; উদ্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জীবনে তার কী প্রভাব অনুভূত হবে। অর্থনৈতিক প্রভাবের সঙ্গে তার সামাজিক-পরিবেশগত প্রভাবও বিবেচনা করতে হবে
অনুষ্ঠানে উপস্থাপনা দেন সিপিডির বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের কাঠামো নির্ধারণ করা গেলে অর্থ ও সময় সাশ্রয় হবে। এ ক্ষেত্রে পদ্মা সেতু আমাদের জন্য বড় নজির, যা নির্ধারিত (বর্ধিত) সময়ের মধ্যে শেষ করা গেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আরও বেশ কটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্য আছে সরকারের। কাঠামো নির্ধারণ করা গেলে এগুলো সুশাসনের সঙ্গে বাস্তবায়ন করা যাবে। এ ক্ষেত্রে ওইসিডির কাঠামো অনুসরণ করা যেতে পারে।
মোস্তাফিজুর রহমানের প্রস্তাবের সঙ্গে একমত পোষণ করেন এনামুল হক। বলেন, এখন প্রকল্প হচ্ছে অ্যাডহক ভিত্তিতে। ফলে প্রকল্পের আগে বোঝা যায় না এর ফল কী হবে; বরং প্রকল্প বাস্তবায়নের পরে তা বোঝা যায়। কাঠামো পরিকল্পনা থাকলে এসব সমস্যা হতো না।