
ঢাকার খুচরা দোকানগুলোতে এখন সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় ভারতের ডাবর ব্র্যান্ডের মধু। ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে নিয়মিত বিজ্ঞাপনের কারণে ডাবর হানি এখন এ দেশের উচ্চ ও মধ্যম আয়ের ক্রেতাদের মধ্যে পরিচিত ব্র্যান্ড। সেই ডাবর মধু কিনছে বাংলাদেশ থেকে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেছেন, বাংলাদেশের কয়েকটি কোম্পানি ২০১৪ সাল থেকে ভারতে মধু রপ্তানি করছে। আরেকটি কোম্পানি রপ্তানি করছে জাপানে। এখন চেষ্টা চলছে ইউরোপে রপ্তানির।
বাংলাদেশ থেকে মধু রপ্তানির সুযোগ তৈরি হয়েছে উৎপাদন বাড়ার কারণে। রপ্তানির জন্য যে বাণিজ্যিক উৎপাদন প্রয়োজন, তা করছেন এ দেশের মৌচাষিরা। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) ১৯৭৭ সাল থেকে মৌ বাক্সের মাধ্যমে মধু সংগ্রহ শুরু করে। তাদের হিসাবে, দেশে এখন দুই হাজার মৌ খামার আছে। এর সঙ্গে সাত হাজার চাষি জড়িত। বছরে চার থেকে সাড়ে চার হাজার টন মধুর জোগান আসছে ওই সব চাষির কাছ থেকে।
ভারতে মধু রপ্তানি করে অলওয়েলস মার্কেটিং নামের একটি কোম্পানি। তাদের মধুর ব্র্যান্ডের নাম ‘ট্রপিকা হানি’। কোম্পানিটি ডেনমার্ক থেকে যন্ত্রপাতি এনে মধু প্রক্রিয়াজাত কারখানা করেছে। এর মধু বিভাগের প্রধান আবদুল গফুর মিয়া বলেন, গত বছর তাঁরা ভারতে ৩৮৬ টন মধু রপ্তানি করেছেন। এ বছর এখন পর্যন্ত পাঠিয়েছেন ১২৫ টন। ভারতের ডাবর ছাড়াও শক্তি এপিআই ফুডস নামের একটি প্রতিষ্ঠান তাদের কাছ থেকে মধু নেয়। এ বছর ভারতে তাদের মোট রপ্তানি ৪৫০ টন ছাড়াবে।
জাপানে মধু রপ্তানি করছে আয়ুর্ভেদিয়া ফার্মাসি (ঢাকা) লিমিডেট। দেশের বাজারে তাদের ব্র্যান্ডের নাম এপি মধু। কোম্পানিটির জাতীয় বিপণন ব্যবস্থাপক গোলাম সারওয়ার বলেন, এ বছর তাঁরা জাপানে তিন চালানে ৭৫ টন মধু রপ্তানি করেছেন। এ ছাড়া এপি ব্র্যান্ডের মধু দেশজুড়ে পাওয়া যায়।
দেশে সবচেয়ে বেশি মধু সংগ্রহ করা হয় সরিষা ফুল থেকে। এর পাশাপাশি লিচু, কালিজিরা, মৌরি, ধনিয়া, তিসিসহ বিভিন্ন ফুলের মধু সংগ্রহ করেন মৌচাষিরা। বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প প্রতিষ্ঠান এসব মধু বাজারজাত করে।
মধুর উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করে বিসিক। সংস্থাটির মধু উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক খোন্দকার আমিনুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, দেশে এখন প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ হয়। তার মাত্র ১০ শতাংশ থেকে এখন মধু সংগ্রহ করা যাচ্ছে। পুরো সরিষার মাঠ মধু সংগ্রহের আওতায় আনা গেলে উৎপাদন অনেক বাড়ানো সম্ভব।
ইউরোপে রপ্তানির সম্ভাবনা: বিসিক জানিয়েছে, রপ্তানির জন্য পরীক্ষা করাতে ২০১৪ সালে স্লোভেনিয়ার একটি কোম্পানির মাধ্যমে জার্মানিতে পাঠানো হয় বাংলাদেশি মধু। সেখানে ইন্টারটেক ও কিউএসআই নামে দুটি কোম্পানির পরীক্ষাগারে সেই মধু পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষার ফলাফলে তারা বলেছে, বাংলাদেশি মধুতে কোনো মিশ্রণ নেই। এ মানের মধু রপ্তানি করা যেতে পারে।
এরপর বিসিকের পক্ষ থেকে ইউরোপীয় কমিশনে যোগাযোগ করা হয়। মধু প্রকল্পের পরিচালক খোন্দকার আমিনুজ্জামান বলেন, ইউরোপে রপ্তানি করতে হলে মধুতে কীটনাশক, ক্ষতিকর ভারী ধাতু ও অ্যান্টিবায়োটিক থাকা চলবে না। এসব পরীক্ষার জন্য বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদে স্থাপিত ‘ডেজিগনেটেড রেফারেন্স ইনস্টিটিউট ফর কেমিক্যাল মেজারমেন্টে (ডিআরআইসিএম)’ পরীক্ষা করে বাংলাদেশে মধুর মান ঠিকঠাক পাওয়া গেছে। ওই পরীক্ষা প্রতিবেদন মার্চ মাসে ইউরোপীয় কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
খোন্দকার আমিনুজ্জামান বলেন, ইউরোপীয় কমিশনের মূল্যায়নে টিকে গেলে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মধু রপ্তানি সম্ভব হবে। ইউরোপে মধুর চাহিদা অনেক বেশি।
অলওয়েলস্ মার্কেটিংয়ের আবদুল গফুর বলেন, তাঁদের কারখানায় ইউরোপে রপ্তানিযোগ্য মানে পরিশোধন করে মধু উৎপাদন করা যায়। ডেনমার্ক থেকে একটি কোম্পানির প্রতিনিধিদল এসে তাঁদের কারখানা দেখে গেছে।
প্রয়োজন ব্র্যান্ডিং: বাংলাদেশে অনেক ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প আছে, যারা বহু বছর ধরে মধু উৎপাদন ও বাজারজাত করছে। তারপরও দেশের উচ্চ ও মধ্যম আয়ের ক্রেতাদের বাজার ভারতীয় মধুর দখলে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) মহাপরিচালক হামিদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশে মধুর উৎপাদন অনেকখানি বাড়ানো সম্ভব। এ জন্য মূল্য সংযোজন করতে হবে। ব্র্যান্ডিং করে আধুনিক কৌশলে বিপণন করতে হবে।
এ ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছে এপি মধু ও ট্রপিকা মধু। এপি মধুর গোলাম সারওয়ার বলেন, ‘আমাদের মধু সারা দেশেই পাওয়া যায়। তবে বেশি বিক্রি হয় ডাবর ব্র্যান্ডের মধু। আমরাও ডাবরের মতো উন্নত মানের জারে এপি মধু বাজারজাত করতে যাচ্ছি।’
ট্রপিকা মধুর নজর এত দিন রপ্তানির দিকেই ছিল। এখন তারাও দেশের বাজারে নজর দিয়েছে। কোম্পানিটির কর্মকর্তা আবদুল গফুর বলেন, দেশের খুচরা পর্যায়ে ট্রপিকা মধু বিক্রি শুরু হয়েছে।