ব্যবসায় সক্রিয় ২৮ কোম্পানি

দ্রুত বড় হচ্ছে এলপিজির বাজার

বর্তমানে দেশে এলপিজির বাজারের ৯৮ শতাংশই বেসরকারি খাতের কোম্পানির দখলে

দেশে এক দশকের বেশি সময় ধরে গৃহস্থালিতে গ্যাস–সংযোগ বন্ধ। এ সময় বেড়েছে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয়। বেড়েছে জীবনযাত্রার মান। তাতে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি হিসেবে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দিকে ঝুঁকছেন মানুষ। গ্রামেগঞ্জেও এখন রান্নাবান্নায় মাটির চুলার বদলে জায়গা করে নিয়েছে এলপিজি।

চাহিদা বাড়লেও দাম নিয়ে ক্রেতা–বিক্রেতা উভয়ের মধ্যেই আছে অসন্তুষ্টি। তাই ব্যবসায়ীদের জন্য ন্যায্যমূল্য ও ক্রেতার জন্য সহনীয় দাম নির্ধারণ করা গেলে তাতে এলপিজির বাজার আরও বড় হবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

দেশের বাজারে এলপিজির চাহিদা নিয়ে একটি প্রক্ষেপণ প্রতিবেদন তৈরি করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত এলপি গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১০ বছর ধরে দেশে এলপিজির ব্যবহার প্রতিবছর গড়ে সাড়ে ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৪১ সাল নাগাদ দেশে এলপিজির চাহিদা বেড়ে দাঁড়াবে ৭০ লাখ টনে। তাই বাড়তি চাহিদা পূরণে সরকারিভাবেও এলপিজি আমদানির পরিকল্পনা করা হয়েছে।

যেসব কারণে চাহিদা বাড়ছে

■ প্রাকৃতিক গ্যাসের সংযোগ বন্ধ।

■ মাথাপিছু আয় বাড়ছে।

■ শিল্পে বাড়ছে এলপিজির ব্যবহার।

■ পরিবহনে ব্যবহৃত হচ্ছে অটো গ্যাস।

■ নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি।

সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ

■ ক্রেতার জন্য সহনীয় দাম।

■ ব্যবসার জন্য ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা।

■ নিরাপদ সিলিন্ডার ব্যবস্থাপনা।

■ সরকারি নজরদারি বাড়ানো।

■ পরিবহন খরচ কমানো।

তবে বেসরকারি খাতের এলপিজি কোম্পানিগুলোর সংগঠন লোয়াব বলছে, ব্যাপক সম্ভাবনা আছে ঠিকই, তবে সরকারি প্রক্ষেপণে চাহিদা একটু বেশি হিসাব করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। আগামী কয়েক বছরে হয়তো ২০ শতাংশের বেশি চাহিদা বাড়তে পারে। ২০২৫ সালে চাহিদা হতে পারে ৩০ লাখ টন।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) সূত্র বলছে, দেশে মোট ৫৬টি কোম্পানি এলপিজি ব্যবসার জন্য লাইসেন্স নিয়েছে। ২৮টি কোম্পানি বর্তমানে বাজারে সক্রিয়। এর মধ্যে ২০টি কোম্পানি সরাসরি আমদানি করে। এ খাতে বিনিয়োগ হয়েছে ৩৫০ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। গত বছর ১২ লাখ টন এলপিজি সরবরাহ করা হয় বাজারে। এর মধ্যে ৯৮ শতাংশের বেশি সরবরাহ করে বেসরকারি খাত। আর দেড় শতাংশ চাহিদা পূরণ করেছে সরকারি কোম্পানি।

বিপিসি ও লোয়াবের তথ্য বলছে, দেশে ২০০০ সালে প্রথম এলপিজি সরবরাহ শুরু করে বসুন্ধরা। এ বাজারে এখনো শীর্ষে আছে কোম্পানিটি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছে ওমেরা। এ ছাড়া শীর্ষ সরবরাহকারীদের মধ্যে আছে ওরিয়ন, যমুনা, নাভানার মতো ব্র্যান্ড। দুই বছর ধরে বাড়তে শুরু করেছে ফ্রেশ এলপিজির সরবরাহও।

এদিকে দেশে এলপিজি ব্যবসার দুই দশক পার হওয়ার পর উচ্চ আদালতের আদেশে বাধ্য হয়ে গত এপ্রিলে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। গণশুনানির মাধ্যমে ঠিক হওয়া এ দাম নিয়ে শুরু থেকেই আপত্তি জানিয়ে আসছে লোয়াব। তারা বলছে, এমন দামে এলপিজি বিক্রি করতে হলে অধিকাংশ কোম্পানির ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। ব্যবসায়ীরা বলেন, এলপিজির বাজার সম্প্রসারণে চ্যালেঞ্জের মধ্যে ভোক্তার জন্য সহনীয় দাম নির্ধারণ করা জরুরি। তবে এমন দাম নির্ধারণ করা ঠিক হবে না, যার জন্য কোম্পানিগুলোকে লোকসান গুনতে হয়।

জানতে চাইলে লোয়াবের সভাপতি আজম জে চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, এলপিজির বাজার সরকারি প্রক্ষেপণ অনুসারে না–ও বাড়তে পারে। প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার জন্য ভোক্তার পাশাপাশি ব্যবসায়ীর বিনিয়োগ সুরক্ষার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। জ্বালানি পণ্যের সব খাতেই সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে, এলপিজির ক্ষেত্রেও দিতে পারে।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, নির্দিষ্ট সময় পরপর জ্বালানি ব্যবহারে পরিবর্তন ঘটে। তাই এলপিজির ব্যবহার বেশি দিন না–ও বাড়তে পারে। বিকল্প জ্বালানি হিসেবে রান্না ও পরিবহনে এরই মধ্যে বিশ্বজুড়ে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ছে। দেশেও এটি ধীরে ধীরে বাড়তে পারে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, ব্যবসায়ী ও ক্যাবের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এলপিজির দাম নির্ধারণের বিষয়টি দেখছে বিইআরসি। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমছে। তাই সাশ্রয়ী জ্বালানি নিশ্চিত করতে স্বল্পমেয়াদি নানা পরিকল্পনার কথা ভাবা হচ্ছে।

৭০ শতাংশের রান্নায় সনাতনী জ্বালানি

বিপিসি বলছে, দেশে বর্তমানে ৭০ শতাংশ পরিবার রান্নার কাজে গাছপালা (লাকড়ি), শুকনা গোবর ও বায়োমাস ব্যবহার করে থাকে। বাকিরা প্রাকৃতিক গ্যাস ও এলপিজি ব্যবহার করে। এলপিজির গ্রাহক বর্তমানে ৩৮ লাখ। আর রান্নায় প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করেন ৪১ লাখ পরিবার। ২০১০ সালে বাসাবাড়িতে নতুন গ্যাস–সংযোগ বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে এলপিজির ব্যবহার বাড়তে থাকে। ২০১৬ সালে এসে ১০০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয় এলপিজির ব্যবসায়। ২০১৭ সালে সেটি দাঁড়ায় ১২৩ শতাংশে। সরকারি প্রতিষ্ঠান এলপি গ্যাস কোম্পানির হিসাবে, পাঁচ সদস্যের একটি পরিবারে মাসে ১৮ কেজি এলপিজি লাগে।

রূপান্তরে বাড়ছে চাহিদা

এলপি গ্যাস কোম্পানির প্রতিবেদন বলছে, ২০৪১ সালে শহরের দেড় কোটি পরিবারের জন্য চাহিদা বেড়ে হবে প্রায় ৩৪ লাখ টন। গ্রামের উচ্চ ও মধ্যম আয়ের পরিবারের চাহিদা দাঁড়াবে ২২ লাখ টন। আর যানবাহনে চাহিদা হতে পারে ১৪ লাখ টন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, চাহিদা বাড়তে থাকায় সরকারিভাবে বছরে ১০ থেকে ১২ লাখ টন এলপিজি আমদানির চিন্তা করছে বিপিসি।

জানতে চাইলে ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, এলপিজির বাজার প্রতিযোগিতামূলক করা গেলে বাজার আরও সম্প্রসারিত হবে।